Untitled Document
বাংলার লোকনৃত্য
- সাইদুর রহমান লিপন
বাংলার লোকনৃত্য কেবল প্রাচীনকালেই নয় বর্তমান কালেও তার দেহ থেকে গীত, বাদ্য আর আখ্যানকে বিচ্ছিন্ন করেনি বা বলা যায় কখনো বিচ্ছিন্ন করতে চায়ওনি। কেননা প্রাচীন ভারতবর্ষ থেকেই এ অঞ্চলের নৃত্য, নাট্য, গীত, বাদ্য অভেদাত্মক অদ্বৈতরূপে ধর্ম, কৃত্য বা সামাজিক আচার অনুষ্ঠানের কার্যকর প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। কেবল পরিবেশনামূলক শিল্প আঙ্গিক বা রীতির ক্ষেত্রেই নয় এমনকি মানুষের জীবনের বিশেষ ভক্তি ভাব আর বিশ্বাসজাত অভিব্যক্তি প্রকাশের ক্ষেত্রেও যেন নৃত্য-গীত-বাদ্য হয়ে ওঠে প্রধানতম অনুষঙ্গ। সম্ভবত একারণেই শহরকেন্দ্রিক পরিবেশনা শিল্প বিশেষত বাংলার সিনেমা থেকে নাটক সর্বত্রই নৃত্য, গীত, বাদ্য যেন একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে বিনোদনের খোরাক মিটিয়ে চলেছে, যা সমগ্র অঞ্চলের শহরকেন্দ্রিক আধুনিক সাংস্কৃতিক চর্চার একটি বিশিষ্ট ধারা বা রীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। ইউরো-আমেরিকা যেমন বালাড, মিউজিক্যাল থিয়েটার, অপেরা প্রভৃতি নানান রীতির পরিবেশনামূলক শিল্পকলাকে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বিভক্তির চোখে দেখে থাকে, পক্ষান্তরে একক নয় বরং একের মধ্যে বহুর অদ্বৈত অবস্থানই বাংলার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর বা দেশজ পরিবেশনামূলক শিল্পকলার প্রাণশক্তি।
বাঙলা নাটকের অজস্র আঙ্গিক সহস্র বৎসরের ধারায় বাহিত হয়েছে কিন্তু আদ্যান্ত তার দেহমনে অদ্বৈতের ঝঙ্কার বিদ্যমান। নাটক হয়েও আমাদের নাটক গান থেকে আপনাকে বিচ্ছিন্ন করেনি, নৃত্যকে করেছে তার ধমনী, কাব্যের গড়নটাকে প্রায় সর্বত্র করেছে আপন অঙ্গাভরণ-তার প্রাণের নিখিল লোকায়ত জীবন ও ধর্মকে অবলম্বনপূর্বক আসর থেকে আসরে পরিপুষ্ট হয়েছে। যেখানে কাব্য বা উপাখ্যানটা গেয় সেখানেই বাঙলা নাটকের রূপ ও রস স্পর্শ করা গেছে।
আদিবাসী সংস্কৃতির নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠী ভিত্তিক দলগত নৃত্য ব্যতীত বাংলার লোকনৃত্যের আখ্যান অথবা বিষয় ভিত্তিক গীত বা কাব্যের শরীর বিচ্ছিন্ন একক ও স্বতন্ত্র পরিবেশনা মাধ্যম হিসেবে চর্চিত হবার ইতিহাস খুব বেশী দৃষ্ট হয় না। তাই কোনো একক বা একটি স্বতন্ত্র শিল্প রূপে নয় বরং একের মধ্যে ‘বহুর’ উপস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বাংলার ‘লোকনৃত্যের’ আলোচনা যুক্তিযুক্ত হতে পারে।

বাংলা স্থানীয় নাট্যকলার ইতিহাস আলোচনায় নৃত্য'কে আদি উৎস বলে মনে করেন অনেকে। এ প্রসঙ্গে শ্রী সুকুমার সেনের ব্যাখ্যা এমন যে, ‘নৃত্য’ শব্দের প্রাচীন রূপ ছিল ‘নৃতু’; যার ব্যবহার ঋগবেদ-এ পাওয়া যায়। ‘নৃতু’ শব্দটি ‘নৃ’ ধাতু থেকে উৎপন্ন। ‘নৃত্য শব্দের মূল অর্থ ছিল নটকর্ম’। সংস্কৃত সাহিত্যে ‘নাট্যকর্ম’ ও ‘নৃত্যকর্ম’ স্বতন্ত্র রূপলাভ করা সত্ত্বেও “‘নাট’ ও ‘নাচ’ অনেক সময় এক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে”। পাণিনির (খ্রি. পূ. চতুর্থ শতক) সূত্র ব্যাখ্যা করে গবেষক বলেন, “‘নাট্য’ শব্দটির অর্থ হল ‘নটের কর্ম’।” ‘নাট্য’-এর নাম ধাতু হলো ‘নাটয়’ অর্থাৎ “‘নাট করা’, বিচিত্র সজ্জা ও অঙ্গভঙ্গি দেখান অর্থে।” এসকল তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায় য,ে প্রাচীন যুগে ‘নৃত্য’ ও ‘নটরে র্কম’ র্অথাৎ ‘অভনিয়’ অভন্নি ছলিো। শুধু তাই নয়, এখানে অভনিয়কে ‘র্কম’ হসিবেে
স্বীকৃতি দেওয়ায় তা জীবিকার একটি উপায় হিসেবেও বিবেচিত হতো এমন ধারণা অমূলক নয়। পাণিনির সময়ে নৃত্য ও নটকর্মের যে ব্যাখ্যা পাওয়া যায় তার সমর্থন ভরত কৃত নাট্যশস্ত্রেও পাওয়া যায়। নাট্যশস্ত্রের ব্যাখ্যা অনুযায়ী- “নাট্য, নৃত্ত ও নৃত্যÑ এই তিনটি পদের তাৎপর্য পৃথক, যদিও এগুলি একই নৃৎ ধাতু নিষ্পন্ন। নৃত্ত শব্দে বোঝায় নাচ (dance); এটি তাললয়াশ্রিত। অর্থাৎ সুর,তাল,লয় ও বাদ্য অনুসৃত স্বাবলীল ও স্বতঃস্ফূর্ত শরীর ছন্দের প্রকাশ। অন্যদিকে নৃত্য শব্দে বোঝায় অনুকরণাত্মক অঙ্গভঙ্গী (mime); অর্থাৎ, চরিত্রের বা ঘটনার ক্রিয়া অনুকরণের নিমিত্তে বিশেষ অর্থ ও সংকেতপূর্ণ শরীর ছন্দের প্রকাশ। রিচার্ড শেখনার একেই codified রূপে চিহ্নিত করেছেন।
This style of codified acting employs meaningful gestures, movements, songs, costumes, and makeup set by tradition and passed down from teacher to student by means of rigorous training that takes years.

অর্থাৎ গুরু শিষ্যের পরম্পরাগত শিক্ষণ পদ্ধতি দ্বারা অর্জিত বিশেষ ও সুনির্দিষ্ট অর্থপূর্ণ-শরীর ভাষায় বা মূদ্রার আশ্রয়ে অঙ্গ, প্রত্যঙ্গ বা উপাঙ্গের সঞ্চালন করা Codified acting বা সংকেতাবদ্ধ পরিবেশনার প্রধান বৈশিষ্ট্য। সুতরাং শেষোক্ত দুইটি অর্থাৎ নৃত্ত ও নৃত্য গীত ও সংলাপের সাথে যুক্ত হয়ে নাট্যের সৃষ্টি করে। অর্থাৎ নৃত্ত, গীত ও বাদ্য হচ্ছে নাট্যের অঙ্গ। অভিনবগুপ্ত আবার নৃত্ত-কে সাতভাগে দেখিয়েছেন- শুদ্ধ, গীতকাদ্যভিনয়যুক্ত, গানক্রিয়ামাত্রানুসারি, উদ্ধত, সুকুমার, উদ্ধত সুকুমার এবং সুকুমারোদ্ধত। উপর্যুক্ত সকল তথ্যের ভিত্তিতে পরিস্কার ভাবে বলা যায় যে, প্রাচীনকাল থেকেই নৃত্য (নৃত্ত) বা লোকনৃত্য প্রায় সকল ক্ষেত্রেই একক বা স্বতন্ত্র কোনো ধারায় নয় বরং একটি আখ্যান-দেহে গীত ও বাদ্যের আশ্রয়ে রীতি বৈচিত্রের স্বতন্ত্রতা নিয়ে ধর্মীয়, কৃত্যমূলক, সামাজিক বা ধর্মনিরোপেক্ষ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের অনুষঙ্গ হিসেবে পরিবেশিত হয়ে আসছে, যেমন- গম্ভীরানাচ, ঘাটুগান, বেইল্লা নাচারী, কান্দনি বিষহরির গান, নাইচের জারি, পদ্মার নাচন, অষ্টকগান, আলকাপ গান, কিচ্ছাগান, ধামাইল নাচ, ছোকরানাচ, কালীনাচ, ব্রতনাচ, বাউলনাচ, নাইচের জারি, পাইক নাচ, মুখানাচ, বালানাচ, মেয়েলি নাচ সহ অসংখ্য দেশজ নাট্যের পরিবেশনায় নৃত্য, গীত ও আখ্যানের অভেদাত্মক উপস্থিতি দেশজ নাট্যাভিনয়ের সুদীর্ঘ ইতিহাস ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।
তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠে আসে যে, যদি নৃত্য, নাট্য, গীত, বাদ্য আখ্যান এসব কিছুকেই একটি ও অভিন্ন পরিবেশনায় দেখা হয়, তাহলে রীতি-বৈচিত্রের পার্থক্য রক্ষিত হয় কিভাবে? এক্ষেত্রে নাট্যাভিনয়ের রীতি বৈচিত্র বিষয়ে ভরত তাঁর নাট্যশাস্ত্র বর্ণিত অভিনয়কলাকে-‘লোকধর্মী’ ও ‘নাট্যধর্মী’ প্রধান এই দুটি পর্যায়ে বিশ্লেষণ করেছেন। কপিলা বাৎসায়ন নাট্যশাস্ত্রের এই ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন - ‘তিনি (ভরত) নাট্যদৃশ্যকে বহুতর মাধ্যমের ও বহুতর শ্রেণীর একটি সার্বিক সমন্বয়রূপে কল্পনা করেছিলেন- ওই মাধ্যমের শ্রেণীগুলি হলো- কথ্যভাষা থেকে শুরু করে কণ্ঠ ও যন্ত্রসংগীত, অঙ্গভঙ্গী, মূকাভিনয়, দৃশ্যসজ্জা, বেশভূষা ইস্তক শিল্পীদের আভ্যন্তর আভ্যন্তরী মতিগতি পর্যন্ত তাবৎ বস্তু। ভরত অভিনয়ের দুটি পর্যায় মেনে নিয়েছিলেন- একটি মঞ্চকলার লৌকিক বা বাস্তব পর্যায়, অন্যটি মঞ্চকলার পরিমার্জিত প্রকাশশৈলী। একটি ‘লোক’, অন্যটি ‘নাট্য’। সুতরাং ভরতকৃত ‘নৃত্ত’ হলো ঐ ‘লোক’ পর্যায়ের তাল ছন্দের সাধারণ অঙ্গভঙ্গী। ড. সেলিম আল দীন তাঁর বিশ্লেষণে বলেন- ‘এ হচ্ছে জননন্দিত লৌকিক নাট্যাভিনয়। এতে নাট্যশাস্ত্র নির্দেশিত মার্গীয় মুদ্রারীতি অনুসৃত হয় না। ‘নৃত্ত’ শব্দটি কৈশিকী প্রসঙ্গে উল্লিখিত হওয়ায় প্রাচীনকালের ওড্রমাগধী নাট্যরীতির বৈশিষ্ট্য অনুধাবন করা যায়। প্রচীন বাঙলার যে ক’টি নাট্যরীতি এ যাবত আবিষ্কৃত হয়েছে, দেখা যায় যে, সেগুলো লৌকিক নাট্যাভিনয়রীতি অর্থাৎ ‘নৃত্তে’র আশ্রয়ী। প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী সন্যুক্তা পানিগ্রাহী এই ‘লোক’ এবং ‘নাট্য’কে মানুষের ক্রিয়াবাচক আচরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন- we have two words to describe man’s behavior: lokadharmi stands for behavior (dharma) in daily life (loka); natyadharmi stands for behavior in dance (natya). সুতরাং ‘লোকধর্মী’ নাট্যাভিনয় নির্দিষ্ট কিছু মূদ্রার নিয়মে আবদ্ধ না থেকে বাস্তব বা লৌকিক জীবনের নানাবিধ ক্রিয়া ও আচরণের উপস্থাপন করে বিধায় এ ধরনের পরিবেশনায় রীতি ও বৈচিত্র্যের সীমাহীন সম্ভবনা থাকবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
আবার নাট্যশাস্ত্রে ‘নৃত্ত’ হচ্ছে দুই প্রকার- ‘তা-ব ও লাস্য’। তা-ব হচ্ছে প্রচ- বা তুমুল এবং লাস্য হচ্ছে কোমল। নাট্যশাস্ত্রে ‘লাস্য’কে দশভাগে ভাগ করে বলা হচ্ছে যে, এতে গীত ও নৃত্য অপরিহার্য। তা-ব ও লাস্যের উৎপত্তিমূলের ব্যাখ্যায় আরও বলা হয় যে, নটরাজ শীবের প্রচ- রৌদ্র মূর্তি হচ্ছে নৃত্তের ‘তা-ব’ রূপ এবং কোমল মূর্তি হচ্ছে ‘লাস্য’ রূপ। তাই নৃত্ত ( লৌকিক), নৃত্য (মার্গীয়) বা নাট্য (নৃত্ত ও নৃত্যেও সমন্বয়) পরিবেশনায় ‘তা-ব’ এবং ‘লাস্যে’র ব্যবহারে দুটি সাধারণ প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়, অর্থাৎ বিষয় বা চরিত্রের যাবতীয় রৌদ্র, বীর প্রভৃতি রসযুক্ত কঠিন, উদ্দীপ্ত, উৎসাহ, উত্তেজনা, প্রচ-, তুমুল প্রভৃতি অভিব্যক্তির প্রকাশে ‘তা-বে’র ব্যবহার এবং বিপরীতক্রমে শৃঙ্গার রস বা যাবতীয় কোমল অভিব্যক্তি প্রকাশে ‘লাস্যে’র ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আরও একটু গভীর পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, লোক পরিবেশনায় কুশীলবের সাধারণ প্রবণতা এমন যে আখ্যানের ‘পুরুষ চরিত্রে’র চরিত্রায়ণে ‘তা-বে’র মূখ্য ব্যবহার এবং ‘নারী চরিত্রে’র ক্ষেত্রে ‘লাস্যে’র মূখ্য ব্যবহার করে থাকেন। অর্থাৎ এক্ষেত্রে ‘তা-ব’ ও ‘লাস্য’ হচ্ছে সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী দুটি সাধারণ রূপ যা পুরুষ এবং নারী ‘চরিত্রে’র অভিনয়ে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে আখ্যানের ‘নারী’ চরিত্রটি (সীতা) হলেও উপস্থাপনকারী কুশীলব বা অভিনেতাটি অনেক ক্ষেত্রেই ‘পুরুষ’ হয়ে থাকে, আর এটি বর্তমানের বাংলার দেশজ নাট্য বা নৃত্যকলার পরিবেশনায় বহুল চর্চিত ও জনপ্রিয় একটি রীতি হিসেবে স্বীকৃত। ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় আজও নারী চরিত্রে পুরুষ কুশীলবের উপস্থিতি বা পরিবেশনা আসর থেকে আসরে ভক্ত-দর্শক চিত্তে রস আস্বাদনের খোরাক মিটিয়ে চলেছে ষোলআনাই। তবে বাংলার দেশজ নাট্যকলার ঐতিহ্যে পুরুষের পাশাপাশি নারী কুশীলবের উপস্থিতি দেখা গেলেও মধ্যযুগের সামাজিক ও রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ফলে পরিবেশনা শিল্পে নারী কুশীলবের সংখ্যানুপাত উপস্থিতি অনেকাংশেই দুর্বল হয়ে পড়ে। এই বিষয়ে কোনো কোনো গবেষকের অভিমত এরূপ যে-
...ইতিহাসের প্রথম যুগ হতে মধ্যযুগের প্রারম্ভিক অধ্যায় পর্যন্ত সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশ, বিশেষত বাংলার অভিনয়রীতির এই সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা এমন একটি ঐতিহ্যের প্রতি সুস্পষ্ট নির্দেশ করে যেখানে পুরুষ ও নারী উভয়ের অংশীদারিত্ব স্বীকৃত। কিন্তু মধ্যযুগের প্রথমার্ধে (১৩ থেকে ১৬ শতক) একটি স্পষ্ট পরিবর্তন ঘটায় এই প্রেক্ষাপট থেকে আপাতঃদৃষ্টিতে নারী কুশীলব অন্তর্হিত হয়। এই অন্তর্ধানের অন্তরালে তিনটি কারণ নির্ণয় করা যেতে পারে: ১. মুসলিম শাসন, ২. বৈষ্ণব নাট্য-গীত চর্চা ও ৩. সামাজিক রাজনৈতিক প্রভাব বিচ্ছিন্ন নান্দনিক চাহিদা যা animus ও anima ধারনা স্বীকার করে।

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে আখ্যানের নারী চরিত্রের প্রদর্শনে নারী কুশীলব অপরিহার্য কি না? এ প্রসঙ্গে ইউজিনও বারবা চরিত্র নির্মাণে লিঙ্গ ভিত্তিক ‘নারী’ ও ‘পুরুষে’র ধারণাকে সম্পূর্ণ খারিজ করে দিয়ে নারীর চরিত্রায়ণে নারী কুশিলবের অপরিহার্যতাকে অস্বীকার করেন। তিনি ভারতীয় নাট্যের ‘তা-ব’ ও ‘লাস্যে’র সমান্তরালে ইন্দোনেশিয়ার বালি নাচের ‘বায়ু’, জাপানের নো কাবুকির ‘ কোসি, কি হাই’ বা (স্প্রীট অথবা শ্বাস-প্রশ্বাস) অথবা ল্যাটিন পরিবেশনার ‘এনিমাস ও এনিমা’ (বাতাস, শ্বাসপ্রশ্বাস) প্রভৃতির বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে ‘তা-ব’ এবং ‘লাস্যে’র সাথে লিঙ্গ ধারণার ‘পুরুষ’ বা ‘নারী’র আদৌ কোনো সম্পর্ক নেই। লিঙ্গ নিরপেক্ষ এই শব্দ দুটি মানুষের ‘শক্তি’ বা ‘গতি’র সাথে সম্পর্কিত যা মূলত নারী এবং পুরুষ উভয়ের মধ্যেই বিরাজ করতে পারে। তিনি বলেন-
পুরুষ এবং নারী দ্বারাই সব সময় পৌরুষত্ব ও নারীত্ব প্রকাশিত হবে এটা ঠিক নয়। প্রাক-প্রকাশক পর্যায়ে অভিনেতার লিঙ্গ পরিচয় কম গুরুত্বপূর্ণ। টিপিক্যাল পৌরুষ ও নারীত্ব এর কোনো অস্তিত্ব নেই। প্রতিটি মানুষের মাঝেই রয়েছে নমনীয়
Anima শক্তি এবং শৌর্যবান animus শক্তি। যে কোনো কুশীলব যখন মঞ্চে সে তার উপস্থিতিকে উপরের আলোচিত শক্তিদ্বয়ের সাহায্যে দৃশ্যমান ও চরিত্রের রূপায়ণ ঘটান তখনি মূলত পৌরুষত্ব ও নারীত্বকে প্রত্যক্ষ করা যায়।
তাহলে এই হচ্ছে বাংলার লোকনৃত্যের প্রাণ ভোমরা- তা-ব আর লাস্য, রূপে গুণে বিপরীত কিন্তু একে অন্যের পরিপূরক বা একের শূণ্যতায় অন্যটি অর্থহীন। ইউজিনও বারবা যাকে বহবৎমু নামে চিহ্নিত করেছেন। তিনি ভেনিলিয়া ও সেলাসিয়া নামে দুই সমুদ্রের ঢেউয়ের দেবীর প্রসঙ্গ টেনে এই ‘শক্তি’র ব্যাখ্যায় বলেন-
Venilia and Selacia were two Roman goddesses: one was the goddess of the waves which lap the shore; the other was the goddess of the waves which return to the open sea. Why two goddesses, if the water which comes in to the shore and the water which moves seaward again is the same water? The substances and the force may be the same, but the direction and quality of the energy are different, opposite. The wave’s energy, the dance of the two goddesses, can be discovered in the performers’ pre-expressive sub-stratum, in the blending of the two profiles of their double-edged energy, the vigorous animus energy and the soft anima energy.

এ যেন ঠিক সেই লালন সাঁই-এর ‘অচিন পাখি’ ‘মানবদেহে’ই (কেবল নারী অথবা পুরুষ নয়) যার বসবাস; শ্রীচৈতন্যদেবের ‘রাধা-কৃষ্ণ’- জীবাত্মা-পরমাত্মার প্রতীক, ভক্তের হৃদয়ে যাদের পরম মিলন অথবা অর্ধেক নারী অর্ধেক নর- অর্ধনারীশ্বর নটরাজ শিব। মানবদেহেই যদি থাকে এমন কোমল আর তুমুল শক্তির ভা-ার তবে তো সহজেই অনুমান করা যায় যে, কোন যাদুর বলে একজন কুশীলব (নারী অথবা পুরুষ) নৃত্য গীত আর কথার আশ্রয়ে মূহুর্তেই রাম থেকে সীতা; বেহুলা থেকে লক্ষীন্দর অথবা মহুয়া থেকে হুমরা বাইদ্যার চরিত্রে বিশ্বাসযোগ্য চরিত্রায়ণ দর্শক অভিমুখে মূর্ত করে তুলতে সক্ষম হন। অথবা কোন ‘শক্তি’র বলে কুশীলব নৃত্যের ছন্দে গীতময় সংলাপ আর বর্ণনার যুগপৎ পরিবেশনায় চরিত্রের প্রেম প্রণয় বা বিরহকে ক্রমাগত ভাবারোহী বেগে তীব্র থেকে তীব্রতর করে তোলে।
বাংলার নৃত্যের এই সীমাহীন ‘শক্তি’ সম্ভাবনাকে কেবল ধর্ম বা কৃত্য-ই সাঙ্গীকৃত করেছে তা কিন্তু নয়, সামাজিক আচার অনুষ্ঠান থেকে লোকসাহিত্য সর্বত্রই রয়েছে এর ব্যবহার।
বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদ। বলা হয়ে থাকে যে, বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ তাদের ধর্মমত প্রাচারের জন্য এমন এক শিল্প আঙ্গিক ব্যবহার করতেন যা ছিল নৃত্য, গীত এবং শারীরিক কসরৎ তথা যোগাচারের সমন্বিত উপস্থাপনা। এই ধরনের পরিবেশনায় কুশিলব হিসেবে নারী ও পুরুষ উভয়ের মিলিত অংশগ্রহণেরও উল্লেখ রয়েছে। চর্যাপদের মাধ্যমে তৎকালীন নৃত্যকলা সম্পর্কে পাওয়া যায় সুস্পষ্ট ধারনা, যেমন একটি চর্যায় দেখা যায়- “এক সো পদমা চউসট্ঠী পাখুড়ী। তঁহি চড়ি নাচই ডোম্বী বাপুড়ী”, অন্য আরেকটি চর্যায় বলা হয়েছে- “নাচন্তি বাজিল গান্তি দেবী, বুদ্ধা নাটক বিষমা হোই॥” অর্থাৎ এখানে নৃত্যপটিয়সী ডোম্বী এবং দেবীর নৃত্যকলা সম্পর্কে বলা হয়েছে। তাছাড়া দুটি দৃষ্টান্তেই নৃত্য, নাট্য, গীত, বাদ্যের অদ্বৈত পরিবেশনারও সুস্পষ্ট নিদর্শন পাওয়া যায়। আবার মধ্যযুগের ব্যপক জনপ্রিয় আখ্যান মনসামঙ্গলের কবি বিজয়গুপ্ত তাঁর কাব্যে লিখেছেন-

বুঝিয়া শিবের মন বেউলার কৌতুক, আরম্ভিল নৃত্যগীত শিবের সমুখ॥
কোকিলের বর যেন বলে মধুর স্বরে, মধুর স্বরে গায় গীত পায়ে নাট পুরে॥
হাতে বাদ্য বাজায়ে বেউলা মুখে গায়ে গীত, নানাবিধ গাহে গীত শুনি সুললিত॥
আড় আঁখি চাহে বেউলা ঘন চালায়ে হাত, নৃত্যে মোহিত হইল ত্রিলোকের নাথ॥
- (শ্রী শ্রী বিজয়গুপ্তের পদ্মাপুরাণ, পৃষ্ঠা- ৪৮১-৮২)

শ্রী চৈতন্যদেব স্বয়ং নৃত্য,গীত ও সাত্ত্বিক অভিনয় যুক্ত নাটগীত রীতির অভিনয়ে পটু ছিলেন বৃন্দাবন দাস এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন-
উষা কাল হৈতে নৃত্য করে বিশ্বম্ভর।
যূথ যূথ হৈল যত গায়ন সুন্দর॥
শ্রীবাস প-িত লৈয়া এক সম্প্রদায়।
মুকুন্দ লৈয়া আর জন কথো গায়॥
কেহ বোলে ভাল ভাল নিমাঞি প-িত।
ভাল ভাব লাগে ভাল লাগে নাটগীত॥
চ-ীমঙ্গলে উল্লেখ আছেÑ
অরি মনোহর লীলা/ নাচে রামা রতœমালা/তান্ডব দেখেন দেবগণ
তাতিনি তাতিনি তিনি/মৃদঙ্গ মন্দিরা ধ্বনি/ঘন বাজে কিঙ্কিনী কঙ্কণ॥
¬ (চ-ীমঙ্গল, পৃষ্ঠা-১০৮)

দৃষ্টান্তগুলোতে চৈতন্যদেব ব্যতীত নৃত্যরত অন্যান্য সকলেই হচ্ছে আখ্যানের ‘চরিত্র’- ডোম্বী, গান্তি দেবী, বেউলা ও রামা রত্নমালা, যারা নৃত্যের মাধ্যমে আখ্যানের বিশেষ ‘কার্য’ সম্পাদন করে। অন্যদিকে চৈতন্যদেব নৃত্যকে ব্যবহার করছেন কৃষ্ণলীলা সম্পাদনের উপায় বা মাধ্যম হিসেবে। শ্রী চৈতন্যদেব সম্পর্কে এমনও কথা বলা হয়ে থাকে যে, কৃষ্ণলীলায় তিনি কৃষ্ণের ভূমিকায় অভিনয় করতেন এবং কখনো কখনো তিনি এতই বিমোহিত হয়ে পড়তেন যে চেতন হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তেন। সুতরাং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার কারণেই নৃত্য কখনো সাহিত্য বা আখ্যান বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আবার কখনো পরিবেশনার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

অন্যদিকে সেই মধ্যযুগ থেকে বহুল প্রচলিত এবং বর্তমানেও ব্যপক জনপ্রিয় আখ্যান মনসামঙ্গল কাব্যের তিনটি অঞ্চলের তিনটি পরিবেশনা রীতির কুশীলব যেমন- পার্বতীপুর, দিনাজপুরের কান্দনি বিষহরির গান বা কুষ্টিয়া, ভেড়ামারার পদ্মার নাচনের সবাই পুরুষ (পদ্মার নাচনের অধিকাংশ কুশীলব মুসলমান), অন্যদিকে বাগেরহাট, বরিশাল অঞ্চলের রয়ানী গানের রীতি অনুযায়ী তিনজন গায়েনের প্রত্যেকেই নারী, আবার সিলেট অঞ্চলে মনসামঙ্গলের কিছু কিছু পরিবেশনারীতিতে মূলগায়েনকে অবশ্যই হতে হবে একজন ‘গুরমি’ বা হিজড়া। লিঙ্গের বিচারে এখানে তিন ধরণের কুশীলব পাই যারা প্রত্যেকেই শিব সম্মুখে বেহুলার নৃত্য প্রদর্শনের ঘটনাটি অভিনয় করেন এবং একই সাথে বেহুলাকে চরিত্রায়ণ করেন। কুশীলবের দক্ষতা, আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য এবং পরিবেশনারীতির ভিন্নতাকে মেনে নিয়েও যে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে অনুধাবন করা যায় সেটি হলো-প্রত্যেক কুশীলবের স্ব স্ব জ্ঞান বুদ্ধি আর দক্ষতা অনুযায়ী ‘শক্তি’র (তান্ডব অথবা লাস্য) ব্যবহার করেই বেহুলার চরিত্র উপস্থাপন করে থাকেন। কেননা, নারী বা পুরুষের চরিত্র চিত্রণের ক্ষেত্রে বাহ্যিক ভাবে প্রয়োজনীয় পোশাক, অলংকার, দ্রব্য সম্ভার ব্যবহারের গুরুত্বকে অস্বীকার করা যাবে না ঠিক, কিন্তু একজন গায়েন বা কুশীলবের মঞ্চ বা আসরে চরিত্র নির্মাণের মূল প্রেষণা পোশাক বা দ্রব্যসম্ভারে নয়, বরং মূল প্রেষণা হচ্ছে সেই ‘শক্তি’ (এনিমাস এনিমা, তা-ব লাস্য, কোসি, কি হাই) যা কুশীলবের মঞ্চ উপস্থিতিকে স্বাবলীল ও স্বতঃস্ফূর্ত করে চরিত্রের নান্দনিক ও বিশ্বাসযোগ্য উপস্থাপনাকে সক্ষম করে তুলতে পারে। বোধকরি এটাই আড়ম্বরহীন লোকনৃত্য বা নাট্যের খোলা বা মুক্ত আসরে দাঁড়ানো কুশীলবের প্রাণ ভোমরা। তাইতো ঘোড়ায় চড়ে নৃত্যের তালে ‘সয়ফুল মুলুক’ যখন সাতসাগর পাড়ি দিয়ে ‘বদিউজ্জামালের’ কাছে পৌঁছানোর দৃশ্যটি পরিবেশন করা হয় তখন, ঘোড়ার উপাকরণ হিসেবে সাদাসিধে একটি বালিশকে কেবল মেনে নিচ্ছি তাই নয় বরং বালিশের সাথে কুশীলবের ‘শক্তি ও গতি’র সমন্বিত নান্দনিক উপস্থিতির কারণে বালিশটিকে ঘোড়া রূপে বিশ্বাসও করি বটে।

তবে বাংলা সাহিত্যে বিশেষ করে প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যে উদ্ধৃত নৃত্যের নিদর্শন বিশ্লেষণ করে সুস্পষ্ট ভাবে বলার উপায় নেই যে, কোনটি শাস্ত্রীয় বা কোনটি লৌকিক পর্যায়ের নৃত্য। তবে সাহিত্য বিচারে এবং সাহিত্যে উক্ত স্থান, কাল, পাত্র বিচারে একটি অনুমান সহজেই করা যায় যে, দেবসভা বা রাজসভায় প্রদর্শিত নৃত্য হয়তো বা উচ্চাঙ্গের বা শাস্ত্রীয় এবং মানুষের সামাজিক পর্যায়ের সকল নৃত্য হচ্ছে লৌকিক নৃত্য।
বর্তমানে বাংলাদেশে চার ধরনের নৃত্যের চর্চা পরিলক্ষিত হয়- শাস্ত্রীয়, লোক, আদিবাসী এবং শহরকেন্দ্রিক সৃজনশীল-কম্পোজিশনাল নৃত্য। সাধারণত মা, মাটি, মানুষ অনুসৃত কবিতা, গান, সাহিত্য এবং বিভিন্ন কবির সাহিত্য যেমন- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল ইসলাম প্রমুখের গান বা কাব্যের ভাবানুষঙ্গের প্রকাশের নিমিত্তে সাধারণত কম্পোজিশনাল নৃত্য করা হয়ে থাকে।
বাংলার লোকনৃত্যের চর্চা এবং উপলক্ষ বিচারে চার ধরণের বিষয় ভিত্তিক নাচের প্রচলন লক্ষ্য করা যায়-
১. ধর্মীয়, ২. কৃত্যমূলক, ৩. সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান এবং ৪. ধর্ম নিরোপেক্ষ বিষয় ভিত্তিক নৃত্য।

১. ধর্মীয় বিষয় ভিত্তিক নৃত্য: কুশাণগান, কৃষ্ণলীলা, পাদবলী কীর্তন, ঢপ কীর্তন, সাজ কীর্তন, বেইল্ল্যা নাচারী, পদ্মার নাচন, ইমাম জারি, সত্যপীরের গান, মাদারপীরের গান, গাজীর গান, কালী কাচ, মুখানাচ, হর-গৌরির নাচ, বাইদার নাচ, বিষহরার নাচ, যোগীরগান, কান্দনি বিষহরির গান, মতুয়া নাচ, ব্রতনাচ, বালা নাচ, ফকিরা নাচ, পাইক নাচ ইত্যাদি
২. কৃত্যমূলক নৃত্য: কৃত্যে ধর্মের যোগ সরাসরি ও সক্রিয় হলেও কোনো কোনো কৃত্যানুষ্ঠান আছে যা ধর্মের করণীয় বা বিধি বিধানের সাথে যুক্ত থেকে চর্চিত হয় না, অথবা পূর্বে হলেও বর্তমানের ধর্মীয় যোগের সম্পর্ক অনপুস্থিত। আবার এমনও অনেক কৃত্যানুষ্ঠান আছে অতীতে যার উদ্ভব বিকাশে সরাসরি ধর্মের সাথে সম্পর্কিত থাকলেও বর্তমানে ধর্মের সাথে এর সক্রিয় সম্পর্ক নেই। যেমন- ঘাটুনাচ/গান, গম্ভীরানাচ, আলকাপ গান, সঙ নৃত্য, রায়বেঁশে, ঢালিনাচ, লাঠি নাচ, কাঠি নাচ ইত্যাদি।
৩. সামাজিক আচার অনুষ্ঠান ভিত্তিক নৃত্য: বৌ নাচ, মেয়েলি নাচ, ডাক নাচ, ধামাইল নাচ ইত্যাদি এবং
৪. ধর্মনিরপেক্ষ বিষয়ভিত্তিক নাচ: পুতুলনাচ, ছোকরা নাচ, সারি নাচ, কিচ্ছাপালা, খেমটা নাচ ইত্যাদি।

বাংলার লোকনৃত্যের এই সকল দৃষ্টান্ত কেবল এ অঞ্চলে নৃত্যের বিষয়, আঙ্গিক ও রীতি বৈশিষ্ট্যের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকেই তুলে ধরছে তাই নয়, বরং নৃত্যের এই বহুমাত্রিক ব্যপকতা মূলত এদেশের সাধারণ মানুষের জীবন চর্চা ও চর্যার সাথে নৃত্যের প্রত্যক্ষ ও সক্রিয় যোগের বিষয়টিকেই তুলে ধরে। অর্থাৎ নৃত্য এ অঞলে জীবন বাস্তবতা বিচ্ছিন্ন কোনো বিনোদন মাধ্যম নয়। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এই যে, লোকনৃত্য (নৃত্ত) মূদ্রা বা ব্যাকরণ মুক্ত লৌকিক জীবন (লোকধর্মী) বা বাস্তব জীবনাচার ভিত্তিক নৃত্য হওয়ায় যুগে যুগে সংঘটিত অর্থনৈতিক, সামাজিক বা রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে জীবনাচারে যে সব গুণগত পরিবর্তন সাধিত হয়, লোকনৃত্যও সেই পরিবর্তিত বাস্তবতাকেই সাঙ্গীকৃত করে এগিয়ে যায়। ফলে এক ধরনের গ্রহণ, বর্জন আর আত্তিকরণের ক্রম-বিবর্তনের ধারায় লোকনৃত্যও এগিয়ে চলে সমান তালে। মূলত এখানেই নিহিত রয়েছে টিকে থাকা না থাকার তত্ত্ব। জ্ঞান বিজ্ঞান আর অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে বেশকিছু ধর্মীয় বা কৃত্যমূলক বিশ্বাস, আচার, আচরণ ব্রত ক্রমান্বয়ে তার সামাজিক গ্রহণযোগ্য হারিয়ে ফেলছে। ফলে ধর্ম বা কৃত্যমূলক আচারের সাথে তার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ নৃত্যও তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছে। আর এভাবেই একে একে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্যের সমৃদ্ধ নানান রীতি-আঙ্গিক।

অন্যদিকে শহরকেন্দ্রিক কম্পোজিশনাল নৃত্য ধারার সাথে দেশজ লোকনৃত্যকলার কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদী যোগাযোগ বা আদানপ্রদান বলা যায় সম্পূর্ণতই অবহেলিত থেকে গেছে। অধিকন্তু, সৃজনশীল কম্পোজিশনাল নৃত্যের মাধ্যমে যে সকল “লোকনৃত্য” দেশ ও বিদেশে প্রতিনিধিত্ব করছে তা আদৌ দেশজ নৃত্যকলার ঐতিহ্যে চর্চিত রীতি বা আঙ্গিকের সাথে সম্পর্কিত নয়, বা এই ধারার বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ শরীরের ভাষা, ছন্দ আর আঙ্গিক বিন্যাসের প্রতিনিধিত্ব করে না। ‘দেশ এগিয়ে যাচ্ছে’ আশাকরা যায় যে এগিয়ে যাবেও বহু দূর। কিন্তু সাংস্কৃতিক অতীত ঐতিহ্যকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া দেশ সঠিক পথের দিশা খুঁজে পাবে কি তখন?
সাইদুর রহমান লিপন এর অন্যান্য লেখাসমূহ
Copyright © Life Bangladesh সাপলুডু মূলপাতা | মন্তব্য Contact: shapludu@gmail.com