Untitled Document
মাদারের গান
- অনুপম হীরা মণ্ডল
বাঙালির পীর বিশ্বাসের মধ্যে মাদার পীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। পীরের প্রতি ভক্তি-বিশ্বাস বাঙালির সহজাত। এই পীর-পয়গম্বরগণ ইসলাম বিকাশের কালে এদেশে আসেন। তাঁরা ইসলাম প্রচার করার উদ্দেশ্যে এদেশের অমুসলিম জনসাধারণের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এই উদ্দেশ্যে তাঁদের সঙ্গে এদেশীয় মানুষের যোগাযোগ গড়ে ওঠে। তবে এই যোগাযোগ যতোটা না সামাজিক তার চেয়ে আধ্যত্মিক যোগ বেশি। ফলে এক একজন পীর হয়ে উঠেছেন সাধারণ মানুষের আধ্যাত্মিক গুরু। বাঙালি মানসে দেবতা বা অবতারবাদের যে ধারণা প্রাচীনকাল হতে গ্রথিত ছিল ইসলাম ধর্ম প্রচারের পরও তার লুপ্ত হয়ে যায়নি। ইসলামী সংস্কৃতির প্রভাবে তাতে নতুন রূপ পায়। এই রূপই পরবর্তীতে পীরবাদে স্থিতিলাভ করে। শাহ্ মাদার বা মাদার পীর এমন একজন লৌকিক পীর যার প্রভাব এখনো বাঙালির হৃদয়ে রয়েছে। বাঙালির ভক্তি-বিশ্বাস-অচারে এখনো সমানভাবে মাদার স্থান অধিকার করে আছেন। তিনি সাধারণ গ্রামীণ মানুষের নিকট যথেষ্ট পূজ্য বলে বিবেচিত হচ্ছেন।
মাদার পীর সম্পর্কে ফোকলোর গবেষকেরা বলতে চান তিনি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। ইসলাম প্রচার করার উদ্দেশ্যেই তিনি ভারতীয় উপমহাদেশে আসেন। তাঁর আদি নিবাস সিরিয়া বলে মনে করা হয়। সিরিয়া হতে তিনি কেবল ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যেই ভারতবর্ষে আসেন। তবে তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন কি না তার কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। অনেকের মতে, তিনি বাংলা অঞ্চলে হয়তো এসেছিলেন কিন্তু স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তোলেননি। তবে বাংলা অঞ্চলে তাঁর অনুসারীগণ ধর্ম প্রচারের জন্য আসা অমূলক নয়। অন্তত এদেশে তাঁর প্রভাব দেখে একথা সহজে বলা যেতে পারে। তবে মাদার পীরের নামে আলাদা একটি তরিকা গড়ে ওঠে। এই পীরের অনুসারীগণ মাদারিয়া নামে পরিচিত। অর্থাৎ তারা মাদার পীরের অনুসারী। মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, মাদার পীরের প্রকৃত নাম শাহ্ বদীউদ্দীন মাদার।
মাদার পীর বেশ কয়েকটি নাম পরিচিত। তাঁর এক নাম ‘শাহ মাদার’। যশোর-খুলনা অঞ্চলে শাহ্ মাদারের অপভ্রংশ হিসেবে বলা হয় শামান্দার। এবং এই পীরের থানকে বলা হয় ‘শামান্দার তলা’। যশোর জেলার মণিরামপুর উপজেলার হাজরাহালি গ্রামের পাশে এমন একটি শামান্দার তলা’র কথা জানা যায়। এছাড়া যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার একটি গ্রামের নাম মান্দার ডাঙ্গা। এই গ্রামের নামটি এই পীরের নামানুসারে হয়েছে। এখনো এখানে মাদারিয়া সম্প্রদায়ের বসতি দেখা যায়। বর্তমানে এখানে পীর প্রথা টিকে আছে। কোথাও কোথাও তিনি ‘দম মদার’ বলেও
বাংলা পুঁথি সাহিত্যে মাদারের কথা বর্ণিত আছে। এমনকি শূন্যপুরাণে নিরাঞ্চনের রুষ্মা অংশে মাদার পীরের কথা আছে। নাথ সাহিত্য হলেও এখানে মাদার পূর সামানভাবে পুজ্য। এই অংমে মাদারকে দম মাদার বলে সম্বোধন করা হয়েছে। শূন্যপুরাণে তিনি যথেষ্ট সম্মান পেয়েছেন। এমনকি শূন্যপুরাণে বর্ণিত যে দেবতা নিঞ্জন তিনিও মাদার পীরকে স্মরণ করতে গিয়ে বলেছেন, ‘দম্বাদার’। দম্বাদার বা দমমাদার হলো মাদার পীরের অনুসারীদের মুখের বোল। তারা কোনো কিছুতে মাদার পীরকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে বলে দম্বাদার বা দম মাদার। ধারণা করা হয় এটি সুফিদের হালকা ও জিকির থেকে এই স্মরণ বোলের উৎপত্তি। শৈবরা যেমন মুখে স্মরণ করে শিবল মহাদেব তেমনি মাদারিয়াগণ মুখের বোল হিসেবে দমমাদার বলে থাকে।
বাংলা নাট্য সাহিত্যের ইতিহাসে মাদারে গান একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। ইসলামী যুগে মাদার পীরের কাহিনি তথা তাঁর আধ্যাত্মিক ক্ষমতাকে প্রচার করার উদ্দেশ্যে মাদার পীরের গাঁথা তৈরি হয়েছে। এই গাঁথাগুলো পালাকারেরা গ্রামে গ্রামে গেয়ে শুনিয়েছেন। এগুলো পরবর্তীতে নাটকের আকারে পরিবেশিত হতে থাকে। মূলত বাংলা নাটকের যে নিজস্ব ধারা মাদার পীরের গানের মধ্যে তা লক্ষ করা যায়। বাংলা নাটকের আঙ্গিক ও পরিবেশন রীতির সকল বৈশিষ্ট্য মাদার পীরের গানের মধ্যে দেখা যায়।
মাদার পীরের গানে একজন মূল গায়েন থাকেন। তিনি মূলত মাদারের ভূমিকায় অভিনয় করেন। এছাড়া থাকেন বাদ্যকার ও দোহার। বাদ্যকারেরাই মূলধত দোহারের ভূমিকায় থাকে। বাদ্যকার ছাড়া আরো থাকে ছোকড়া। এড়া দোহরকী ছাড়ারও নৃত্যের মধ্য দিয়ে আসরকে সক্রিয়া রাখে। ছোকড়া হিসেবে ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা অংশ গ্রহণ করে। তবে সম্প্রতি হিজরা সম্প্রদায়ের সদস্যদের ছোকড়ার ভূমিকায় দেখা যায়। মাদারের পোশাক থাকে দরবেশের মতো। মাথায় একটি তাজ থাকে। পরনে থাকে পাজামা এবং গায়ে লম্বা জব্বা। পা থাকে পাদুকাহীন। এছাড়া দোহার ও বাদকেরা থাকেন ধুতি পরিহিত। ছোকড়াদের অনেকটা ভারি মেকাপে দেখা যায়। তারা অনেকটা চোখ ছলসানো পোশাক পরেন। শাড়ি পরলে তাতে চুমকি বসানো ওড়না ব্যবহার করতে দেখা যায়। মাদার পীরের গানের মূলত দশটি পালা। এক একটি পালা সরারাত ধরে পরিবেশিত হয়। সাধারণত গ্রামের মানুষ মানত হিসেবে মাদার পীরের গানের অয়োজন করে। কখনো কখনো সন্তান কামনা, রোগ থেকে মুক্তি, পারিবারিক অশান্তি থেকে মুক্তি ইত্যাদি কারণে মাদার পীরেরর গানের মানত করে।
অনুপম হীরা মণ্ডল এর অন্যান্য লেখাসমূহ
Copyright © Life Bangladesh সাপলুডু মূলপাতা | মন্তব্য Contact: shapludu@gmail.com