Untitled Document
ফুল
চুনিয়াঝোরায় ধূসর, সবুজ ও নীল
- প্রিসিলা রাজ

এক মেঘলা বিকেলে কারিপাড়া থেকে চুনিয়াঝোরা রওনা দিলাম। যার মটরসাইকেলে সওয়ার হয়েছি সে আমার মায়ের চাচাতো ভাইয়ের ছেলে। ওদের সঙ্গে আমার কারিপাড়া গ্রামে এসে পরিচয়। দেশভাঙন যাদের জীবন ভেঙে দিয়েছে আমার আম্মা-আব্বার বৃহত্তর পরিবার তাদের একটি। প্রায় জন্ম থেকে আম্মার কাছে এসব গল্প শুনে শুনে আমাদের শ্রুতিজীবনের অংশ হয়ে গেছে তা। তবে জন্মের গ্রাম, বড় হয়ে ওঠার জগৎ হারিয়ে ফেলার যে বেদনা আম্মার চিরসঙ্গী তা কেমন যেন এড়িয়ে গেছে আমাকে, হয়তবা আমাদের প্রজন্মের সকলকেই আম্মাদের কাছে ওপার বাংলা অর্থাৎ পূর্ববঙ্গে জন্মেছি, বড় হয়েছি যারা। সেই বেদনার আঁচ কেন যেন গায়ে লাগল কারিপাড়া গ্রামে এসে Ñ গদাধর নদী, আমার ডাকাবুকো নানার কবর, আম্মাদের ভিটে যেখানে একসময় শ’বছরের পুরানো শালকাঠে তৈরী দোতালা বাড়ি ছিল এসব দেখে আর আমার এই ভাইবোন আত্মীয়-স্বজনদের পেয়ে। আমার পরিচয় এখানে ‘পেশকারের নাতি’ Ñ নানা আলীপুরদুয়ার কোর্টের পেশকার ছিলেন। এখানে কয়েকদিন আনমনে ঘুরে পা বাড়িয়েছিলাম চুনিয়াঝোরার দিকে। ওখানকার চা বাগানে আম্মার এক চাচাতো ভাতিজার ছেলের বিয়ে হয়েছে। যাচ্ছি তার শ্বশুরবাড়িতে।

কারিপাড়া থেকে চুনিয়াঝোরা মোটরসাইকেলে এক ঘণ্টার বেশী পথ। চা বাগান, বন, বাজার এসব পেরোতে হয়। চা বাগানের জ্যামিতিক নকশা আমাকে মোহিত করে না কেবল প্রকৃতি কতটা ধ্বংস করা হয়েছে সেসব মনে হয়ে মনটা আরো ভারী হয়। শুনেছি আমার নানা একসময় এদিককার কোনো এক চা বাগানের ম্যানেজার ছিলেন। দেশভাগের আগে আমাদের মেলা আত্মীয়-স্বজন জলপাইগুড়ির চা বাগানগুলোতে বংশানুক্রমিক চাকরি করতেন।

আমাদের গন্তব্য ছিল চুনিয়াঝোরা এলাকায় এক চা বাগানের তৃতীয় কি চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের বসতি। যে চা কোম্পানির এ বাগান তার নাম এখন আর মনে নেই। এখানেই রঞ্জু অর্থাৎ আমার সেই ভাইয়ের শ্বশুর পরিবার নিয়ে বাস করেন। চা বাগানের বসতি যেমনটা হয়, একটানা অনেকগুলো বাড়ি, বাইরেটা কাঠের বা বাতার বেড়া দিয়ে ঘেরা। ভেতরে আধা পাকা বাড়ি আর এক চিলতে উঠান। ভাইটা বাইরে মোটরসাইকেল রাখল। বাইক থেকে নেমে আমি মুগ্ধ হয়ে যাই কাঠের বেড়ার গায়ে লতানে ফুলগুলো দেখে।

মেঘের স্তুপ থেকে ছাইয়ের কাজল মাখা রূপারঙ আলো চরাচর ভরিয়ে দিয়েছে। সেই আলো আর শ্রাবণের আর্দ্রতায় ভিজে বৃক্ষগুল্মলতায় কামনার সবুজ রঙ ধরেছে। বেড়ার গায়ের এ ফুল আগে কোথাও দেখিনি। এ হলুদের কী নাম? পাঁচটি পাপড়ি থেকে একটু আগের পশলা বৃষ্টি ফোঁটা ফোঁটা ঝরছে। মাঝখানে গোল অংশের খয়েরি এতটাই গাঢ় যে কালো বলে ভুল হয়। পুরো বেড়ায় ছড়িয়ে পড়া লতায় কখনও জোড়ায় কখনও একাকী ফুটে আছে। দুয়ারে এই হরিদ্রা শুভেচ্ছায় আগন্তুকমাত্রেই খুশি হয়। আমরাও ভেতরে পা বাড়ালাম।

নিকানো উঠানের চারপাশে ছোট ছোট আধপাকা ঘর। আকাশ ঘনঘোর তাই ভেতরে বাতি জ্বলছে। রঞ্জুর শ্বশুরমশাই কাজ থেকে তখনও ফেরেননি। শাশুড়ি গেছেন গরু পাহারা দিতে মাঠে। ক’দিন ধরে বাঘের খুব উৎপাত চলছে। আমাদের এসব খবর দিলেন নানী, অর্থাৎ রঞ্জুর নানী শাশুড়ি। একমাথা কালো চুল, বত্রিশপাটি অটুট দাঁতের অধিকারী এক কৃষ্ণবর্ণ নারী। পঞ্চান্ন অনধিক এই প্রায় তরুণীর ইতিমধ্যে পুতি অর্থাৎ চতুর্থ প্রজন্ম এসে গেছে, অবাক হয়ে ভাবি।

ইতিমধ্যে রঞ্জুর শাশুড়ি এসে পড়লেন গরু সঙ্গে করে। ইনি গৌরী, মায়ের মতোই তরুণী। এসে পড়ল আজাদও, রঞ্জুর শালা। দু’ ভাইবোন ওরা। আজাদ নানীর মতো কালো, সুন্দর, বিস্তীর্ণ চা বাগানে মোটরবাইক দাবড়ে বেড়ানোই তার কাজ। পরদিন ওর ঘাড়েই সওয়ার হব আমি। আজাদের মা এসে নাস্তা বানানোয় ঝাঁপিয়ে পড়লেন। মেয়ের শ্বশুরবাড়ির মেহমান, তাও আবার বাংলাদেশ থেকে আসা, পেয়ে তাঁর উচ্ছ্বাস বাঁধ ভেঙেছে। আমি বাসাটা ঘুরে দেখতে বের হই। একটু পরেই বাবাগো বলে এক লাফে ওদের বাইরের ঘরে যেখানে আমার ভাইটা বসা ছিল সেখানে ঢুকি। আমার ভয়ার্ত গলা শুনে বাকিরাও এসে হাজির হয়। আমার তখন ভয়ে সিঁটানো অবস্থা। কোনোরকমে বলি বাইরের দেওয়ালগুলোয় মোটা মোটা কেন্নো দেখার কথা। পাঠক, আমার কথা শুনে হাসছেন? কানি আঙুলের সমান মোটা তিন ইঞ্চি চার ইঞ্চি লম্বা কেঁচোর মতো প্রাণীগুলোকে দেওয়াল বেয়ে উঠতে দেখলে কারো আর হাসার অবস্থা থাকত না সেটা আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি! কিন্তু আমার অবস্থা দেখে ওরাও হেসে বাঁচেন না। বলেন ওগুলো তো বর্ষার জীব, কারো কোনো ক্ষতি করে না। আমার ছোটবেলা থেকে কেঁচো, জোঁক এগুলো দেখলে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়, আর ঘরের দেওয়াল বেয়ে এগুলো উঠছে ভাবলেই Ñ ওহ্।

প্রথমে চলে যাওয়ার কথা ভাবলেও শেষে ঠিক করি যাব না। সত্যি তো, ওরা তো নিরীহ প্রাণী। কিন্তু আবার আমার উৎসাহে পানি পড়ল কয়েকটা ঘরের দেওয়ালে দেখে। ওঁদের অনেক সাধ্য-সাধনা আর পরদিন জয়ন্তিয়া পাহাড় ঘোরার লোভে শেষে থেকে যাই। রাতে আমাকে থাকতে দেওয়া হলো নানাীর সঙ্গে। রসিক মানুষ তিনি। আমার ভয় দেখে হাসতে হাসতে বলেন, ‘ওগুলো তো কাপড় শুকানোর তারেও থাকে। কাপড় যেমন শুকায় ঐভাবে নিজেদের গা শুকায়।’ আমি দুই কানে তুলা গুঁজে শুই যাতে মশারি ভেদ করে ঢুকলেও কানে না সেঁধাতে পারে। নানী আমার কা- দেখে আবার হাসেন।

রাতে ভাল ঘুম হলো না। মাঝরাতে উঠে মশারী গা আর দেওয়াল থেকে কয়েকটাকে লাঠি দিয়ে নামিয়ে বাইরে ফেলে এলাম। কোনো রকমে সকাল হলে নাস্তা খেয়ে আজাদের বাইকে উঠলাম। ও একবার বলল, ‘দিদি, তোমার যে অবস্থা বনেবাদাড়ে ওগুলোর পাল্লায় পড়লে কী করবে?’ ওকে বললাম ‘দেখা যাক।’ ব্যাপারটা হচ্ছে এই যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্ষায় পাহাড় ডিঙানোর কালে একাধিকবার আমার গায়ে অনেক জোঁক লেগেছিল তো সেসময় আবার কিছু মনে হয়নি। আশ্চর্য!

জৈন্তা পাহাড়ে যেতে নুড়িপাথরের বিস্তীর্ণ এলাকা পেরোতে হয়। ছোট ছোট ধূসর-সাদা রূপান্তরিত শীলায় ভরা এলাকার ভেতর দিয়ে যেতে অদ্ভুত লাগে। ওপরে বৃষ্টিধোয়া তুলার স্তুপের মতো সাদা মেঘ, দূরে গাছভরা পাহাড় আর মাঝখানে পাথরের স্রোত। আজাদ বলল এটাই চুনিয়াঝোরা অর্থাৎ নদীটা। ঝোরা মানে পাহাড়ি নদী। এর নামেই এলাকার নাম। নুড়ি সমুদ্রে মধ্যে মধ্যে ক্ষীণ জলধারা দেখলে মনেই হয় না মুষলধারে বৃষ্টি এলে শান্ত এলাকাটাই কত ভয়াল রূপ নেয়। রাঙামাটিতে এ রূপ কয়েকবার দেখার সুযোগ হয়েছিল। জায়গাটায় কিছু খড়ের ছাউনিও দেখলাম। ওগুলো নাকি শীতের পিকনিকওয়ালাদের জন্য করা হয়েছে। বর্ষায় খড়টড় খসে গিয়ে ছাউনিগুলোর দাঁত বেরিয়ে পড়েছে তাই। একসময় পাহাড়ের গোড়ালিতে পৌঁছে যায় আমাদের বাইক।

চোরের উৎপাত নেই আজাদ তাই বাইকটাকে দিব্যি অরক্ষিত রেখে আমার সঙ্গে পাহাড়ে উঠে এল। সিলেট-চট্টগ্রামের মতোই মাটির পাহাড়। উত্তরবঙ্গ-মেঘালয় ধরে বিছিয়ে থাকা খাসিয়া-জয়ন্তিয়া রেঞ্জ এটি। বস্তুত এরই অবশেষ বাংলাদেশের সিলেটের ওপর দিয়ে গেছে। চট্টগ্রাম-পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় অবশ্য যদ্দূর জানি অন্য রেঞ্জের অংশ। আমাদের সামনে যে পাহাড় তার ওপারে ভূটান। বর্ষায় পিছল পথ বেয়ে কষ্ট করে করে উঠি। বিচিত্র পাতা-গাছ-গুল্ম দেখি। আজাদের ওদিকে মন নেই, সে ধুপধাপ ওপরে উঠে যায়। সবুজ চেখে চেখে উঠছি চোখ গেল রূপা-বেগনির বিস্তারে। আমরা যে সরু পথ ধরে উঠছি তার একপাশে ঢালু খাদ অন্যপাশে মোটামুটি খাড়া পাহাড়। সেদিকেই পাহাড়ের গা ঘেঁষে গাছটা উঠেছে। তরুণ বৃক্ষের একাকী ফুলেল বিস্তার কি আমার কলমে ফুটবে? যে সময়ের কথা বলছি তা ২০০৭, তার বছর দু’য়েক পর রাঙামাটিতেও আবিষ্কার করেছি একে। অবাক লেগেছে এত বছরের পার্বত্য চট্টগ্রাম ভ্রমণে কেন চোখের আড়ালেই থেকে গেছিল সে।

পরে নওয়াজেশ আহমেদের Wild Flowers of Bangladesh ঘেঁটে এ ফুলের চিহ্ন না দেখে অবাক হয়েছি। এত বড় গাছ ওঁদের শ্যেন দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়ার কথা নয়।

সেদিন জয়ন্তিয়া পাহাড়ে আরো ফুলের ছবি তুলেছিলাম। পাহাড়ে ওঠা আর ছবি তোলা মিলিয়ে বেশ শ্রম যায়। একটা সময় ঢালে বসে বিশ্রাম করছি এমন সময় আজাদ আরো ওপর থেকে বেগে নেমে এসে ফিরে যাওয়ার তাড়া দেয়। ‘হাতির টাটকা গু দেখে এলাম। তাড়াতাড়ি চলো। যে কোনো সময় হাতির দল এদিকে নামবে!’ ওরে বাবারে বলে হাঁচড়পাঁচড় করে নেমে আসি দু’জনেই।

এবার আজাদের মা যাঁকে আমি খালা ডেকেছিলাম আর নানীর প্রসঙ্গে কিছু কথা। এই দুই নারী আমাকে দেড় দিনে এতটা ভালবেসেছিলেন কেন আমি জানি না। হয়ত মানুষবিরল চা বাগানে বছরের পর বছর কাটিয়ে তাঁদের ভেতর বিন্দু বিন্দু স্নেহ জমা হয়ে পাহাড় হয়েছিল যা ঢালার মানুষ তাঁরা পান না। এই নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারটি প্রায় অনাত্মীয় মুসাফিরকে যা দিয়েছে আমি নীরবে তা গ্রহণ করতে চেয়েছি এর প্রতিদান কখনও দেওয়া হবে না তা জেনে। পরদিন চলে আসার আগে খালা বলেছিলেন, ‘তুমি ঢাকায় ফিরে আমাদের ফোন কোরো।’ আমি সবিনয়ে জানাই সেটা হয়ত সম্ভব হবে না। যা আমি করব না সেজন্য প্রবোধ দেওয়া আমার সহ্য হয় না। তিনি আবারও আকুতি জানিয়েছিলেন আর উপহার দিয়েছিলেন নিজের বোনা দু’টি ছোট টেবিল ঢাকনা। আমি ফোন করিনি। টেবিল ঢাকনা দিয়ে আমার টিসু বাক্সটি ঢেকে রাখি। ও আমার অপরাধ স্মরণ করিয়ে দেয়।


আলোকচিত্রীঃ প্রিসিলা রাজ


আলোকচিত্রীঃ প্রিসিলা রাজ


আলোকচিত্রীঃ প্রিসিলা রাজ
অজানা ফুল
হেঁটে হেমায়েতপুর

আকন্দ
আকন্দ কথকতা

উজনি
উজনির ঝিনঝিন

কড়াইশুঁটি
কড়াইশুঁটির বিস্ময়

কাউয়াঠুকরি
ফিবোনাক্কির কেরামতি

কানফুল
শুভ্র কানফুল

চুনিয়াঝোরার ফুল
চুনিয়াঝোরার ফুল

তৃণাক্ষী
তৃণাক্ষী

দাঁতরাঙা
পথের ধারে দাঁতরাঙা

ধূসর, সবুজ ও নীল ফুল
চুনিয়াঝোরায় ধূসর, সবুজ ও নীল

পটল ফুল
বুড়ার দাড়ি

পাঁচ পাপড়ির ফুল
পাঁচ পাপড়ির পদ্য

পুঁতিফুল
পুঁতিফুল

বনদোপাটি
বনদোপাটি?

বেগুনি ফুল
তিন পাপড়ির ফুল

বেগুনি হুরহুরি
আহ্ হুরহুরি!

বেরেলা
বেরেলা, কুরেটা অথবা উরুশিয়া

বড় আমরুল
বড় আমরুল

মায়াংবা ফুল
মায়াংবার মায়ায়

লাইশাক
লাইশাক ও কয়েকটি সকাল

শশাফুল
ব্রহ্মপুত্রে শশাফুল

শেরামণি
শেরামণি ও শার্শার নসুবালা

সাদা ফুল
মডেল পুক

সোনাফুল
চাম্পারাইয়ে থার্টি

হাতিশুঁড় ফুল
হাতিশুঁড়

হালকা বেগুনি ফুল
দাঁতাল

সাপলুডুর অন্যান্য সংখ্যায় প্রকাশিত ফুলসমূহ
Untitled Document