Untitled Document
বাংলার রথযাত্রা
- অনুপম হীরা মণ্ডল

বাঙালির ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে রথযাত্রা একটি। উৎসবটি বাঙালি হিন্দুর ধর্র্মীয় উৎসব হলেও এখন এটি সমস্ত বাঙার্লির উৎসবে পরিণত হয়েছে। বর্ষার শুরুতে রথযাত্রার শুরু হয়। চলে এক সপ্তাহ ধরে। উৎসবটি জগন্নাথদেবের রথযাত্রা নামে পরিচিত। বাঙালিদের মধ্যে উৎসবটি পালন করতে যথেষ্ট উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ করা যায়। শোভাযাত্রা, আলোচনা অনুষ্ঠান, কীর্তন ইত্যাদি কর্মসূচির মধ্য দিয়ে রথযাত্রার পর্ব পালিত হয়।

ধারণা করা হয় বাংলায় প্রথম রথ শুরু হয় পুরতে। পুরি ধামে শ্রীচৈতন্যের হাতে পড়ে রথ নতুনমাত্রা লাভ করে। প্রতিবছর আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে রাথযাত্রা শুরু হয়। রথ হলো চাকাওয়ালা একটি যান। যার মধ্যে দেবতার অধিষ্ঠান থাকে। এই দেবতা হলেন জগন্নথ, বলরাম ও সুভদ্রা। তাই জগন্নাথদেবের রথ নামেই রথযাত্রা পরিচিত। রথের মধ্যে এই তিনি দেব-দেবীকে বসিয়ে ভক্তেরা টেনে নিয়ে যায়। ভক্তেরা একটি নির্দিষ্ট মন্দির বা দেবালয় থেকে রথটি সমবেতভাবে রশি ধরে টেনে নিয়ে যায়। প্রথম দিন এটি অন্য আর একটি নির্দিষ্ট দেব মন্দির বা বারোয়ারি তলায় নিয়ে রাখা হয়। এর ঠিক নয় দিন পর সেই স্থান হতে পূর্বের স্থানে রতটি ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এই পর্বের নাম উল্টোরথ। উভয় স্থানে এই নয় দিন ব্যাপি মেলা ও মহোৎসব পালিত হয়।

বাঙালি জীবনে শ্রীকৃষ্ণ তথা কানুর যে প্রভাব তার আর একটি প্রমান হলো রথযাত্রা। শ্রীকৃষ্ণ তথা কানু বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বলা হয়ে থাকে ‘কানু ছাড়া গীত নাই’। একইভাবে বলা যায় কানু ছাড়া বাঙালির সাস্কৃতিক উৎসবও খুব স্বল্প। বেশিরভাগ উৎসবের সঙ্গে কানুর প্রেমাখ্যান জড়িয়ে আছে। সেই সঙ্গে আছে বাঙালি ভক্ত হৃদয়ের উৎসবমুখরতার প্রমাণ।

রাজধানী ঢাকার রথ যাত্রার ইতিহাস প্রায় সাড়ে তিনশত বছরের পুরনো। তবে সম্প্রতি ইসকনের আয়োজন রথকে একটি নতুন মাত্রা এনেদিয়েছে। রথ উপলক্ষ্যে ইসকন ঢাকায় নয় দিন ব্যাপি বিভিন্ন আয়োজন করে। এর মধ্যে শোভাযাত্রা, আলোচনা অনুষ্ঠান, পূজা, আরতি, ভোগনিবেদন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ঢাকার শোভাযাত্রাটি জয়কালী মন্দির, মতিঝিল শাপলাচত্ত্বর, দৈনিক বাংলা মোড়, বয়তুল মোকাররম, জাতীয় প্রেসক্লাব, দোয়েল চত্ত্বর, রমনা কালীমন্দির, জগন্নাথ হল, পলাশী মোড় হয়ে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে গিয়ে শেষ হয়। ঢাকার সর্বস্তরের মানুষ এই শোভাযাত্রায় অংশ নেয়। এছাড়া পুরানো ঢাকার তাঁতী বাজার, শাঁখারী বাজার, সূত্রাপুর রামসীতা মন্দিরে রথযাত্রা হয়। সূত্রাপুর রামসীতা মন্দিরের রথটি জয়কালী মন্দির থেকে গুলিস্তান, নবাবপুর, রথখোলা, টিপু সুলতান রোড, ওয়ারী হয়ে আবার জয়কালী মন্দিরে গিয়ে শেষ হয়।

বাংলাদেশের রথযাত্রা উৎসবের মধ্যে সাভারে রথ বেশ বিখ্যাত। সাভারের কানাইলাল মন্দিরের রথ ঐতিহ্যবাহী। এই রথের বয়স প্রায় ১৫০ বছর। এখানকার কানাইলাল জিউ বিগ্রহ মন্দিরের রথ অনেকটা এই অঞ্চলের মানুষের মিলন মেলায় পরিনত হয়। ধামরাইয়ের রথ পৃথিবীর বিখ্যাত। বাংলায় এই রধের মতো কোনো রথ পালিত হতে দেখা যায় না।

বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে প্রায় রথযাত্রা পালিত হয়। যশোরের রূপ-সনাতন স্মৃতি তীর্থ ধাম’এর রথ যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ইসকনের উদ্যেগে বৈষ্ণব মহান্ত রূপ ও সনাতনের স্মৃতি রক্ষার্থে যশোরের অভয়নগর উপজেলার রামসরাতে এই ধাম গড়ে উঠেছে। এখানে প্রতিবছর মহাসমারোহে রথযাত্রা পালিত হয়। এছাড় যশোর শহরের বেশ কয়েকটি স্থানে রথ পালিত হয়। খুলনার দৌলতপুর ও কালীবাড়ি মন্দিরে রথ পালিত হয়। বাগেরহাটের রামপালে রাধাগোবিন্দ মন্দিরে রথ হয়। নড়াইলের প্রতিটি উপজেলায় রথ হয়। তবে শহরের রূপগঞ্জের রথ বিখ্যাত। সতক্ষীরা সদরে রথযাত্রা পালিত হয়। মাগুরা জেলার নেংটা বাবার আশ্রমের রথ বিখ্যাত। পাবনা সদরে রথ পালিত হয়। নাটরের বেশ কয়েকটি স্থানে রথযাত্রা পালিত হয়। এর মধ্যে শহরের রাধাগোবিন্দ মন্দিরের রথ বিখ্যাত। রাজশাহীতে সাহেব বাজারে যে রথ হয় তা যথেষ্ট ঐতিহ্যবাহী। বলা যেতে পারে সমকালে উত্তরবঙ্গের মধ্যে সবচেয়ে রাজশাহীর রথ যথেষ্ট আড়ম্বরের সঙ্গে পালিত হয়। নওয়াগর ঠাকুর মান্দায় রথউৎসব পালিত হয়।

এছাড়া ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্চ, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, শেরপুর, জামালপুর, চট্টগ্রা, ফেনি, নোয়াখালি, লক্ষ্মীপুর, রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, গোপালঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ি, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, ররিশাল, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, প্রভৃতি স্থানে রথযাত্রা পালিত হতে দেখা যায়।
অনুপম হীরা মণ্ডল এর অন্যান্য লেখাসমূহ
Copyright © Life Bangladesh সাপলুডু মূলপাতা | মন্তব্য Contact: shapludu@gmail.com