Untitled Document
বাংলার লোকনৃত্যে শিব
- অনুপম হীরা মণ্ডল
শিব অনার্য দেবতা। কৃষি দেবতা। বাঙালি কৃষিজীবী গার্হস্থ্য জীবনেই তাঁর উদ্ভব-প্রচার। বাঙালির আচার-কৃত্যের সঙ্গে শিবের অনিবার্য সংযোগ।
এদেশের মানুষের চিন্তা ও কাজের সঙ্গে শিব মিশে আছে। বাঙালির কর্মজীবনে যেমন শিবের অস্তিত্ব তেমনি, ধর্মজীবনও শিব বিচ্ছিন্ন নয়। এখানকার মানুষের কর্মকে কেন্দ্র করেই ধর্মের বিকাশ ঘটেছে।
তাই, একটি লোকদেবতা হিসেবে বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে শিবের সংযোগ ঘটে। বাঙালি সংস্কৃতির একটি অন্যতম উপাদন নৃত্য। এই নিবন্ধে শিবকে কেন্দ্র করে উদ্ভব ও বিবর্তিত হওয়া লোকনৃত্য সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
শিব কৃষি দেবতা হওয়ায় কৃষকের সঙ্গেই শিবের সংযোগ বেশি। ফলে ফসল এবং ফসল প্রাপ্তি এর সঙ্গেই শিবকে যুক্ত হতে দেখা যায়। বাঙালি কৃষিজীবনে শিবকে মনে করা হয় ফসল প্রাপ্তির কারণ। আবার ফসল মারা দেলেও শিবকে দোষারোপ করা হয়। কারণ মনে করা হয়, শিবের কারণেই অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, ঝড়, ঝঞ্ঝার সৃষ্টি হয়েছে।
তাই, শিব তুষ্ট তো ফসল রক্ষা। এ কারণে দেখা যায় চৈত্র মাস থেকেই শিবকেন্দ্রিক আচারের বাড়াবাড়ি। এই সব ধর্মাচারকে কেন্দ্র করে নানা রকম নৃত্যধারা তৈরি হয়েছে।

মহাদেব নৃত্য
শিব কেন্দ্রিক একটি লোকনৃত্য হলো মুখোশ নৃত্য। বিশেষ করে চৈত্র সংক্রান্তির দিন এই নৃত্য পরিবেশিত হয়।
মুখোশ নৃত্যের একটি অন্যতম ধারা হলো ‘মহাদেব নৃত্য।’ সাধারণত একজন পুরুষ শিবের মুখোশ পরে এই নৃত্য করে। তার পরনে থাকে বাঘের চমড়ার মতো ডোরাকাটা পোশাক। খোলা শরীর। মুখে পরা শিবের মুখোশের সঙ্গে থাকে সাঁপ। কৃত্রিম সাঁপগুলো গলায় পেচানো থাকে, মাথার উপরে আবার ফনা ধরে থাকে।

মহাদেব নৃত্যের মূল বৈশিষ্ট হলো এটি প্রথমে ধীর লয়ে চলে। নৃত্য শিল্পী প্রথমে ধীর লয়ে পদক্ষেপ দেন। এর পর ধীরে ধীরে নৃত্যের গতি বাড়ে। বিশেষ করে পা দুটো দিয়ে শিল্পী তার কুশলতা প্রকাশ করেন।

কোমর থেকে মাথা পর্যন্ত মাঝে মাঝে নৃত্য শৈলী প্রকাশ করে। তবে পা দুটো দিয়েই এই নৃত্যের প্রখরতা প্রকাশ করা হয়। সঙ্গে কয়েকজন বাদ্যকর থাকেন। কখনো ঢাক আবার কখনো ঢোল বাজানো হয়। সঙ্গে থাকে সানাই ও কাসি। মাঝে মাঝে করতাল, প্রেমজুড়িও বাজানো হয়। এই বাদ্যের সঙ্গে নৃত্যশিল্পীর পায়ে বাঁধা ঘুঙুরও তাল দিতে থাকে।
চৈত্রসংক্রান্তির আর একটি বিশেষ দিক হলো ‘চড়ক’। গ্রামীণ বাঙালির একটি অন্যতম ধর্মীয় উৎসব । উৎসবটি সাধারণত চৈত্র মাসের সংক্রান্তিতে অনুষ্ঠিত হয়। তবে কোথাও কোথাও বৈশাখ সংক্রান্তিতেও চড়ক অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায়।

চড়ককে কেন্দ্র করে অনেকগুলো নৃত্য ধারার উদ্ভব হয়েছে। এর সবগুলোর সঙ্গেই শিব জড়িয়ে আছে। শিবের প্রতীক বিগ্রহ হিসেবে কাঠের নির্মিত নৌকাকৃতির পাটের প্রতি ফুল, জল, তেল, সিঁন্দুর, চন্দন নিবেদন করা হয়। ভক্তেরা ভক্তি জানায় নানা প্রকার ক্রিয়া-কৃত্যের মধ্য দিয়ে।


চড়কের পাট নৃত্য
গোপালগঞ্জের ওড়াকন্দি থেকে তোলা

সঙ নৃত্য
চড়কের যে দেব প্রতিকৃতি থাকে তাকে পাট বলা হয়। পাট নিয়ে বেশ কিছু লোকচার পালন করা হয়। এর মধ্যে একটি হলো পাটস্নান।
পাটস্নান এক ধরণের নৃত্য পরিবেশিত হয় যাবে বলে ‘সঙনৃত্য’। চড়কের সাত দিন আগে এটি বিশেষ আচার পালন করে নামিয়ে আনা হয়।
পাটকে স্নানের উদ্দেশ্যে নদী বা পুকুরে নেওয়া হয়। পাটস্নান সাধারণত মধ্য বা ভোর রাত্রে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। পাটস্নানের অন্যতম দিক হলো সঙ নৃত্য। মূল সন্ন্যাসি যখন পাট নিয়ে নদী-পুকুরের দিকে যেতে থাকে তখন তাকে বিভিন্ন অপ্রাকৃত শক্তি বাধা দেয়।

অর্থাৎ অন্যেরা মুখোশ পরে ভুত-প্রেত-দেও-দৈত্য-পশু-পাখি সেজে পাটস্নান বাধা দেয়। এ সময় মূল সন্ন্যাসিসহ বালা তাদের বিভিন্নভাবে মন্ত্রপুত করে বাধা দূর করে। এই অতিপ্রাকৃত শক্তিসহ পশু-পাখিদের বিভিন্নভাবে সন্তুষ্ট করা হয়। আবার যে সকল প্রতীকধর্মী শক্তি বশে আসে না তাদের বালা এবং সন্ন্যাসি মিলে বিভিন্ন যাদু টোনা প্রয়োগ করে হটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় মহাদেব বা শিবের সাহায্য নেওয়া হয়। সাধারণত মাহাদেবের আশীর্বাদ প্রাপ্ত বলেই সন্ন্যাসীদের কথায় মহাদেবের অধীনে থাকা ভূত-প্রেত-দেও-দৈত্যরা সরে যায়।
অনেক ক্ষেত্রে এই আনুষ্ঠানিকতায় দেখা যায় শিব সেচে কোনো একজন সন্ন্যাসীদের আশীর্বদা করছেন। তখন শিব এক বিশেষ ধরেণর নৃত্য করে। এটি সঙনৃত্য বলে পরিচিত।

পাট নৃত্য
৭ দিন আগ থেকে গ্রামে গ্রামে পাট নাচানী অনুষ্ঠান হয়। সন্ন্যাসিরা মাথায় পাট নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে। বাদ্যের তালে তালে নেচে নেচে তারা বাড়ি বাড়ি পাট নিয়ে যায়। যে বাড়িতে পাট নিয়ে যাওয়া হয় সেই বাড়ির গৃহিনী একটি পরিষ্কার পিঁড়ি অথবা জলচৌকি পেতে দেন। তার উপর পাট নামানো হয়। এর পর পাটকে তেল-সিঁদুর-মালা-চন্দন দিয়ে বরণ করা হয়। এই সময় বালা গৃহস্থের মঙ্গল কামনায় বালা গান পরিবেশন করেন।

সন্ন্যসিদের ডাব, কাঁচা আম, খেঁজুর, শশা, গোল, আলু, চাল, কলা উপঢৌকন দেওয়া হয়। গৃহস্থ শীষসহ কাঁচা আম এবং খেঁজুর দেয়। এগুলো বালা মন্ত্র এবং কল্যাণকামী গানের মাধ্যমে গৃহস্থকে প্রদান করে। গ্রহস্থ সেগুলো নিজের গোলা-ঘর এবং গোহালে ঝুলিয়ে রাখে। বিশ্বাস এর মধ্য দিয়ে গৃহস্থের কল্যাণ হবে। যারা অল্প বয়সী সন্ন্যাসী থাকে গৃহস্থ তাদের দিয়ে ডাব পাড়িয়ে নেয়। বিশ্বাস স্থাপন করা হয় যে সন্ন্যাসীরা নারকেল গাছে উঠলে তাতে ফল ভালো হবে।

আগুন নৃত্য
সন্ন্যাসিদের শারীরিক কসরতের আর একটি দিক হলো অগুন সন্ন্যাসি। সংক্রান্তির দিন আগের রাত্রে সন্ন্যাসিরা এই অনুষ্ঠানটি পালন করে।

মাটিতে কয়লার জলন্ত আগুন বিছিয়ে দেওয়া হয়। এর পর সন্ন্যাসিরা শিবের প্রতি তাদের ভক্তি নিবেদনের উদ্দেশ্যে এই আগুনের উপর দিয়ে যেতে যেতে বিশেষ এক ধরনের নৃত্য করে। আগুনের উপর দিয়ে যাওয়ার সময় তারা উচ্চৈস্বরে “ব’লে শিবল মাহাদের, জয় শিব” বলে ধ্বনী দেয়।

তবে সবাই এভাবে আগুনের উপর দিয়ে নৃত্য করতে পারে না। কেবলমাত্র যাদের দক্ষতা আছে তারাই অগুনের উপর নৃত্য করতে পারে। সাধারণত বয়ষ্ক সন্ন্যাসিরা আগুন সন্ন্যাসি হয়। এভাবে জলন্ত আগুনের উপর দিয়ে নৃত্য করে সন্ন্যাসিরা তাদের ভক্তির প্রমান দেয়।
অনুপম হীরা মণ্ডল এর অন্যান্য লেখাসমূহ
Copyright © Life Bangladesh সাপলুডু মূলপাতা | মন্তব্য Contact: shapludu@gmail.com