Untitled Document
বাংলার চড়ক উৎসব
- অনুপম হীরা মণ্ডল


গ্রামীণ বাঙালির একটি অন্যতম ধর্মীয় উৎসব চড়ক। এটি চৈত্র মাসের সংক্রান্তিতে অনুষ্ঠিত হয়। শিবের গাজন আর নীলপুজোর মধ্য দিয়ে চড়কের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। তবে গাজন আর নীলের মধ্যেই এর আনুষ্ঠানিকতা সীমাবদ্ধ নয়। এই দুইটি স্তুতিমূলক গীতের বাইরেও চড়কের রয়েছে বহু ক্রিয়া-কৃত্য। চড়ক মূলত শিব পূজোর উৎসব। চৈত্র সংক্রন্তির ১৫ দিন বা ৭ দিন আগ থেকে শুরু হয় চড়কের প্রস্তুতি। দিন পনের আগ থেকেই এই উৎসবের আমেজ শুরু হয় গ্রামের বারোয়ারি তলায়, গ্রাম দেবতার থানে বা গ্রামের শ্মশানে। কখনো কখনো গৃহস্থ বাড়ির আঙিনা এর প্রস্তুতি লক্ষ করা যায়। যেখানে আর যে ভাবে এটি উপস্থাপিত হোক না কেন এর মূল আবহ জুড়ে থাকে বাঙালির কৃষি দেবতা শিবের আবাহন। শিব এই উৎসবের মুখ্য তাই তাকে সন্তুষ্ট করাই পূজারীদের লক্ষ্য।

বর্তমানে এই উৎসব বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এক কালে এটি বৌদ্ধ উৎসব হিসেবে পরিগণিত হতো। এই উৎসবের সঙ্গে এক কালে বাঙালি মুসলমানের অংশগ্রহণ পরিলক্ষিত হতো। ধারণা করা হয় এই উৎসবের উৎস বৌদ্ধ ধর্ম ঠাকুরের পুজো। সমকালে শিব বা নীল পূজার মধ্য দিয়ে যে উৎসব অনুষ্ঠিত হয় তা মূলত বৌদ্ধ ধর্ম ঠাকুরের পুজোর বিবর্তিত রূপ। ব্রাহ্মণ্য হিন্দু সম্প্রদায়ের উত্থানের পর্বে রাজনৈতিকভাবে পরাজিত বৌদ্ধ সম্প্রদায় আত্মগোপন শুরু করে। এই সময় তারা নির্জন, অরণ্য, প্রান্তীয় অঞ্চলে বসবাস করতে থাকে। ধর্মীয়ভাবে নিজেদের স্বতন্ত্র বজায় রাখার স্বার্থে নির্ভৃতে নির্জনে নিজেদের ধর্মাদর্শকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে। কখনো বা আধিপত্যবাদী ধর্ম তথা ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্মের ক্রিয়া-কৃত্য-দেবকল্পনার সঙ্গে নিজেদের সংহতি প্রকাশ করে। কখনো মাটির ঢিবি, কাঠ, পাথরের অমশ্রিন প্রতিকৃতি, গাছ ইত্যাদির মধ্যে স্বদেবতার কল্পনা করতে থাকে। এরই ফলশ্রতি হলো চড়ক উৎসব। যা শিবের আদলে মূলত ধর্ম ঠাকুরেরই পুজো। আধিপত্যবাদী ধর্ম ও দেবতার নিছক নিজেদের পরাজয় মেনে নিয়েছে। পরবর্তীতে পরাজিত বৌদ্ধেরা সুযোগ মতো আবার নিজস্ব দেতার অধিষ্ঠান ঘটিয়েছে। যেমন চড়কের ঠিক এক মাস পর ধর্মদেল নামে হুবহু আর একটি উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। যা চড়কের ক্রিয়া-কৃত্যের সমগোত্রীয়। এ কারণে ধারণা করা হয় আজকের চড়ক উদযাপন করা জনগোষ্ঠী বৌদ্ধ সম্প্রদায়েরই অশেষ। পরবর্তীতে এরাই আবার ইসলামী সংস্কৃতায়নের ফলে মুসলমান হয়েছে। এ কারণে অর্ধশতাব্দী আগেও পূর্বের বিশ্বাস আর আচরণের ধারাবাহিকতায় মুসলান সম্প্রদায়ও চড়কের আনুষ্ঠানিক ক্রিয়া সম্পাদন করতো। এখনো বাংলাদেশের যশোর-খুলনা- নড়াইল-বরিশাল-ফরিদপুর- ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া অঞ্চলে মুসলমান বালা ও অষ্টক শিল্পীর অস্তিত্ব আছে। যারা চৈত্র সংক্রান্তির পূর্বে গ্রামে গ্রামে চড়কের আনুষ্ঠানিক ক্রিয়া হিসেবে বালা গান আর অষ্টক গান পরিবেশন করে থাকে।

বাংলাদেশে যে চড়ক উৎসব অনুষ্ঠিত হয় তার কয়েকটি পর্ব রয়েছে। সেই পর্বগুলো এক এক করে পালনের মধ্য দিয়ে এই উৎসবের অনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। পর্বগুলো একটির সঙ্গে আর একটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। নিুে পর্বগুলো উলে¬খ করা হলো—

অধিবাস
চড়ক উৎসবের সকল অনুষ্ঠানিকতার সূচনা পর্বে অধিবাস হয়। এটির মধ্য দিয়ে মূলত নীল বা গাজন উৎসবের প্রাথমিক পর্ব। এই পর্বে ধূম-ধূনা-আতপচাউল-কলা দিয়ে নীল পূজার সূচনা হয়। এ সময় নীলপুজোর জন্য সন্ন্যাস ব্রত পালন করার প্রতিজ্ঞা করা হয়। গ্রামের নবীন-প্রবীনেরা মিলে এই ব্রত গ্রহণ করে। ব্রত অনুষ্ঠানে একজন মূল সন্ন্যাসি থাকে। তিনি সমগ্র অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন এবং পৌরহিত্য করেন। মূল সন্ন্যাসির সঙ্গে একজন বালা নির্বাচন করা হয়। এই বালা চড়কের সময় বালা গান পরিবেশন করেন। ব্রত অনুষ্ঠান শুরু করার পূর্বে সকলকে øান সেরে নতুন বস্ত্র পরতে হয়। ্পূজায় বসে সমবেতভাবে প্রতিজ্ঞা করতে হয়। এই প্রতিজ্ঞায় শিবের অনুসারী হিসেবে কেউ পূজার আনুষ্ঠানিকতা সন্ন্যাসিদের বাইরে প্রকাশ করবে না বলে জানায়। অধিবাসের পর শুরু হয় সন্ন্যাস ব্রত পালন।

সন্ন্যাস ব্রত
চড়কের অন্যতম কৃত্য হলো সন্ন্যাস ব্রত গ্রহণ। গ্রামের সাহসী পুরুষদের নিয়ে এই সন্ন্যাস দল গঠন করা হয়। এদের নেতৃত্ব দেন বয়ষ্করা। দলের কাণ্ডারী হিসেবে থাকেন মূল সন্ন্যাসি। আর তরুন ও বালকদের নিয়ে একটি শিক্ষানবীশ দল তৈরী করা হয়। নবীনেরা ৩ দিন থেকে ৭ দিন আগে এবং প্রবীনেরা ১৫ দিন আগ থেকে সন্ন্যাস ব্রত গ্রহণ করে। মূল সন্ন্যাসী সকলকে মন্ত্র পাঠের মধ্য দিয়ে দীক্ষিত করেন। এই সময় কোনো সংস্কৃত মন্ত্র পাঠ করা হয় না। এই মন্ত্র বাংলা একে বালার শে¬াক বলা হয়। সন্ন্যাসিদের কৃচ্ছ্ব্র সাধনের মধ্য দিয়ে দিনাতি পাত করতে হয়। তারা মাছ মাংস খায় না। দিনের বেলা আহার গ্রহণ তাদের বর্জনীয়। সন্ধ্যার পর শিবের আরাধনা করে এবং ভোর বেলা খাবার গ্রহণ করে। এই সময় আতপ চাউল আর নীরামিষান্ন গহণ করার রীতি। তিন দিন আগ থেকে বাড়ি বাড়ি এক একজন সন্ন্যাসি মাঙন করে। তার থাতে থাকে একটি লাঠি ও মাটির হাড়ি। এই লাঠি কয়েকটি বেত এক সঙ্গে মুড়িয়ে তৈরী করা হয়। মাঙনের সময় সন্ন্যাসি গামছা দিয়ে মুখ ঢেকে রাখেন। এ সময় তিনি কারো সঙ্গে কথা বলেন না। এমনকি কোন গ্রাম বা পুজোর স্থান থেকে এসেছে সেটাও বলে না। গ্রামের মাঙনের চাল-সব্জী দিয়ে অন্য সন্ন্যাসিদের খাওয়া খরচ চলে। সন্ন্যাসিরা তাদের অন্ন গ্রহণকে ‘সেবা গ্রহণ’ নামে অভিহিত করে।

পাট øান
চড়কের যে দেব প্রতিকৃতি থাকে তাকে পাট বলা হয়। এটি ৪ থেকে ৫ হাত লম্বা এক খণ্ড কাঠ দিয়ে তৈরী। আকারে নৌকাকৃতি। মাথা সুচালো করে নৌকার মাথার আদল তৈরী করা হয়। মধ্যে শিব-পার্বতি, শিব লিঙ্গের মূর্তি থাকে। সম্পূর্ণ পাটটি একটি লাল কাপড়ে ঢেকে রাখা হয়। দুই মাথায় ফুলের মালা-তেল-সিঁদুর-চন্দন লাগানো হয়। পুজো শেষে পাট গ্রামের বারোয়ারি মন্দিরে তুলে রাখা হয়। চড়কের সাত দিন আগে এটি বিশেষ আচার পালন করে নামিয়ে আনা হয়। এই আচারের একটি অন্যতম দিক হলো পাট øান। মূল সন্ন্যাসি মাথায় করে এই পাট মন্দির থেকে নামায়। এর পর এটি øানের উদ্দেশ্যে নদী বা পুকুরে নেওয়া হয়। পাট øান সাধারণত মধ্য বা ভোর রাত্রে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। পাট øানের অন্যতম দিক হলো সঙ নৃত্য। মূল সন্ন্যাসি যখন পাট নিয়ে নদী-পুকুরের দিকে যেতে থাকে তখন তাকে বিভিন্ন অপ্রাকৃত শক্তি বাধা দেয়। অর্থাৎ অন্যেরা মুখোশ পরে ভুত-প্রেত-দেও-দৈত্য-পশু-পাখি সেজে পাট øানে বাধা দেয়। এ সময় মূল সন্ন্যাসিসহ বালা তাদের বিভিন্নভাবে মন্ত্রপুত করে বাধা দূর করে। এই অতিপ্রাকৃত শক্তিসহ পশু-পাখিদের বিভিন্নভাবে সন্তুষ্ট করা হয়। আবার যে সকল প্রতীকধর্মী শক্তি বশে আসে না তাদের বালা এবং সন্ন্যাসি মিলে বিভিন্ন যাদু টোনা প্রয়োগ করে হটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। একই সঙ্গে চলে ঢাক-কাশির বাদ্য বাজনা ও উলু ধ্বনী। এর পর øান শেষে নির্মাণ করা মণ্ডপে পাট নিয়ে আসা হয়।

পাট নাচানী
৭ দিন আগ থেকে গ্রামে গ্রামে পাট নাচানী অনুষ্ঠান হয়। সন্ন্যাসিরা মাথায় পাট নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে। বাদ্যের তালে তালে নেচে নেচে তারা বাড়ি বাড়ি পাট নিয়ে যায়। যে বাড়িতে পাট নিয়ে যাওয়া হয় সেই বাড়ির গৃহিনী একটি পরিষ্কার পিঁড়ি অথবা জলচৌকি পেতে দেন। তার উপর পাট নামানো হয়। এর পর পাটকে তেল-সিঁদুর-মালা-চন্দন দিয়ে বরণ করা হয়। এই সময় বালা গৃহস্থের মঙ্গল কামনায় বালা গান পরিবেশন করেন। সন্ন্যসিদের ডাব, কাঁচা আম, খেঁজুর, শশা, গোল, আলু, চাল, কলা উপঢৌকন দেওয়া হয়। গৃহস্থ শীষসহ কাঁচা আম এবং খেঁজুর দেয়। এগুলো বালা মন্ত্র এবং কল্যাণকামী গানের মাধ্যমে গৃহস্থকে প্রদান করে। গ্রহস্থ সেগুলো নিজের গোলা-ঘর এবং গোহালে ঝুলিয়ে রাখে। বিশ্বাস এর মধ্য দিয়ে গৃহস্থের কল্যাণ হবে। যারা অল্প বয়সী সন্ন্যাসী থাকে গৃহস্থ তাদের দিয়ে ডাব পাড়িয়ে নেয়। বিশ্বাস স্থাপন করা হয় যে সন্ন্যাসীরা নারকেল গাছে উঠলে তাতে ফল ভালো হবে।

উড়োভোগ
চড়ক বা নীল পূজোর উদ্দেশ্যে যে ভোগ দেওয়া হয় তা অভিনব। একজন সন্ন্যাসি øান সেরে ভোগ তৈরী করে। ভোগ হিসেবে থাকে শোল এবং শিং মাছ পোড়া, আতপ চাউলের ভাত, কাঠাল, মিষ্টান্ন, ডাব ইত্যাদি। একটি ডালার উপর, ভোগগুলো সাজিয়ে রাখা হয়। সন্ধ্যার পর একজন সন্ন্যাসির মাথায় তুলে ঢাক-কাঁসি বাজাতে বাজাতে দৌঁড়ায়। যার মাথায় ভোগ থাকে সে সামনে এবং তার পিছে পিছে অন্যরা দৌঁড়ায়। এই ভোগ কোথায় নিবেদন করা হবে তা গোপন রাখা হয়। কেবল মূল সন্ন্যাসি এবং ভোগ বহনকারী ব্যক্তি ছাড়া অন্যরা এ বিষয়ে কিছু জানতে পারে না। যাওয়ার সময় সন্ন্যাসিরা মুখে, “ব’লে শিবল মহাদেব/জয় শিব” ধ্বনী তোলে। যেখানে ভোগ নিবেদন করা হয় সেখানে আগ থেকেই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখা হয়। সাধারণত কোনো শ্মশান, গ্রাম দেবতার থান বা শিব মন্দিরে এই ভোগ নিবেদন করা হয়। নিবেদনের স্থানে চারটি কঞ্চির তীর কাঠি, মাধায় তাল পাতা, লালসুতা, ঘট, আমের পল¬ব, ডাব ইত্যাদি দেওয়া হয়। এর পর মূল সন্ন্যাসি পূজা শুরু করে।

কাঁটা সন্ন্যাসি
সংক্রান্তির আগের দিন সন্ন্যাসিরা বিভিন্ন শারীরিক কসরত করতে থাকে। এর মধ্যে একটি হলো কাঁটা সন্ন্যাসি। মাটির উপর খেঁজুর-বেল-শিয়ালকুল ইত্যাদি গাছের কাঁটা বিছিয়ে দেওয়া হয়। এর পর এই কাটার উপর বয়স্ক সন্ন্যাসিরা গড়িয়ে গড়িয়ে যেতে থাকে। তারা এতোই অভিনব এবং সূক্ষ্ম কৌশলে কাঁটার উপর দিয়ে যায় যে তাদের গায়ে কাঁটা ফোঁটে না। গায়ে কাঁটা না ফোঁটার কায়দাই হলো এই খেলার বৈশিষ্ট্য। এই ক্রীড়ার মাধ্যমে সন্ন্যাসিরা বিভিন্নভাবে তাদের শরীরকে কষ্ট দেয় এবং নিজেদের ভক্তি প্রকাশ করে। প্রতিবছর কিছুু নবীন সন্ন্যাসিকে কাঁটা সন্ন্যাসিতে দক্ষ হয়ে উঠতে তালিম দেওয়া হয়।

আগুন সন্ন্যাসি
সন্ন্যাসিদের শারীরিক কসরতের আর একটি দিক হলো অগুন সন্ন্যাসি। সংক্রান্তির দিন আগের রাত্রে সন্ন্যাসিরা এই অনুষ্ঠানটি পালন করে। মাটিতে কয়লার জলন্ত আগুন বিছিয়ে দেওয়া হয়। এর পর সন্ন্যাসিরা শিবের প্রতি তাদের ভক্তি নিবেদনের উদ্দেশ্যে এই আগুনের উপর দিয়ে হেঁটে যায়। আগুনের উপর দিয়ে যাওয়ার সময় তারা উচ্চৈস্বরে “ব’লে শিবল মাহাদের, জয় শিব” বলে ধ্বনী দেয়। তবে সবাই এভাবে আগুনের উপর দিয়ে হেঁটে যেতে পারে না। কেবলমাত্র যাদের দক্ষতা আছে তারাই অগুনের উপর দিয়ে হাঁটে। সাধারণত বয়ষ্ক সন্ন্যাসিরা আগুন সন্ন্যাসি হয়। এভাবে জলন্ত আগুনের উপর দিয়ে চলে সন্ন্যাসিরা তাদের ভক্তির প্রমান দেয়।

দশাবতার নৃত্য
সংক্রান্তির আগের দিন সন্ধ্যা বেলা পূজো মণ্ডপকে ঘিরে বালা গানের সঙ্গে নানা ধরনের নাচ করা হয়। এই নাচেন মধ্যে একটি অন্যতম নাচ হলো দশাবতার নাচ। মূল সন্ন্যাসী বা অন্য একজন গায়ক সন্ন্যাসি গান করে আর অন্যেরা সমবেতভাবে গানের কথার সঙ্গে মিলিয়ে নাচতে থাকে। গানের কথা হিসেবে দশজন অবতারের মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়। কোন সময় কোন কোন অবতার পৃথিবী এসেছেন তাদের রূপ কেমল ছিল, লীলা কেমন ছিল এই সকল কথাই গানের মধ্যে থাকে। আর সন্ন্যাসিরা সমবেতভাবে নাচের মধ্য দিয়ে সেই লীলাকে দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করে। দশাবতার নৃত্যের মূল কথাই হলো দশ অবতারের মহিমা বর্ণনা করা।

চাষা নৃত্য
সংক্রান্তির আগের দিন চাষা নৃত্য পরিবেশিত হয়। সন্ন্যাসিদের মধ্যে একজন চাষি, দুজন গরু হয়ে চাষ দিয়ে ফসল বোনে। আর অন্যরা সেই ফসল ক্ষেতে বিভিন্ন উপদ্রব হয়ে হাজির হয়। কেউ ইঁদুর, কেউ পাখি আবার কেউবা গরু, ছাগল ইত্যাদি। মূলত শিবকে চাষিদের দেবতা জ্ঞান করে তার নিকট ফসল রক্ষার আর্তি জানানো হয়। একজন চাষার ফসলের উপর যে সকল উপদ্রব থাকে সেই সকল উপদ্রব হতে মুক্তির জন্য শিবের নিকেট আহ্বান জানানো হয়। এই নৃত্যের সঙ্গে খরা, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হতে ফসল রক্ষার অর্তিও থাকে। সাধারণত একজন কৃষকের ফসল বোনা থেকে মাড়াই করে গোলায় তোলা পর্যন্ত যে সকল বিপদ-আপদ থাকে সেগুলো থেকে উত্তরণের আর্তি হিসেবে এই নৃত্যের বিষয় প্রকরণ উপস্থাপিত হয়।

মুখা নৃত্য
সংক্রান্তির দিন মুখা নৃত্য বা মুখোশ নৃত্য নামে এক ধরনের নৃত্য করা হয়। মুখোশ পরে সন্ন্যাসীদের মধ্যে থেকে একজন কালী এবং একজন শিব সেজে নাচে। এই সকয় ঢাকের বাজনা চলে আর তারা উদ্দণ্ড নৃত্য করে। বিশ্বাস স্থাপন করা হয় যে এই সময় মুখোশধারী দুজনের উপর কালী এবং শিব ভর করে। মুখা নুত্যের সময় মুখোশধারীদের বাহ্যজ্ঞান লোপ পায় এবং তারা উন্মাদের মতো নৃত্য করতে থাকে। এক সময় দেখা যায় তাদের মধ্যে অনেকেই অতিভক্তিতে পাগল প্রায় হয়ে যায়। এমনকি উপস্থিত ভক্তেরা তাদের ধরে বিভিন্ন মানদ করতে শুরু করে। এ সময় অনেকেই তাদেরকে শিব-পর্বতি জ্ঞানে পূজা করে। মুখা নৃত্যের সময় বালা এবং অন্য শিল্পীরা শিব-পার্বতিকে কেন্দ্র করে অনেক মাহাত্ম্যসূচক গান গায়। এর সঙ্গে সমানে চলে ঢাক-কাঁসির বাদ্য বাদন।

মশাল নৃত্য
সংক্রান্তির দিন রাত্রে মশাল নৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। এই দিন বিকাল বেলা খেঁজুর ভাঙ্গার পর এবং চড়ক ঘুরাবার পর মশাল নৃত্যের অনুষ্ঠার হয়। সন্ন্যাসীসহ গ্রামের নারী-পুরুষ মিলে মশাল হাতে এই নৃত্যে অংশগ্রহণ করে। এ সময় অনেকের হাতে থাকে কেরসিনের বোতল। সেই বোতল থেকে মাঝে মাঝে মশালে ফুৎকার দিয়ে তেল দেওয়া হয়। কারো কারো হাতে থাকে রাম দা। কয়েকজন মিলে একাধীক রাম দায়ের পিঠের উপর মরার মতো এক একজনকে শুইয়ে নৃত্য করে। মশাল নৃত্যের সঙ্গে সমান তালে ঢাক, কাঁসি, জয়ঢাক বাজতে থাকে।

খেঁজুর ভাঙ্গা
দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গের চড়কের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো খেঁজুর ভাঙ্গা অনুষ্ঠান। সংক্রান্তির দিন এবং তার আগের দিন গাছে উঠে সন্ন্যাসিরা খেঁজুর ভাঙ্গে। কোথাও কোথাও কেবল সংক্রান্তির দিন খেঁজুর ভাঙ্গা হয়। গাছে ওঠার আগে সন্ন্যাসিরা গাছকে পূজা করে। ধূপ-ধুনা জালিয়ে আরতি করে। গাছের গোড়ায় তেল-সিঁদুর-জল দেয়। এই সময় বালা ঢাকের তালে তালে বালা গান পরিবেশন করে। সন্ন্যাসিরা এই গানের তালে তালে বিশেষ কায়দায় নেচে নেচে ধুনাতে ধূপ দেয়। অন্য সন্ন্যাসিরা চারিদিকে গাছকে ঘিরে বসে থাকে। পালা করে দ’ুজন, চারজন করে নৃত্য করে। এই সময় মূল সন্ন্যাসি গাছের নিচে মুখ বন্ধ করে বসে থাকেন। তিনি কারো সঙ্গে কথা বলেন না। পূজা শেষে সন্ন্যাসি যখন তার মুখের গামছা খুলে দেয় তখন অন্য সন্ন্যাসিরা দ্রুত গাছে উঠে খেঁজুরের ছড়া থেকে খেঁজুর ছিড়ে নিচেয় ফেলতে থাকে। একই সঙ্গে চলে ঢাকের বাজনা আর গাছের উপর সন্ন্যাসিদের মাতন। তখন উপস্থিত ভক্ত-দর্শনার্থীরা সেই খেঁজুর খায়। তাদের বিশ্বাস এই খেঁজুর খেলে তাদের মঙ্গল হবে।

চড়ক ঘুর্ণি
সংক্রান্তির দিক বিকাল বেলা চড়ক ঘূর্ণি অনুষ্ঠান হয়। এক বা একাধীক সন্ন্যাসি চড়কে ঘোরে। যারা বা যে চড়কে ঘুরে তাকে বা তাদেরকে øান করিয়ে নতুন বস্তু পরানো হয়। বস্ত্র হিসেবে থাকে এক খণ্ড নতুন সাদা কাপড় বা ঘুতি। এটি কাছা দিয়ে তাকে লেংটির মতো করে পরানো হয়। কখনো কখনো মালকোচা দিয়ে পরতেও দেখা যায়। এর পর তাকে মূল সন্ন্যাসি মন্ত্রপূত করেন। তার পিঠের নিচের অংশের মেরুদণ্ডে একটি বড় লোহার আকড়ি বা হুক গেথে দেওয়া হয়। এর পর একটি গেড়ে রাখা বাঁশের উপর আর একটি আড়াআড়ি বাশ দেওয়া হয়। এই বাঁশের এক মাথায় ঘূর্ণি দেওয়া লোকটি এবং অন্য মাথায় একটি দড়ি বেধে ঘোরানো হয়। ঘূর্ণি দেওয়া লোকটির হাতে থাকে বিভিন্ন প্রকার ফল। সে ঘুরতে ঘুরতে তার হাতে এবং বুকে বেধে দেওয়া ফল ছুড়তে থাকে। ছুড়ে দেওয়া ফল উপস্থিত দর্শক-ভক্তগণ কুড়িয়ে নেয়। এই ফল খাওয়ার কারণ হিসেবেও তাদের মধ্যে কামনা পূরণের ইচ্ছা কাজ করে। ঢাকের বাজনা যতো দ্রুত বাজে চড়কে বাঁশও ততো ক্ষীপ্র গতিতে ঘুরতে থাকে। এভাবে দীর্ঘক্ষণ ঘোরানোর পর বাঁশের মাথা থেকে লোকটিকে নামানো হয়।

নীলপুজো
সংক্রান্তির দিন সন্ধ্যার অনুষ্ঠানিকতার পর শুরু হয় নীল পুজো। এই সময় মাটি দিয়ে শোয়ানো অবস্থায় একটি দেব মূর্তি তৈরী করা হয়। যে মূর্তিকে শিবের মূর্তি বলা হয়। এটি অনেকটাই অমসৃন থাকে। ঠিক শিবের আদল বোঝা যায় না। নরম মাটি দিয়ে তৈরী এই মূর্তির গায়ে খেঁজুর দিয়ে আবরণ দেওয়া হয়। চারি পাশে খেঁজুর পাতা দিয়ে ঘিরে রাখা হয়। কোথাও কোথাও মাটির মূর্তি তৈরী করা হয় না। এর পরিবর্তে একটি মাটির ঢিবি তৈরী করা হয়। এর পর ফুল-বেল পাতা দিয়ে শুরু হয়। নীল পুজো। একই সঙ্গে চলে বালা গান আর বালার শে¬াক।

অষ্টক গান
চড়কের আর একটি অন্যতম অঙ্গ হলো অষ্টক গান। অষ্টক হলো রাধা কৃষ্ণের প্রেমকাহিনী নির্ভর গান। আর চড়ক হলো শিব পূজোর অনুষ্ঠান। কিন্তু কি কারণে এবং কখন থেকে শিব পুজোর এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের গীতের সংযোগ ঘটেছে তা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। তবে দক্ষিণ-পূর্ববঙ্গের চড়কের সঙ্গে অষ্টক গান অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, নড়াইল, বাগেরহাট, মাগুরা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, বরিশাল, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ ইত্যাদি জেলার চড়ক পূজোয় অষ্টক গান পরিবেশিত হতে দেখা যায়। অষ্টক গান দুই ভাবে পরিবেশিত হয়। একটি পাট নাচানির সময় বালা গানের সহায়ক হিসেবে। গ্রামের ছোট ছেলে মেয়েরা রাধা-কৃষ্ণ এবং সখি সেজে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের গান গায়। আর একটি হলো সংক্রান্তির দিন রাত্রে। এই রাতের অষ্টক গানকে অষ্টক যাত্রা বলা হয়। এই গানের ধরন হলো অভিনয় নির্ভর আখ্যান পরিবেশন এবং এই আখ্যান বর্ণনায় সংলাপের সহায়ক হিসেবে গানের অধিক্য।

বাংলাদেশের রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, নীলফামারী, বগুড়া, রাজশাহী, নওগাঁ, নাটর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, যশোর, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনা প্রভৃতি জেলায় চড়ক উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের সাধারণ গ্রামীণ মানুষ চড়ক উৎসবের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। এই উৎসবের সকল ক্রিয়া-কৃত্য সবই প্রান্তীয় মানুষের সক্রিয় উপস্থিতিতে সমাধা হয়। এই উৎসব এবং আচারের মধ্যে কোনো ব্রাহ্মণ্য পৌরহিত্য থাকে না। সাধারণত গ্রামের মানুষই এই উৎসবের আচারকে টিকিয়ে রেখেছে। নাগরিক জীবনের অভ্যস্ততায় ধীরে ধীরে চড়ক উৎসব ক্ষীয়মান হতে বসেছে।

অনুপম হীরা মণ্ডল এর অন্যান্য লেখাসমূহ
Copyright © Life Bangladesh সাপলুডু মূলপাতা | মন্তব্য Contact: shapludu@gmail.com