Untitled Document
হালোই গান
- অনুপম হীরা মণ্ডল
বাংলাদেশের লোকসঙ্গীতের একটি অন্যতম গান হলো ‘হালোই গান’। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে বিশেষ করে যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, বরিশাল, ফরিদপুর, বাগেরহাট, মাগুরা, নড়াইল অঞ্চলে এই গানের প্রচলন দেখা যায়। তবে বৃহত্তর যশোর-খুলনা অঞ্চলে এর প্রচলন বেশি। এই গানের মধ্যে আঞ্চলিক ধর্ম বর্তমান। এই অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা এবং লোকাচার এর সঙ্গে যুক্ত। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ‘হালোই গান’-এর প্রচলন দেখা যায় না। সুরের স্বাতন্ত্য এবং পরিবেশনের অভিনবত্ব এর আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যের কারণ। গানটির নাম করণের ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে বলা যায় ‘হাল’ বা নাঙ্গল থেকে এই গানের নামকরণ হয়েছে। এটি কৃষি সমাজের গার্হস্থ্য জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাই যারা হাল চাষ করে বা ‘হালি’ বা ‘হালোই’ তাদের গান বলেই এর নাম ‘হালোই গান’ হয়েছে। বাগের হাট অঞ্চলে এই গানের একটি ভিন্ন নাম পাওয়া যায়। বাগেরহাটের রামপাল ও চরবানিয়া অঞ্চলে একে ‘সাতপাল’ গান বলে। সাতপাল অর্থে সাতটি পালা হতে পারে। আবার সাতজনের পালা হতে পারে। তবে এই গানের সঙ্গে এধরনের কোনো সংশ্রব লক্ষ করা যায় না। তবে ‘সাতপাল’ নামটি কেনো হয়েছে তা জানা যায় না। তবে ধারণা করা যায় অতীতে হয়তো সাতজনের এক একটি দল করে এই গান গাওয়া হতো তাই এর নাম ‘সাতপাল’ হয়েছে। বর্তমানে এরকম সদস্য সংখ্যা নিয়ে কোনো দলের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না।

এটি একটি ঋতুধর্মী গান। গানের সময় শীত কাল। শীতকাল ব্যতিত অন্য কোনো সময় ‘হালোই গান’ পরিবেশন করতে দেখা যায় না। তবে শীতকাল হলেও সমস্ত শীত মৌসুম জুড়ে গান পরিবেশিত হয় না। কেবল পৌষ মাস জুড়ে এই গান চলে। বিশেষত এই সময় ধান কাটা মৌসুম। পৌষ মাসে কৃষকের ফসল ঘরে ওঠে। কোথাও কোথাও ফসল তোলা শেষ হয়ে যায়। তখন তাদের হাতে প্রচুর সময় থাকে। পৌষমাস ধরে গ্রামের সঙ্গীতানুরাগী ব্যক্তিরা ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের নিয়ে এক একটি গানের দল গড়ে তোলে। তারা বিভিন্ন সাজে নিজেদেরকে সাজিয়ে নেচে-নেচে এই গান পরিবেশন করে। সাধারণত রাধা-কৃষ্ণ এবং রাধার সখীদের সাজে এই গান পরিবেশন করা হয়। গানের বিষয়বস্তু রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকাহিনি। যেমন,


বেলা দুই প্রহরের কালে

বাঁশি বাজলো রাই বলে।

আমি কেমনে যাই বলো

ওই কদম্বের তলে ॥

বেলা দুই ... ... ...রাই বলে ॥


বাঁশির হলো মরণ দশা

ননোদিনী আমার পাশে বসা।

আমার মনের সকল আশা

দিলাম জলে এই অকালে ॥

বেলা দুই ... ... ...রাই বলে ॥


মরণ নাই তোর সর্বনাশা

আমার হলো মরণ দশা।

কুল গেলো আর ঘর গেলো মোর

দেখে পাড়ার লোকে বলে ॥

বেলা দুই ... ... ...রাই বলে ॥




এই গানের সুরের একটা আলাদা ঢং এবং চলন আছে। অত্যন্ত সরল ও শুদ্ধ স্বরের মধ্যে সুরের ওঠা-নামা চলে। কোথাও উচ্চগ্রামে গিয়ে বা চিতানে গিয়ে জোরারোপ করার চেষ্টা নেই। এর বাণীতেও আছে সহজ সরল বৈশিষ্ট্য। কোথাও জটিলতা বা আড়ম্বরতা নেই। নর-নারীর সহজ-সরল প্রেম-কাহিনিই এই গানের প্রধান অবলম্বন। তবে সেই প্রেম কথা বর্ণনা করতে গিয়ে কোথাও অশ্লীলতা বা ভাড়ামির আশ্রয় করা হয় না। গ্রামের সকল বয়সের নারী পুরুষ নিজেদের গার্হস্থ্য জীবনের মধ্যে থেকে গান শোনে। বাহবা দেয়। উৎসাহ যোগায়। হালোই গানের প্রধান আকর্ষণ হলো ছোট-ছোট ছেলে-মেয়েদের নাচ। নিজস্ব এবং সহজ সরল মুদ্রা পরিবেশন করে তারা গানটিকে অসাধারণ আবহ তৈরীর মধ্যে পরিবেশন করে। তারা এক বাড়ি হতে অন্য বাড়ি গান পরিবেশন করে। কখনো কখনো একাধীক গান পরিবেশন করতে দেখা যায়।

দলের মধ্যে একজন হারমোনিয়াম বাদক থাকে। যাকে সরকার বা মাস্টার বলা হয়। এছাড়া থাকে জুড়ি বা করতল বাদক। ঢোল বাদক। বাঁশি বাদক। বেহালা বাদক। দোতারা বাদক। গ্রামের মানুষ তাদের নিজেদের বাড়িতে বসেই এই গানগুলো শুনতে পারে। এর জন্য তাদের বাড়তি সময় ব্যয় করতে হয় না। কাজের মধ্যে থেকেই তারা এই গান শুনতে পারে। এর জন্যে এই গানের কদরও খুব বেশি। প্রতিটি বাড়িতে ৫ থেকে ৭ মিনিটের মধ্যে গান পরিবেশন শেষ হয়।

গান শেষে বাড়ির কর্তা বা কর্তৃ চাল-ডাল-তরকারী দেয়। এই মাঙন শেষে পৌষ সংক্রান্তির দিন গ্রামের বারোয়ারি তলার প্রসাদ বিতরণ করা হয়। এই সময় গ্রামের আর সকলকে নিয়ে বনভোজনের আয়োজন চলে। সেখানেই চলে এক একটি দলের গানের প্রতিযোগিতা। বিভিন্ন পাড়ার গানের দলের মধ্যে এই প্রতিযোগিতা হয়। সন্ধ্যায় বাস্তুদেবীর উদ্দেশ্যে ফুল-জল এবং প্রসাদ বিতরণ করা হয়। এই বস্তুদেবী হলেন ‘দেবী লক্ষ্মী’। তিনি ধনের দেবী, গৃহ বা বাস্তুদেবী। তাকে উদ্দেশ্য করে এই গানের আয়োজন বা পরিবেশনা। পৌষ সংক্রান্তি পালনের মধ্য দিয়ে ‘হালোই গান’-এর পর্ব শেষ হয়। আবার অপেক্ষ করতে হয় পরবর্তী বছরের পৌষের জন্য।
অনুপম হীরা মণ্ডল এর অন্যান্য লেখাসমূহ
Copyright © Life Bangladesh সাপলুডু মূলপাতা | মন্তব্য Contact: shapludu@gmail.com