Untitled Document
বাংলার বাউল ও রবীন্দ্রনাথ
- অনুপম হীরা মণ্ডল
বাঙালিদের নিকট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আদর্শ, বিষ্ময় এবং অনুকরণীয়। বলা হয়ে থাকে বাঙালির চিন্তাজাগতিক এমন কোনো বিষয় নিয়ে যেখানে রবীন্দ্রনাথ পদার্পণ করেননি। বাঙালির যাপিত জীবনের প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে তার ছিল গভীর অনুরাগ। একান্ত নিজের চৈতন্যের মধ্যে বাঙালির মননের সন্ধান করেছেন। সেই অনুসন্ধানী দৃষ্টির মধ্যে বেশ বড় পরিসরে ধরা পড়েছে বাউলের জীবন ও সাধনা। বিশেষ করে তিনি নীরিক্ষণ করেছেন তাদের যাপিত জীবন। সেই সঙ্গে তাঁকে আকৃষ্ট করেছে বাউলের সাধন সঙ্গীত। বিশেষ করে বাউল গানের জন্যেই তিনি বাউলদের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তাঁর মধ্যে যে ঔদাসিন্য স্বভাব ছিল তাকে প্রতিনিয়ত তাঁকে তাড়িত করেছে বাউলের গান। বাউলের গানের সুর তাঁকে মোহিত করেছে। ভাবিত করেছে এই গানের বাণী। তাই তিনি আপ্লুত হয়ে বাউলদের নিয়ে মন্তব্য করেছেন—‘বাউলের গান শিলাইদহে খাঁটি বাউলের মুখে শুনেছি ও তাদের পুরাতন খাতা দেখেছি। নিঃসংশয়ে জানি বাউলগানে একটা অকৃত্রিম বিশিষ্টতা আছে, যা চিরকেলে আধুনিক। ... আমার অনেক গান বাউলের ছাঁচের, কিন্তু জাল করতে চেষ্টাও করিনি, সেগুলো স্পষ্টত রবীন্দ্র-বাউলের রচনা।’

১৮৯০ খ্রিস্টাব্দের শেষভাগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলাইদহে আসেন। তিনি ঠাকুর বাড়ির জমিদারীরএই অঞ্চলের দায়িত্বগ্রহণ করেন। মূলত এই সময় থেকেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশবার সুযোগ পান। তিনি শিলাইদহে আসার পর থেকে বাউল-ফকিরদের সঙ্গে পরিচিত হতে থাকেন। প্রথমে তিনি শিলাইদহ পোস্ট অফিসের পিয়ন গগন হরকরা (গগন দাস)-এর গানের প্রতি আকৃষ্ট হন। তাঁর রচিত ও গাওয়া গান ‘কোথায় পাবো তারে/আমার মনের মানুষ যেরে’-এই গানে মুগদ্ধ হন। কেবল মুগদ্ধই হয়ে ক্ষান্ত হননি। নিজে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’-এই বাণীর সঙ্গে গগনের গানের সুর যোজনা করেন। গগন যে সুরে তাঁর মনের মানুষের গান গেয়েছিল রবীন্দ্রনাথ সেই সুর নিয়ে তাঁর সোনার বাংলার গানের সুর দেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলাইদহের জমিদারী দেখাশুনার দায়িত্বে এসে তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়া করার সুযোগ পান। তিনি জমিদারী থেকে আসমানদারী করেছেন বেশি। জমিদারীর নিরস ও নিষ্ঠুর কাজগুলোর চেয়ে সাধারণ মানুষের চিন্তন মননে সন্ধান করেছেন বেশি। এই সময় তিনি কুষ্টিয়া অঞ্চলের বাউল-ফকির-বৈষ্ণবদের গানের সুর আর বাণী দ্বারা আপ্লুত হন। তিনি এই সব সাধকদের সাধন সঙ্গীতের দ্বারা নিজেই চমকিত হয়ে যান। তিনি বিষ্মিত হন বাউল-ফকির-বৈষ্ণবের পদাবলীর মধ্যকার দর্শন আত্মস্থ করে। এই গানের বাণীগুলোকে তিনি নিজের অন্তরের মধ্যে লালন করেছেন। এমনকি সেহগুলো দ্বারা তিনি অতিমাত্রায় প্রভাবিত হয়েছে। তাই নিজেকে তিনি ‘রবীন্দ্র-বাউল’ বলে অভিহিত করতে পেরেছেন। এর একমাত্র কারণ নিজে বাউল-ফকির-বৈষ্ণবদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হতে পেরেছিলেন। তাঁর এই অন্তরঙ্গতার ফল হলো—

কতদিন দেখেছি ওদের সাধককে

একলা প্রভাতের রৌদ্রে সেই পদ্মানদীর ধারে,

যে নদীর নেই কোনো দ্বিধা, পাকা দেইলের পুরাতন ভিত ভেঙে ফেলতে।

দেখেছি একতারা-হাতে চলেছে গানের ধারা বেয়ে

মনের মানুষকে সন্ধান করবার গভীর নির্জন পথে।

শিলাইদহে আসার পরই মূলত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে গগন হরকরা, গোঁসাই গোপাল, সর্বক্ষেপী বোষ্টমী, গোঁসাই রামলাল এবং লালনের অজস্র শিস্য, প্র-শিস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে। তিনি বাউল-ফকিরদের গান শুনে কেবল নিজেই আপ্লুত হননি। নিজে শিলাইদহ ও ছেঁউড়িয়া অঞ্চল হতে অনেক বাউল গান সংগ্রহ করে প্রচার করেন। নিজে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় সেগুলো প্রচার করার ব্যবস্থা করেন। এর ফলে সুধী সমাজের মধ্যে বাংলাদেশের বাউল গান সম্পর্কে একটা ধারণা জন্মে। এমনকি বলা যেতে পারে বর্তমানে বাঙালি মধ্যবিত্তের মধ্যে লালন ফকির যে আসনে আসীন তার প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি প্রথম লালন ফকিরের গান সংগ্রহ করে সেগুলো সুধী সমাজের নিকট তুলে ধরেন। বসন্তকুমার পাল যেমন লালন জীবনী রচনা করে পাঠকের আগ্রহ তৈরি করেন তেমনি রবীন্দ্রনাথ লালনের রচনা প্রকাশ করে বাঙালি মধ্যবিত্তের মনকে আকর্ষণ করেন। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন— ‘শিলাইদহে যখন ছিলাম, বাউলদলের সঙ্গে আমার সর্বদাই সাক্ষাৎ ও আলাপ-আলোচনা হত। আমার অনেক গানেই আমি বাউলের সুর গ্রহণ করেছি এবং অনেক গানে অন্য রাগরাগিণীর সঙ্গে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে বাউল সুরের মিল ঘটেছে। এর থেকে বোঝা যাবে, বউলের সুর ও বাণী কোন এক সময়ে আমার মনের মধ্যে সহজ হয়ে মিশে গেছে। আমার নবীন বয়সে,—শিলাইদহ অঞ্চলেরই এক বাউল কলকাতারা বাজিয়ে গেয়েছিল—

কোথায় পাব তারে

আমার মনের মানুষ যে রে!

হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশ্যে

দেশ-বিদেশ বেড়াই ঘুরে।’

বাংলা ১৩১৪ সালের ভাদ্র সংখ্যাতে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালনের গান স্থান দেন। এই পত্রিকায় তাঁর গোরা উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। এর পর ‘জীবনস্মৃতি’ গান সম্পর্কিত প্রবন্ধে লালনের গানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় দর্শন মহাসভার অধিবেশনে ‘ঞযব ঢ়যরষড়ংড়ঢ়যু ড়ভ ড়ঁৎ ঢ়বড়ঢ়ষব’ শীর্ষক সভাপতির ভাষনে লালনের গানের উল্লেখ করেন। ১৩৪১ সালে কলকতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠিত ‘ছন্দের প্রকৃতি’ শিরোনামের প্রবন্ধে তিনি লালনের গানের প্রসঙ্গ তোলেন। এখানে তিনি এই কবির গানের মধ্যে ছন্দের যে যথপোযুক্ত প্রয়োগ ঘটেছে সেটি তুলে ধরেন। তিনি লালন ফকিরের গানের ছন্দের প্রসংসা করেন। এই একই প্রবন্ধ তাঁর ‘ছন্দ’ নামক বইতে অন্তর্ভুক্ত হয়। তিনি ছেঁউড়িয়া আখড়া হতে ফকির লালন সাঁইজীর দুইটি পুরাতন গানের খাতা সংগ্রহ করেন। এই খাতা দু’টি তিনি বিশ্বভারতীতে সংরক্ষিত করেন। যা এখনো ‘রবীন্দ্রভবনে’ রক্ষিত আছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে কেবল কলকাতায় বসে কলকাতার সুধী সমাজের উদ্দেশ্যে পদ্য লিখেছেন তা নয়। তাঁর কবিতার জগৎ ঘিরে ছিল সাধারণ মানুষের চিন্তন-মননকে আবিষ্ট করে। তাঁর মনে যে বাউল চেতনা প্রবিষ্ট হয় কুষ্টিয়ার বাউল-ফকিরদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে ওঠার ফলে। তিনি লালন ফকিরের গান এবং গগন হরকরার গান শুনে মুগ্ধ হন। এই মুগ্ধভাবে তাকে তাড়িত করে। তাই কেবল নিজে সে গানের ভাব-ভাষাকে আত্মস্থ করে সুখি হতে পারেননি। তাঁর চারিপাশের মানুষগুলোকেও সেই গানের মহৎ বাণী শুনিয়েছেন। নিজে সেই গানের ভাব দ্বারা অপ্লুত হয়েছেন অন্যদেরও সেই আবেগের জোরায়ে ভাসিয়েছেন। বলা যেতে পারে রবীন্দ্র মানসে যে ঔদাসিন্য তা বাউল গানেরই প্রত্যক্ষ ফল।
অনুপম হীরা মণ্ডল এর অন্যান্য লেখাসমূহ
Copyright © Life Bangladesh সাপলুডু মূলপাতা | মন্তব্য Contact: shapludu@gmail.com