Untitled Document
শতবর্ষী গারামচণ্ডী
- অনার্য তাপস
নদীর নাম কাঞ্চমতি। পৌরাণিক আত্রাই থেকে উৎপন্ন হয়ে কোথায় পতিত হয়েছিল আজকের মানুষ তার খবর জানে না। কেমন ছিল কাঞ্চমতির জল- কাক কালো নাকি নীল? যৌবনে কেমন ছিল এর প্রবাহ? আজকের মানুষের কাছে তার কোন স্মৃতি নেই, ছবিও নেই। শুধু প্রাচীন প্রৌঢ়গণ বলেন, শুনছি বাহে, দাদারঘরো তো দেখে নাই। আর হামরা কী দেখমো, কন! না দেখা কাঞ্চমতির সোঁতায় এখন খেলা করে ধান চারার সবুজ। শরতে-গ্রীস্মে সেই সবুজের ঢেউ দেখলে মনে হয়, আসলেই এখানে একটা নদী ছিল। যার নাম ছিল কাঞ্চমতি। সদাগরী নৌকাও বুঝি চলতো। যারা ভূগোল বোঝেন, তারা একনিমিষেই বলে দিতে পারেন- কোন এক কালে এই সোঁতা একটা নদী ছিল। ধরা যাক, তার নামও ছিল কাঞ্চমতি। এই কাঞ্চমতির পূর্বতীরে বর্তমান দিনাজপুর জেলার সদর উপজেলার প্রশাসনিক নিবাসে খোসালপুর গ্রাম। এই গ্রামের পশ্চিম দিকে অর্থাৎ কাঞ্চমতির পূর্ব তীরে জঙ্গলা আর বাঁশ ঝার। একশো বছর পূর্বেও ছিল, এখনও তার কিঞ্চিত নমুনা বর্তমান। এই জঙ্গলা আর বাঁশ বনের মাথা ভেদ করে দূর থেকে দেখা যায় তাল, বেল আর জিগা গাছ। আর চৌচালা একটা পাকা ঘর, সাদা রঙের। না দেখা কাঞ্চমতির পূর্ব তীরের জঙ্গলা আর বাঁশ ঝারের মাঝের ছোট্ট টিলার উপরের এই চৌচালা ঘরটিকে ঘিরে প্রতি বৈশাখের ৮ তারিখ জটলা দেখা দেয় - যেমনটা দেখা দিত আজ থেকে আনুমানিক একশো বছর আগেও। বেটির বিয়াও হওচে না, মা চণ্ডী, দেখিস মা।... মোর বউয়ের ছাওয়া নাই মা, দেখিস।... চাইর বছর মোর ব্যাটার বাওসুলির বিষ, মা বুড়ি, এত দুঃখ দিলু বাহে!... শাস্ত্রহীন এইসব প্রার্থনার বাণী পাক খেয়ে উড়ে যায় প্রাগৈতিহাসিক কোন কালে। এটা যেন একুশ শতক নয় একশো বছর আগের কোন কাল!

কিংবদন্তী এই যে, আনুমানিক একশ বছর পূর্বে ১৯১৮-২০ সালের দিকে আত্রাইয়ের শাখা (স্থানীয় মানুষদের তথ্য) কাঞ্চমতি নদী বেয়ে ভাসতে ভাসতে খোসালপুর গ্রামের নিকটে একটি বাঁশবনের নিচে আটকে যায় কালো রঙের একটি শালগ্রাম শিলা। এই ঘটনার পর খোসালপুর গ্রামের তৎকালীন জোতদার রাজমন দেশীকে চণ্ডীদেবী স্বপ্নে আদেশ দেন শালগ্রাম শিলাটি তুলে একটি মন্দিরে স্থাপন করে পূজার প্রচলন করার। স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে রাজমন দেশী কাঞ্চমতি নদীর পাড়ে মন্দির নির্মাণ করে শালগ্রাম শিলাটি সেখানে স্থাপন করেন। এরপরেই তার বিত্তবৈভব বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। ফলে রাজমন দেশী বিপুল উৎসাহে নতুন বছরের একেবারে শুরুতেই এই গারামচণ্ডী পূজার প্রচলন করেন। কালের গর্ভে কাঞ্চমতি নদী বিলীন হয়েছে। পুরনো সেই মন্দিরটিও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কিন্তু নতুন মন্দিরে এখনও আছে সেই শালগ্রাম শিলাটি। প্রতি বৈশাখ মাসের ৮ তারিখে পূজা হয় রাজমন দেশীর স্থাপন করা শালগ্রাম শিলার। তবে এখন আর শুধু শিলাটির পূজা হয় না। পূজা হয় মৃন্ময় মূর্তির গারামচণ্ডীদেবীর। প্রতিবছর পূজার পূর্বে স্থানীয় কুমারেরা তৈরি করেন মাটির গারামচণ্ডীদেবীর মূর্তি। পূজার শেষে এই মূর্তিটি রাখা হয় পরবর্তী পূজা আসার সময় পর্যন্ত। তবে প্রতিবছর পূজার পূর্বে পুরাতন মূর্তিটি ভাসিয়ে সেখানে নতুন মূর্তি স্থাপন করা হয়। জানা যায়, মৃন্ময় মূর্তি স্থাপন করে চণ্ডীদেবীর পূজার সূত্রপাতও হয় মোটামুটি ৮০-৯০ বছর পূর্বে। সময়ের আবর্তে রাজমন দেশীর উত্তর পুরুষ শশিরাম দেবশর্মার হাতে ন্যাস্ত হয় এই গারামচণ্ডী পূজার ভার। শশিরাম দেবশর্মা বর্তমানে পূজার মূল উদ্যোক্ত হলেও আয়োজনে বারোয়ারি রীতি অনুসরণ করা হয়। প্রায় শতবর্ষী এই পূজায় শুধু বাঙ্গালী হিন্দুরাই অংশগ্রহণ করেন না। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাঁওতাল এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষও এই বারোয়ারি পূজার অংশভাগী।

গ্রাম শব্দটির স্থানীয় অপভ্রংশ গারাম। একারণে এই চণ্ডী পূজার নাম গারামচণ্ডী। গ্রামদেবতার পূজা বাংলা অঞ্চলের বিশেষ করে রাঢ় ও বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রাচীন রীতি। এধরণের পূজা প্রচলনের মূলে রয়েছে গ্রামীণ জীবনের ইহলৌকিক মঙ্গল কামনার বিষয়টি। উল্লেখ করা আবশ্যক যে, গ্রামদেবতার পূজায় পারলৌকিক পূণ্য সঞ্চয়ের আকাঙ্খা রীতি বিরুদ্ধ। এইসব পূজার শাস্ত্রসম্মত কোন বিধিবিধানও নেই। নেহায়েত লোকাচারে ভরপুর। শাস্ত্রসম্মত না হলেও লোকায়ত জীবনের সামাজিক সম্প্রীতি ও মিথষ্ক্রিয়া রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কার্যকর সিস্টেম এটি।

খোসালপুর গ্রামের এই চণ্ডীদেবীর মৃন্ময় মূর্তিটির রূপ উগ্র নয়। বরং এটি কোমল মাতৃভাবাপন্ন। মূর্তিটির ডান হাতে একটি লাঠি আছে। পরনে আছে শাড়ি। আর কোন অস্ত্র বা সাজসজ্জা নেই। এলোচুলে গৌরবর্ণের চণ্ডীদেবী আটপৌরে বাঙ্গালী নারীর প্রতিমূর্তি। স্থানীয় মানুষ বিশ্বাস করে, অনেক অনেক কাল আগে, যখন ওলাওঠা, কুষ্ঠর মতো মরন ব্যাধি পৃথিবীকে গ্রাস করেছিল, তখন মাতৃরূপী এই চণ্ডীদেবী (স্থানীয় মানুষজনের অনেকেই একে ‘বুড়িচণ্ডী’ বলেও আখ্যা দেন) হাতের লাঠিটি নিয়ে পাড়াময় ঘুরে ঘুরে ঘাতক ব্যাধি সৃষ্টিকারী দুষ্ট দেবতাদের তাড়িয়ে নিয়ে যেতেন গ্রামের শেষ প্রান্তে আর রাত জেগে পাহারা দিতেন, যেন পুনরায় তারা গ্রামে প্রবেশ করে মহামারি সৃষ্টি করতে না পারে। খুব সম্ভবত মাতৃরূপী এই কর্মকুশলতার জন্য কুমারেরা চণ্ডীদেবীর মূর্তিটিকে কোমল করে নির্মাণ করে থাকেন। অথচ চণ্ডীদেবী শক্তির প্রতীক। অবশ্য বৃহত্তর দিনাজপুর অঞ্চলে চণ্ডীদেবীর মূর্তি মাতৃভাবাপন্ন করে নির্মাণ করার প্রচলন রয়েছে। (আমি নিজে আজ পর্যন্ত এই অঞ্চলে শক্তির দেবী হিসেবে চণ্ডীদেবীর পূজা হতে দেখিনি। এবং যতগুলো চণ্ডীমূর্তি দেখেছি তার সবগুলোই কোমল মাতৃভাবাপন্ন) এই গারামচণ্ডীর পূজায় স্থানীয় বাঙ্গালী এবং আদিবাসী সাঁওতালরা নিজেদের মনোবাসনা পূরণের মানত করেন। মানত পুরন হলে তারা এখানে পাঁঠা বলি দেন কিংবা কবুতর উৎসর্গ করেন। কেউ কেউ আবার চণ্ডীদেবীর নামে উৎসর্গ করেন স্বর্ণের বা রূপার গহনা। কৌতুহলোদ্দীপক বিষয় হচ্ছে, এই স্বর্ণের বা রূপার গহনাগুলো মূল আয়োজকের বাড়িতেই থাকে এবং প্রতিবছর পূজার সময় এগুলো চণ্ডীদেবীকে পরানো হয়। নারীদের এইসব গহনা ব্যবহার করা নিষেধ। পূর্বেই বলা হয়েছে যে, পারলৌকিক কৃত্যের জন্য গ্রামদেবতার পূজা করা হয় না। বরং ইহলোকে ধনেজনে সুস্থ্যভাবে বেঁচে থাকার বর প্রার্থনা করা হয় গ্রামদেবতার কাছে। ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে মানুষ এই পূজায় অংশ গ্রহণ করতে পারে। মানত করতে পারে। এই পূজা উপলক্ষে মন্দির প্রঙ্গনে বসে ছোট্ট একটি মেলা। লোকায়ত জীবনযাপনের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকার কারণে শতবছরের এই গারামচণ্ডী পূজা ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে।


ছবির ক্যাপশন:
১-৩ নং শালগ্রাম শিলার উপর স্থাপিত মৃন্ময়মূর্তির গারামচণ্ডী
৪ নং পূজায় আসা সাঁওতাল নারী
৫ নং মন্দির প্রাঙ্গনের মেলা
অনার্য তাপস এর অন্যান্য লেখাসমূহ
Copyright © Life Bangladesh সাপলুডু মূলপাতা | মন্তব্য Contact: shapludu@gmail.com