Untitled Document
ফুল
লাইশাক ও কয়েকটি সকাল
- প্রিসিলা রাজ

এক মধ্য সকালে অজন্তার উঠানে বসেছিলাম। পৌষ মাস। রোদে পিঠ দিয়ে মাথায় কিছু চাপিয়ে ল্যাপটপে কাজ করার মজা বেশ চেখে চেখে উপভোগ করছিলাম। এমন সময় প্রিন্স নিঃশব্দে কখন এসে দাঁড়িয়েছে টের পাইনি। প্রিন্স প্রধান অজন্তার প্রতিবেশী দম্পতির ছেলে। সাত-আট বছরের গম্ভীর ছেলেটির আমাকে খেলার সাথী হিসাবে বেশ পছন্দ হয়েছে। সকাল নেই বিকাল নেই ব্যাডমিন্টন র‌্যাকেট নিয়ে এসে হাজির হচ্ছে। আমার কাজকর্মের কিছু অসুবিধা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ওকে না বলতে পারছি না। ল্যাপটপটা গুছিয়ে রেখে ওর সঙ্গে খেলায় নেমে পড়ি। সাধারণতঃ অজন্তার উঠানেই খেলা হয়, এবার ও আমাকে ওর বাসায় খেলতে নিয়ে চলল। এই বুড়োধাড়িকে বাড়ির ভেতরে দেখে ওর বাপ-মা কী বলবে ভাবতে ভাবতে ওর বাসায় ঢুকলাম।

বাসার হাতা বেশ বড়। আমার মণিপুরী বন্ধু অজন্তাদের জমি বেদখল করে এলাকার কিছু বাঙালি মসজিদ উঠিয়েছে আর এই বাড়ি বানিয়েছে। অজন্তারা এ নিয়ে মামলা করাতে ওদের ওপর আক্রমণ করেছে, ওরা রাস্তায় বের হলে ওদের লোকজন আশপাশ দিয়ে যেতে যেতে বলে যায়, ‘ভাল চাস তো ইন্ডিয়া চলে যা।’ আমি প্রতিবারই এসে এসব দেখে আর শুনে যাই।

বেদখলদার লোকগুলোর কাছ থেকে প্রিন্সরা বাড়িটা ভাড়া নিয়েছে। প্রিন্সের বাবা নেপালী, মা বাঙালি। সম্প্রতি জানতে পেরেছি সীমান্তের ওপার থেকে অনেক নেপালী নারী-পুরুষ কাজের খোঁজে এদিকে আসেন, অনেকে বিয়ে করে সংসার পাতেন। এঁদের স্থানীয় পরিচয় নেপালী হলেও তাঁরা জাতিগতভাবে নেপালী নাকি নেপাল থেকে এসেছেন বলে এই নাম জানতে পারিনি।

প্রিন্স আমাকে বাড়ির কিছুটা পেছনে নিয়ে যায়। সেখানে ওর বাবা শাক-সবজির চাষ করেছে। সকালের রোদে তার একটা পাশ ঝিকিয়ে উঠছে। লাল শাক আর মুলা বা সরিষা শাক বেশি চোখে পড়ছে। খেলাধূলার পর প্রিন্সের মায়ের সঙ্গে কথা হলো। ভদ্রমহিলা বাইরের কলে কাপড় কাচতে এসেছিলেন। ছেলের মতোই চুপচাপ, শান্ত। জানালাম আমার ক্ষেতটা খুব ভাল লেগেছে।

বাসায় এসে দেখি কোন ফাঁকে যেন প্রিন্সের বাবা সেই সরিষা না মুলা শাক অনেকগুলো দিয়ে গেছেন। অজন্তা আমার ভুল শোধরাল, ওগুলো লাইশাক। অ, এগুলোই তাহলে লাইশাক। সিলেটিদের নাকি সাঙ্ঘাতিক প্রিয় এই শাক। অজন্তার মা মণিপুরী পদ্ধতিতে রান্না করে খাওয়ালেন - মন্দ না।

আমাদের দেশের এই এক বেশ মজার ব্যাপার। এইটুকু একটা দেশে একেকটা অঞ্চলে গেলে সেখানকার দু’য়েকটা নিজস্ব শাক-সবজি বা ফল চোখে পড়ে যা আর কোথাও পাওয়া যায় না বা অন্যান্য অঞ্চলের লোকেরা খায় না। রংপুর-পঞ্চগড়-গাইবান্ধা এসব এলাকায় যেমন নাপা শাক খুব প্রিয়। সেটার কথা উত্তরবঙ্গের বাইরে আর কয়জনই বা জানে? সিলেটের সাতকড়ার কথা অবশ্য এখন সবাই জানে যদিও অ-সিলেটিদের হেঁসেলে এর এখনও জায়গা হয়নি। বাজার থেকে সাতকড়ার আচার কিনে এনে খায় এই যা। আবার পার্বত্য চট্টগ্রামে দেখেছি একটা শাক খেতে যেটা সারা বাংলাদেশে পাওয়া গেলেও কাউকে খেতে দেখিনি। সেটাকে চাকমা ভাষায় বলে উযনি। আমাকে উত্তরবঙ্গের কেউ কেউ অবশ্য বলেছে একসময় গ্রামের লোক সেটা খেত। গাছটাকে সেখানে শুষনিশাক বলে। এরকম নিশ্চয়ই আরো আছে।

এ বছরের মাঘ মাসে সিলেট গিয়ে দেখি অজন্তা নিজের আঙিনায় লাইশাক চাষ করেছেন। মাটি ভাল না তাই ফলন বেশি সুবিধার হয়নি। অনেকগুলো গাছে ফুল এসেছে। গাছ আর ফুল দু’টোই একদম সরিষার মতো। কে বলবে এটা সরিষা গাছ না! বলতে ভুলে গেছি লাইশাকের স্বাদও কিন্তু সরিষা শাকের মতোই। তবে এর পাতার স্বাদ কাঁচা অবস্থায় বেশ ঝাঁঝাল যেটা সরিষা পাতায় নেই।

লাইফুলের হলুদ বড় আনন্দকর। যে ক’দিন থাকলাম তার প্রতিদিনই দিনের বিভিন্ন আলোয় তার ছবি তুললাম। দেখুন তার কয়েকটি।


আলোকচিত্রী : প্রিসিলা রাজ


আলোকচিত্রী : প্রিসিলা রাজ


আলোকচিত্রী : প্রিসিলা রাজ
অজানা ফুল
হেঁটে হেমায়েতপুর

আকন্দ
আকন্দ কথকতা

উজনি
উজনির ঝিনঝিন

কড়াইশুঁটি
কড়াইশুঁটির বিস্ময়

কাউয়াঠুকরি
ফিবোনাক্কির কেরামতি

কানফুল
শুভ্র কানফুল

চুনিয়াঝোরার ফুল
চুনিয়াঝোরার ফুল

তৃণাক্ষী
তৃণাক্ষী

দাঁতরাঙা
পথের ধারে দাঁতরাঙা

ধূসর, সবুজ ও নীল ফুল
চুনিয়াঝোরায় ধূসর, সবুজ ও নীল

পটল ফুল
বুড়ার দাড়ি

পাঁচ পাপড়ির ফুল
পাঁচ পাপড়ির পদ্য

পুঁতিফুল
পুঁতিফুল

বনদোপাটি
বনদোপাটি?

বেগুনি ফুল
তিন পাপড়ির ফুল

বেগুনি হুরহুরি
আহ্ হুরহুরি!

বেরেলা
বেরেলা, কুরেটা অথবা উরুশিয়া

বড় আমরুল
বড় আমরুল

মায়াংবা ফুল
মায়াংবার মায়ায়

লাইশাক
লাইশাক ও কয়েকটি সকাল

শশাফুল
ব্রহ্মপুত্রে শশাফুল

শেরামণি
শেরামণি ও শার্শার নসুবালা

সাদা ফুল
মডেল পুক

সোনাফুল
চাম্পারাইয়ে থার্টি

হাতিশুঁড় ফুল
হাতিশুঁড়

হালকা বেগুনি ফুল
দাঁতাল

সাপলুডুর অন্যান্য সংখ্যায় প্রকাশিত ফুলসমূহ
Untitled Document