Untitled Document
সিআরএসি আন্তর্জাতিক আর্ট ক্যাম্পের পাঁচ বছর : এ যেন সমাপ্তিহীন ইতি
- অনার্য তাপস
বিশাল পুকুরের ধারে সারি সারি গাছ। গাছের ফাঁকে ফাঁকে কিছু ইনস্টলেশন, যেগুলোর ছায়া পুকুরের টলটলে জলে একধরণের মায়াময়তা তৈরি করে। ছোট ছোট ঢেউয়ের ভেলায় চড়ে এই মায়াময় ছায়াগুলো পাঁচ বছরে পদার্পন করে ঘোষণা করে ‘এ যেন শেষের শুরু সবটুকু শেষ নয়।’ শিল্পরসিক এবং শিল্পীদের ‘সবটুকু শেষ’ না হওয়ার ঘোষণা দিয়ে শেষ হয়ে গেল সিআরএসি আন্তর্জাতিক আর্ট ক্যাম্পের ২০১১ সালের আয়োজন।

দেশি ও বিদেশী বিশ জন শিল্পীর অংশগ্রহণে ২০১১ সালের আর্ট ক্যাম্পের থিম ছিল ‘খাঁচা, পাখি ও আমি।’ অদ্ধাত্মবাদ, মানবতাবিরোধী শক্তির প্রতি ঘৃণা, মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্ব, বিশ্বায়ন ও কর্পোরেট দুনিয়ার অসারতা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন, ভৌগোলিক সীমানার সংকীর্নতাসহ বিবিধ বিষয়কে মূলত ইনস্টলেশন ও পারফর্মিং আর্টের উপর ভিত্তি করে উপস্থাপন করা হয় এই মাল্টি ডিসিপ্লিনারি আর্ট ক্যাম্পে। প্রতিবছরের মতো এবারও স্থানীয় সহজলভ্য পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার করা হয় শিল্পকর্ম নির্মাণের ক্ষেত্রে। এই ক্যাম্পটির গোড়ার কথাই ছিল স্থানীয় সহজলভ্য পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার করে শিল্প নির্মাণ এবং শিল্পকলাকে আভিজাত্যের গণ্ডি থেকে টেনে নামিয়ে ‘বারো দুয়ারে’ সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে আসা। শিল্পের সাথে সাধারণ মানুষের মিথষ্ক্রিয়ার গল্পকে বাস্তব রূপ দেওয়া। সিআরএসি আন্তর্জাতিক আর্ট ক্যাম্পের পাঁচ বছরের আয়োজন সেই নিরীক্ষাকে সফল করেছে বলা চলে। তবে প্রতিবারের আয়োজনের চেয়ে ২০১১ সালের আয়োজন ছিল কিছুটা ভিন্ন। এবারই প্রথম একজন কিউরেটরের মাধ্যমে আর্ট ক্যাম্পটি পরিচালিত হয়। এই ক্যাম্পে কিউরেটর হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেন শিল্পী রাহুল আনন্দ এবং ২০১২ সালের জন্য কিউরেটর মনোনীত করা হয় শিল্পী আবদুস সালামকে। আর্ট ক্যাম্পের থিম ভিত্তিক কাজ করার প্রয়াসও শুরু হয় এবার থেকে। অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা ‘খাঁচা, পাখি ও আমি’ এই থিমটিকে কেন্দ্র করে নির্মাণ করেন তাদের শিল্পকর্ম।

সিআরএসি আন্তর্জাতিক আর্ট ক্যাম্প ২০১১ এর অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা ছিলেন রাহুল আনন্দ, কনক আদিত্য, শাওন আকন্দ, শতদ্রু শোভন বাঁদুড়ী (ভারত), কৌস্তভ নাগ (ভারত), দেবাশীষ বাড়–ই (ভারত), জেম, জয়া শাহরিন হক, আবদুস সালাম, শাহ আসিফ, বন্যা, অনন্ত কুমার দাস, বিজয়, প্রজ্ঞা তাসনুভা রূবাইয়াৎ, জার্নাল, আ.ছা.ই.ম. সায়েম হোসেন, তানজিনা খানম, পলাশ চৌধুরী, দেলোয়ার হোসেন, অনার্য তাপস, শেখ সাব্বির, মাহবুবুর রহমান, সাদিয়া নিজাম, রাজন।

পঞ্চম আয়োজনের উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর মধ্যে ছিল শিল্পী আবদুস সালামের ‘ম্যাজিক বক্সÑ হোয়াট উই আর ওয়াচিং’, জয়া শাহ্রিন হকের ‘ক্যাপচার’, শতদ্রু শোভন বাঁদুড়ীর ‘বাঁধায় বাধ সাধা বন্ধনের গায়ে মুক্তির বুদ বুদ’ এবং ‘এক পা হাঁটা, দুই পা হাঁটা, ভালোবাসায় অনেক পথ হাঁটা’, কৌস্তভ নাগের ‘বংবাং’, দেবাশীষ বাড়–ইয়ের ‘হৃদতরঙ্গ’, বন্যার ‘চক্র’, প্রজ্ঞা তাসনুভা রূবাইয়াতের ‘খাঁচার ভেতর কেÑ তুমি নাকি আমি’, শেখ সাব্বিরের ‘হানটিং’, আ.ছা.ই.ম. সায়েম হোসেনের ‘ইন্ডলেস ইন্ডিং’ এবং ‘অস্বিত্ব, অনস্তিত্বের বৃত্তে’, তানজিনা খানমের ‘বাস্তবতা ও স্বপ্ন ও আমি’, পলাশ চৌধুরীর ‘স্বলুপ্ত’, জার্নালের ভিডিও ইনস্টলেশন ‘টু বি অর নট টু বি’, সাদিয়ার ‘সব পাখিই খাঁচা, সব খাঁচাই পাখি।’ পারফর্মি আর্টের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল রাহুল আনন্দের ‘ইনসাইজ- আউট সাইড’ এবং কনক আদিত্যের মিউজিক্যাল শো।

সীমান্তে কাঁটাতার বা শিকারী কুকুর, মর্টার কিংবা কামান যাই থাক, মানুষ তার জন্মভূমিকে, পূর্বপুরুষের ভিটেমাটিকে ভুলতে পারে না। ভারতীয় তরুণ শিল্পী কৌস্তভ নাগ তাই একটি কৃত্রিম ম্যাপে দুই বাংলার সীমানাকে একেবারে শূন্য করে দিয়ে বোঝাতে চাইলেন সারা পৃথিবীর পরিয়াযী মানুষের কষ্ট একই রকম। কৌস্তভের পূর্বপুরুষের ভিটেবাড়ি পূর্ববাংলার সন্দ্বীপ। কিন্তু তার বেড়ে ওঠা, স্বপ্ন দেখার জায়গা পশ্চিমবাংলা। জীবনের প্রথম পুর্বরুষের ভিটেবাড়ির ঘ্রাণ নিতে এসে যে যান্ত্রিক আর রাজনৈতিক বিভেদের শিকার হলেন শিল্পী তারই ছোঁয়া থেকে গেল তার ‘বংবাং’ শিরোনামের কাজে। আরেক ভারতীয় শিল্পী দেবাশীষ বাড়–ইয়ের কাজেও একই রকম ছোঁয়া পাওয়া যায়। দেবাশীষ ‘হৃদতরঙ্গ’ শিরোনামের যে ইনস্টলেশনটি করেছিলেন, সেখানে দেখা যায়, মরা লতাপাতায় তৈরি করা একটি চারকোণা বাক্স থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় জল চুঁইয়ে চুঁইয়ে একটি মাটির পাত্রে পড়ে নীল রঙ ধারণ করছে। পাত্রে জল পতনের সাথে সাথে একটা তরঙ্গ আঘাত করছে মাটির পাত্রটি গায়ে। নানাভাবে, নানা প্রতীকের আবরণে বর্ণনা করা যায় তার এই কাজটি। হতে পারে সেটি উন্মিলিত শেকড় একটি মরা গাছ কিংবা প্রচণ্ড রাজনৈতিক প্রতাপের বিরুদ্ধে এক অর্বাচিন তরুণের মৃদু প্রতিবাদ। দেবাশীষের পূর্বপুরুষের ভিটেও পূর্ববাংলার বরিশাল। ভারতের অপর শিল্পী শতদ্রু শোভন বাঁদুড়ী অবশ্য কসমোপলিটন নগরি দিল্লীর পণ্য আর বিপণনের খাঁচায় আবদ্ধ নাগরিক জীবনের মুক্তির কথা বলেছেন তার শিল্পকর্মে। অবশ্য শতদ্রুর দুটি কাজেই বাংলাদেশের নগর জীবনের ক্রমবর্ধমান হতাশা, ক্ষোভ এবং যন্ত্রণার ছাপও পাওয়া যায় ব্যবহৃত প্রতীকের আড়ালে।

প্রদর্শনের রাজনীতি সিদ্ধ করার অন্যতম অনুষঙ্গ দূরদর্শন তথা টেলিভিশন বর্তমান সময়ে সারা পৃথিবীকে এক মায়াময় খাঁচায় আবদ্ধ করে রেখেছে। এটি আমাদের মস্তিস্ককে নাগপাশের মতো বেঁধে রেখেছে। শিল্পী আবদুস সালাম মনে করেন এই টেলিভিশন খাঁচায় আবদ্ধ আমরা। এই মেজিক বক্স আমাদের যাই দেখায়, যাই বোঝায় আমরা সেটা দেখতে এবং বুঝতে বাধ্য হই। কুর্পোরেট দুনিয়ার পণ্য, সেই পণ্য বিপননে পুনশ্চ মানুষের পণ্য বনে যাওয়া সুশীল সমাজের ‘বাণী চিরন্তনী’ও ঠেকাতে পারে না। পণ্য-প্রদর্শন-বিপনন, এই ত্রয়ীর বিকল্প হিসেবে আমাদের আর কোন অপশন নেই।

মানুষের বৈবাহিক জীবনের যে জটিলতা তা থেকে মুক্ত থাকে যৌথ জীবন থেকে আগত শিশু। কিন্তু সময় অতিক্রমের মধ্য দিয়ে শিশুটিও জীবনের সমস্ত জটিলতার চক্রে উপনীত হয়Ñ এই ধারণাকে কেন্দ্র করে শিল্পী বন্যা নির্মাণ করেন তার ইনস্টলেশন আর্ট ‘চক্র’। মৃত্যুতেই সব শেষ হয়ে যায় না। একটি জীবন কাল ছেড়ে মহাকালে অনন্ত হয়ে ওঠে কর্মে সাধনায় সৃষ্টিতে। ‘ইন্ডলেস ইন্ডিং’ শিরোনামের ইনস্টলেশন আর্টে শিল্পী সায়েম হোসেন সেটিই ব্যক্ত করতে চাইলেন। শিল্পী লিখলেন, ‘দেহ খাঁচা ছেড়ে যবে প্রাণ পাখি উড়ে যায়/ দেহখানি তব পুরে দেয় ভিন্ন খাঁচায়।/ জগতের কর্মযজ্ঞে তবু কেউ বেঁচে রয়/ এ যেন শেষের শুরু সবটুকু শেষ নয়।/ এ যেন সমাপ্তিহীন ইতি।’ তার আরেকটি কাজ ‘অস্বিত্ব, অনস্তিত্বের বৃত্তে।’ বিভিন্ন রঙের কাপড় দিয়ে অনেক কাকতাড়–য়া তৈরি করে সায়েম প্রতীকের মাধ্যমে বলতে চাইলেন, মিডিয়া, সেক্স, পারফিউম, চাঁদতারার জুজু, পদ্ম ও চাকার গল্প, বিশ্বব্যাংক, আকাশ সংস্কৃতি ইত্যাদির খাঁচায় আবদ্ধ তার সমকালের মানুষ। তবে সবকিছুর উর্দ্ধে থাকা সাদা রঙের কাকতাড়–য়া জানান দেয়, শুদ্ধতাই মহৎ, শুদ্ধতাই শ্রেষ্ঠ। শিল্পী তানজিনা খানম স্বীকার করেন যে, মানুষ কখনো কখনো তার নিজের খাঁচাতেই আবদ্ধ হয়ে পড়ে। তার স্বপ্ন পাখা মেলতে পারে না তার নিজের কারণেই। কেন? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সেই জানে। অন্য কেউ নয়। ‘বাস্তবতা, স্বপ্ন ও আমি’ শিরোনামে নির্মাণ করা তারজিনার কাজটি নিজের ভেতরের জটিল মনস্তাত্ত্বিক নাগপাশে বন্দী হওয়া মানুষের গল্পই শোনাল দর্শকদের।

জার্নালের ভিডিও ইনস্টলেশন ‘টু বি অর নট টু বি’ ছিল ইন্টার‌্যাকটিভ ধর্মী কাজ। লুকানো ক্যামেরায় ধরাপড়া নিজের চেহারা আর অভিব্যক্তি সাদা পর্দায় দেখে হঠাৎ থমকে থমকে দাঁড়ালো ক্যাম্পে আগত দর্শক। আপাত স্বাধীন একটি সত্ত্বা দেখল চতুষ্কোণ পর্দার চার বাহুর দখলে বন্দী নিজের প্রতিরূপ। এই প্রতিমা কিছুক্ষণ হাসল, মুখ ভ্যাংচালো, ভ্রু নাচালো, দাঁত দেখালো তারপর চলে গেল।

ইনস্টলেশন, পারফর্মিং আর্ট, ভিডিও আর্ট Ñশিল্পের বিবিধ শাখার মিশেলে এক বৈচিত্রময় আনন্দের স্বাদ পাওয়া যায় সিআরএসি আর্ট ক্যাম্পের পঞ্চম আসরে। ২০০৭ সালের প্রথম আয়োজন থেকেই এই আর্ট ক্যাম্পটি ছিল একটি নিরীক্ষাধর্মী মাল্টি ডিসিপ্লিনারি ক্যাম্প। শুধু শিল্পীরাই শিল্প নির্মাণ করবেন এমন ধারণার একশো হাত দূরে থেকে এই ক্যাম্পে কবি, ফটোগ্রাফার, গবেষক, সংগীত শিল্পী, সাংবাদিক, চিত্রাভিনেতা, চিত্রনির্মাতারা অংশগ্রহণ করতে থাকেন। শিল্পকর্ম যে শুধু নিবিড় অনুশীলনের বিষয় নয় বরং অনেক বেশি মাত্রায় মন্ময় সেটিই যেন প্রমাণ করে ছেড়েছে সিআরএসি আন্তর্জাতিক আর্ট ক্যাম্প গত পাঁচ বছর ধরে। একারণে বাংলাদেশের আর্ট ক্যাম্প সংস্কৃতিতে একটা নতুন মাত্রও যুক্ত করতে পেরেছে এই ক্যাম্পের আয়োজকগন।
অনার্য তাপস এর অন্যান্য লেখাসমূহ
Copyright © Life Bangladesh সাপলুডু মূলপাতা | মন্তব্য Contact: shapludu@gmail.com