Untitled Document
শিল্পকলায় নাচ: পটভূমি বাংলাদেশ
- দীপ্তি রানী দত্ত
বাংলাদেশের শিল্পকলায় নাচের ব্যবহার প্রাচীন ও আধুনিক এই দুটি কালিক পরিধিতে বিবেচনা করা যেতে পারে। আবার প্রাচীন কালে বর্তমান বাংলাদেশের ভূ-খন্ডে শিল্পকলার শ্রেণিবিভাজন করলে লোকশিল্পের আধিপত্যই প্রখর। সেখানে অভিজাত শিল্পের ধারা যতটুকুই এসে পৌঁছেছে তা কেন্দ্রীয় শাসনের সীমান্তের অপভ্রংশের ন্যায় লৌকিক কাঠামোকেই প্রধান আশ্রয় হিসেবে গ্রহন করেছে। তাই বাংলাদেশে অর্থনৈতিক কাঠামো নির্ভর শিল্পের শ্রেণি নির্মাণ করলে তাতে প্রাচীনকালে শিল্পের প্রধান এলাকা লোকশিল্প এবং অভিজাত শিল্পের বদলে পাই এই দুটোর মধ্যবর্তী প্রায় একটি মিশ্র ধারা। এই অভিমত প্রায় প্রতিষ্ঠিত পাহাড়পুর-ময়নামতি এসব স্থাপত্যের শিল্পসমালোচনায়।
বাংলাদেশের প্রাচীন কালের যেসব স্থাপত্যের দেখা মেলে তার মধ্যে পাহাড়পুর বা সোমপুর বিহার, কুমিল্লার ময়নামতিতে শালবন বিহারের কেন্দ্র অংশ এবং বগুড়ার মহাস্থানগড়ে অষ্টম শতাব্দীতে নির্মিত মন্দির। এছাড়া ১৭৫২ সালে নির্মিত কান্তজির মন্দির উল্লেখযোগ্য যা প্রাচীন না হলেও আলোচ্য বিষয়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। অষ্টম শতাব্দী পরবর্তী সময়ে আমরা আরো বহু স্থাপত্যের নিদর্শন পাই বাংলাদেশে বিশেষ করে মোঘল সময়কালে কিন্তু তা দর্শনগত কারণে ভিন্ন পথের যাত্রী।
পাহাড়পুরের বিহারের গায়ে প্রচুর ফিগারেটিভ রিলিফ ভাস্কর্য দেখা যায়। তার মধ্যে নৃত্যরত ফর্মে বিষয় বৈচিত্র্যে তিনটি প্রকার লক্ষ্যণীয়- মানুষ ও পশুর একক এবং এইদুইয়ের মিশ্ররূপ। আবার নৃত্যের ভঙ্গিমার ক্ষেত্রে ত্রিভঙ্গের আধিপত্য যা প্রাপ্ত নির্দশনের মধ্যে সাঁচি বা ভারহুত স্তূপের শালভঞ্জিকায় প্রথম দেখা যায়। শালভঞ্জিকা সদৃশ ফর্মও সরাসরি পাহাড়পুরের টেরাকোটায় দেখতে পাওয়া যায়। যেখানে কান্তজির মন্দিরের তুলনায় নারীর একক নৃত্যের উপস্থিতি কম এবং নারী দেহকে বিশেষায়িত করা হয়নি প্রাচীন ভারতীয় মন্দির ভার্স্কয বা উর্বরাশক্তির প্রতীক ভাস্কর্যগুলোর ন্যায়। অথচ মানুষ ও পশুর ফর্মের মিশ্রনে এক বৃহৎ ফ্যান্টাসির জগৎ তৈরি করেছেন পাহাড়পুরের শিল্পীরা। পশুর একক ফর্মগুলোতেও যুক্ত হয়েছে নৃত্যের ভঙ্গিমা। অজন্তা গুহা চিত্রে একইভাবে সচল পশুফর্মের দেখা মেলে। আকৃতির ভিন্নতা ছাড়া প্রাণের অস্তিত্ত্বে জীব মাত্রই একসত্ত্বা হয়ে উঠেছে যেন। সকলেরই এই চিত্রগল্পে যে ভূমিকা আছে তা দর্শক দেখা মাত্রই অনুভব করতে পারেন। আজকের দিনের ত্রি-ডি অ্যানিমেশনের ধাতব নায়ক চরিত্রের মতো ফুল-পাখি-মানুষ সকলেই অনুভূতিপ্রবণ। তুলনায় কান্তজির মন্দিরে


চিত্র: পাহাড়পুরের রিলিফ ভাস্কর্য

মানুষের গল্প প্রধান হয়ে উঠেছে। নাচের ফর্মের আধিক্য মন্দির বাস্তবতার খোঁজ করতে বলে। লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে দুটি স্থাপত্যেই নৃত্য ভঙ্গিমার প্রাচুর্য থাকার পরেও উপস্থাপন শৈলীতে একটি বড় পার্থক্য বিশেষভাবে চোখে পড়ে। যা স্থাপত্য সময়কালের ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত বলেই মনে হয়। বাস্তবতাটি হচ্ছে একটি বিহার অন্যটি মন্দির। পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের শিল্পকর্মের প্রাণস্পন্দনের সাথে অনেক বেশি মিল খুঁজে দেখা যেতে পারে অজন্তা গুহাচিত্রের। আবার কান্তজির মন্দিরের সাথে একক তুলনা না করে প্রাচীন বিভিন্ন ভারতীয় মন্দিরের নৃত্যভঙ্গিমার সমাবেশ বলা যেতে পারে। তবে ভারহুত ও সাঁচি স্তূপের ত্রিভঙ্গ যেমন পরে গান্ধারে বুদ্ধের জন্মদানের দৃশ্য রূপায়নে ব্যবহৃত হয়েছে তেমনি ব্যবহৃত হয়েছে ভুবনেশ্বরের লিঙ্গরাজা মন্দিরে। উদ্দেশ্যের সাথে যাদের রূপের রকমফের ঘটেছে। শিল্প মাধ্যম ও পৃষ্ঠপোষকতার স্তর ও শিল্পীর যোগ্যতার সাথেও যার সম্পর্ক রয়েছে।


চিত্র: কান্তজির মন্দিরের নাচের দৃশ্য

তাই বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর উপসনাস্থলে যে নৃত্যভঙ্গিমা প্রাণ সঞ্চারী, মন্দিরে তা শৃঙ্গার রসে পূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে শিল্পী স্বাধীনভাবে এসব শিল্পের উদগাতা? নৃত্যের সাথে মন্দিরের সম্পর্ক কি? শিল্পী স্বাধীন না হলে শুধু কি পৃষ্টপোষকের কল্পিত ইচ্ছাতেই এসব শিল্পকর্মের রূপায়ন সম্ভব হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষের হাতে যার সাথে এসবের কোন সম্পর্ক নেই? সম্পূর্ণ কাল্পনিক না হলে এসব দৃশ্যায়নের সাথে বাস্তবতার সংমিশ্রণ ঘটেছে? সেই বাস্তবতা কতখানি স্থানিক ও কতখানি প্রভাবিত? শিল্পী কারা ছিলেন? শিল্পশৈলী নির্মাণে যে সজীব স্বচ্ছন্দ গতি অনুভব করা যায় তা শিল্পীর পরিশীলিত দক্ষতার ছাপ নাকি লৌকিক স্বভাবের সংমিশ্রণ? এপ্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রাচীন শিল্পকলায় নাচের প্রকরণ, তার ব্যবহারের কারণ এবং শিল্পীর সাথে শিল্পের সম্পর্ক অনুসন্ধান করা যেতে পারে। অন্যদিকে এদেশের আধুনিক শিল্পকলায় বিষয়বস্তু হিসেবে নাচ ব্যবহারের কার্যকারণ ও শিল্পীর সাথে বিষয়বস্তুর সম্পর্কের ধরনটিও স্পষ্ট করার পথ সহজ করবে।
দীপ্তি রানী দত্ত এর অন্যান্য লেখাসমূহ
Copyright © Life Bangladesh সাপলুডু মূলপাতা | মন্তব্য Contact: shapludu@gmail.com