Untitled Document
ভাঁটি পূজো
- অনুপম হীরা মণ্ডল
ভাটি পূজো একটি লৌকিক পূজো। কৃষিজীবী মানুষের মধ্যে এই পূজোর চল আছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল অঞ্চলে এটি অনুষ্ঠিত হয়। এই অঞ্চলের গার্হস্থ্য মানুষেরা তাদের গৃহপলিত পশুর বালাই এবং ঘা-পাঁচড়া হতে মুক্তির জন্য এই পূজাপদ্ধতি পালন করে। বাংলাদেশের বৃহত্তর যশোর-খুলনা, বরিশাল-ফরিদপুর অঞ্চলের মানুষ ভাটি পুজো করে। মূলত ভাটি অঞ্চলের পূজো বলেই একে ভাটি পুজো বলা হয়। ভাটি অঞ্চলের কৃষিজীবী নমঃশূদ্র, কাপালি, পুণ্ড্রক্ষত্রিয়, মুণ্ডা, ঋষি, বাগদি প্রভৃতি কৃষিজীবী জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই পূজোর প্রচলন আছে। এছাড়া বাইতি, বাওয়ালি, মাওয়াল, মাঝি, ঘোষ, কর্মকার, কুমার, ছুতার, নরসুন্দর প্রভৃতি পেশাজীবী মানুষের মধ্যেও ভাটি পূজা হতে দেখা যায়। জানা যায় এক সময় বাঙালি মুসলমান জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এই পূজোর চল ছিল। বর্তমানে শাস্ত্র শাসন এবং ধর্মীয় কড়া-কড়িতে সেই রেওয়াজ আর টিকে নেই। বাঙালি হিন্দুদের মধ্যেও যারা শাস্ত্রীয় ধর্মের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে তাদের মধ্যেও এই পূজো পদ্ধতি পালন করার রেওয়াজ কমে গেছে।


এটি একটি মাতৃতান্ত্রিক সমাজের পূজো। এর উপাস্য একজন দেবী, যিনি গৃহপালিত জন্তু এবং মানুষকে ঘা-পাঁচড়া ইত্যাদি রোগ থেকে রক্ষা করে। এই দেবীর কোনো বিগ্রহ নেই। কোনো প্রকার মূর্তিও তার কল্পনা করা হয় না। ভাটি পূজো সাধারণত গ্রামের বারোয়ারি তলায় দেওয়া হয়। গ্রামের থান বা গ্রামের বাইরে কোনো গাছ তলায় এই পূজোর স্থান নির্ধারিত থাকে। একটি গাছকে কেন্দ্র করে এই পুজোর আনুষ্ঠানিকতা লক্ষ করা যায়। বট, পাকুড়, জিয়ল, নীম, কেওড়া প্রভৃতি গাছের নীচে পূজো অনুষ্ঠিত হয়। এই সকল গাছই ভাটি দেবীর অশ্রয় বলে স্বীকার করা হয়। এই দেবীর পূজোর সঙ্গে পূজারীরা তাঁকে নানা প্রকার গালা-গাল দেয়। তাদের ধারণা দেবীকে তুষ্ট করতে না পারলে তাকে ভর্ৎসনার মাধ্যমে তার রোষ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। এর পূজারী সাধারণত নারী এবং শিশু। পুরুষদের সাধারণত এই পূজোর থানে প্রবেশ করতে দেখা যায় না। পূজোর কোনো পুরোহিত লাগে না। কোনো প্রকার হোম-যজ্ঞ-মন্ত্রের প্রয়োগও লক্ষ করা যায় না। কোথাও কোথাও এটি হ্যাচড়া পূজো নামেরও প্রচলিত।
ফাল্গুন সংক্রান্তিতে এই পূজো দেওয়া হয়। ফাল্গুন মাসের শেষ তিন দিন বিভিন্ন আচারের মাধ্যমে এই পূজোর শেষ হয়। সকাল বেলা গ্রামের শিশুরা কুলায় করে পূজোর বিভিন্ন উপাচার সাজিয়ে নিয়ে যায়। প্রথম দুইদিন উপাচারের মধ্যে থাকে কেবল নানা প্রকার ফুল। যেমন, ভাঁটফুল, মাদার ফুল, নীলকণ্ঠ, কল্কে, কাঠগোলাপ, শিয়াল কাটা ইত্যাদি। কুলার উপর বুয়ো (পুইয়ে) গাছের পাতা বিছিয়ে তার উপর ফুল সাজিয়ে নেওয়া হয়। এর পর থানের গাছকে ঘিরে সকলে তাদের কুলা বৃত্তাকারে সাজিয়ে রাখে। প্রবীনারা একে একে শুরু করে গান।
হ্যচড়া মাগির ফ্যাচড়া চুল
তাইতি দেবো আমরা ভাটির ফুল ॥
ভাটির ফুলি যদি না লাগে মন
তাইতি দেবো আমরা মান্দার ফুল ॥
মান্দার ফুলি যদি না লাগে মন
তাইতি দেবো আমারা নীলকন্ঠ ফুল ॥

যদি না শুনিস আমার বোল
ছেড়বো আমি তোর মাথার চুল ॥
করবো তোরে ভাতার ছাড়া
ন্যাড়া মাথায় ঘুরবি পাড়া ॥
জ্বালবো আগুন তোর ঘরে
ঘা পাচড়া তুই নিবি পরে ॥

সমবেতভাবে কয়েকটি গান পরিবেশন করা হয়। এরপর একে একে কুলার ফুল গাছের গোড়ায় ঢেলে দেওয়া হয়। ফুল নিবেদনের পর শিশু-কিশোরেরা তাদের কুলা একটি লাঠি দিয়ে তালে তালে বাজাতে বাজাতে ঘরে ফেরে। এই পর আগামীকাল ভোরে ফুল তোলার নিমন্ত্রণ দিয়ে তারা ঘরে ফেরে। পরের দিন আবার যথানিয়মে আবার পূজো শুরু হয়। পূজোর শেষ অনুষ্ঠানিকতা হয় তৃতীয় দিনে। এই দিনে যে সকল আচার পালন করা হয় তা অভিনব। কুলার উল্টা পিঠে সব উপাচার সাজানো হয়। কুলার মাথার দুই দিকে কিছুটা গোবর দিয়ে তার উপর দুটো মরা শামুক বসানো হয়। শামুকের মধ্যে দেওয়া হয় মেয়েদের মাথার কিছু ছেড়া চুল। দুটি ডেলা, ভাঁটফুলের পাতা, তেল, সিঁদুর, জল ইত্যাদি। বাড়ি যে কয়টি গরু থাকে সেই কয়টি ভাঁট পাতা নিয়ে যাওয়া হয়।
গাছ তলায় গিয়ে গাছের গোড়ায় প্রথমে তেল দেওয়া হয়। এর পর জল, সিঁদুর দেওয়া হয়। প্রসাদ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রসাদ হিসেবে খেঁজুর গুড়ের চিনি, বাতাসা, নাড়–, নারকেল, খৈ দেওয়া হয়। নৈবেদ্য বাড়ানোর পর ভাট পাতাগুলো নিয়ে আসা হয়। এর পর গরুকে পুকুরে নিয়ে গা ধোওয়ানো হয়। এক একটি ভাঁট পাতা দিয়ে এক একটি গরুর শরীরকে পরিষ্কার করা হয়।
বাড়ি ফিরে পরিবারের সবাইকে স্নান করতে হয়। এরপর সন্ধ্যায় পাড়ার সবাই মিলে মাঙন করা চাল-ডাল-সব্জী দিয়ে খিচুড়ি রেধে খাওয়া হয়।
অনুপম হীরা মণ্ডল এর অন্যান্য লেখাসমূহ
Copyright © Life Bangladesh সাপলুডু মূলপাতা | মন্তব্য Contact: shapludu@gmail.com