Untitled Document
বাংলার ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারার সমকালীন চালচিত্র
- সাইমন জাকারিয়া
বাংলার এমন কোনো গ্রাম-প্রান্তর, শহর-শহরতলী, সমতল বা জলসীমা খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে কোনো না কোনো পরিবেশনাশিল্পের অস্তিত্ব নেই। একথার মর্মার্থ হচ্ছে- বাংলার প্রায় সর্বত্র পরিবেশনাশিল্পের অস্তিত্ব রয়েছে। সে হোক গানের আঙ্গিকে বা নাচের আঙ্গিকে অথবা নাচ-গান-সংলাপ-বর্ণনা-গল্পকথন ও অভিনয়ের মিশ্র আঙ্গিকে, এমনকি সংলাপ-কথা বর্জিত আঙ্গিক-অভিনয়ের রীতিও এদেশে লভ্য।
একসময় শহরকেন্দ্রিক নাট্যবোদ্ধারা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর এসকল পরিবেশনাশিল্পকে নাট্যকর্ম বলে স্বীকৃতি দিতে চাননি। কিন্তু অচিরেই শহরকেন্দ্রিক নাট্যব্যক্তিত্বদের সে ভ্রম ভাঙতে শুরু করে এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর পরিবেশনাশিল্পসমূহ নাট্যকর্ম হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। শুধু তাই নয়, এদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর নাট্যকর্মই যে এদেশের ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারা সে কথাও আজ সর্বজন স্বীকৃত। এমনকি এদেশের ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারার দুই সহস্রাব্দ প্রাচীন ইতিহাসও আজ প্রমাণিত। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে রচিত বাংলাভাষার এযাবৎপ্রাপ্ত প্রাচীনতম সাহিত্যনিদর্শন চর্যাপদ বা চর্যাগীতিতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে বুদ্ধ নাটক-এর কথা, নাট্যশিল্পী অভিনেতা, অভিনেত্রী, নর্তকী, বাদ্যকর ও পরিবেশনাশিল্পীদের সাজপোশাকের কথা। পরবর্তীকালের সাহিত্যকীর্তি ১৩৭০ থেকে ১৪৩৩ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে রচিত শ্রীকৃষ্ণকীর্তন তো নাট্যগীতেরই পাণ্ডুলিপি সে কথাও প্রমাণিত। অন্যদিকে বৃন্দাবন দাসের চৈতন্যভাগবত-এ সুস্পষ্টভাবে ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে চৈতন্য মহাপ্রভুর নাট্যাভিনয়ের বর্ণনা রয়েছে।
আমরা যদি খোলা চোখে বিবেচনা করি, তাহলে স্পষ্টভাবেই বলতে পারি- বাংলার ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারার অন্তর্ভুক্ত উপর্যুক্ত কিছু পরিবেশনাশিল্প অদ্যাবধি বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের জনসমাজে প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু এ সম্পর্কে বিস্তৃত কোনো গবেষণাকর্ম আমাদের চোখে পড়েনি।

নেপালে প্রচলিত চর্যানৃত্য

সম্প্রতি আমি সাধনা : উপমহাদেশীয় সংগীত ও নৃত্য প্রসার কেন্দ্রের উদ্যোগে আমার রচিত একটি বৃদ্ধ নৃতনাট্যের প্রযোজনাপূর্ব গবেষণাকর্ম সম্পাদনে নেপালে গমন করি এবং সেখানে গিয়ে আমরা বাংলার প্রাচীন চর্যানৃত্যগীতির পরিবেশনাশিল্পের সাম্প্রতিক চর্চা প্রত্যক্ষ করি। স্বচোখে দেখে আসি নেপালের বজ্রযানী বৌদ্ধরা এখনও বিভিন্নভাবে চর্যাগান গেয়ে থাকেন, চর্যানৃত্য পরিবেশন করে থাকেন, এমনকি আসরে তারা চর্যার মূল পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করে থাকেন। যার সঙ্গে বাংলাভাষার বহু চর্যাপদের সাদৃশ্য রয়েছে। অথচ কি আশ্চর্য যে, বাংলাভাষার প্রাচীনতম সাহিত্যনিদর্শন চর্যাপদ আবিষ্কারের একশত বছর অতিক্রান্ত হলেও চর্যার নৃত্যনাট্যগীতি পরিবেশনার সমকালীন ঐতিহ্য নিয়ে তেমন কোনো গবেষণাকর্ম বাংলাভাষায় আমরা প্রত্যক্ষ করতে পারিনি। আমরা অচিরেই সেই কাজটি সম্পাদন করতে আগ্রহী এবং সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।
এবার যদি বলি শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের পুরাণনির্ভর পরিবেশনার কথা, তার অস্তিত্ব তো বাংলাদেশের সীমান্ত ছাড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে সুদূর দিল্লি-আগ্রার নিকটবর্তী মথুরা-বৃন্দাবন পর্যন্ত বিস্তৃত। বাংলাদেশে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন নির্ভর অভিনয়শিল্পের গবেষণায় পূর্ণাঙ্গতা প্রদানের লক্ষ্যে আমরা বাংলাদেশের মনিপুরি নৃগোষ্ঠী থেকে শুরু করে বাঙালিদের অষ্টগান, কৃষ্ণযাত্রা পরিবেশনারীতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার অষ্টকমেলা ও প্রতিযোগিতায় যোগদানসহ মথুরা-বৃন্দাবনে গমন করি। সকলস্থানেই বাঙালিদের স্বতঃস্ফূর্ত যে নাট্য প্রণোদনা দেখেছি তাতে বিস্মিত না-হয়ে উপায় থাকে না।
এ বছরের প্রথম দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অষ্টমেলায় প্রত্যক্ষ করেছি- সেখানে যে-সকল পালাকারের রচিত অষ্টকপালা মঞ্চস্থ বা পরিবেশিত হয়ে থাকে, সে-সকল পালাকারগণের অধিকাংশের বাড়িই বাংলাদেশে, এখনও তাদের অনেকই বাংলাদেশেরই অধিবাসী। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো অষ্টকপালার পালাকারগণ বাংলাদেশে বসবাস করলেও তাদের পালাগুলো আমাদের সীমান্তের ওপারে পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা, নদীয়া ইত্যাদি জেলার গ্রামে গ্রামে প্রায় নিয়মিতভাবে অভিনীত হয়ে চলেছে। ব্যক্তিগত আগ্রহের কারণে আমরা নদীয়ায় অনুষ্ঠিত অষ্টকমেলা থেকে ঘুরে এসে বাংলাদেশে বসবাসরত সে-সকল পালাকারদের সন্ধানে ঝিনাইদহ ও মাগুরা গমন করি- যাদের রচিত পালা পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ আসরে পরিবেশিত হয়ে থাকে। দুর্মর আগ্রহের জোরে শেষ পর্যন্ত আমরা মাগুরা জেলার বরইচারা গ্রামে গিয়ে একজন অষ্টকগানের পালাকারকে খুঁজে বের করতে সক্ষম হই, যার পালা নদীয়াতে পরিবেশিত হয়ে থাকে। কিন্তু হতাশ হই অন্য কারণে, আর তা হলো- পশ্চিমবঙ্গে পালাকার বীরেন্দ্রনাথ রায়ের অষ্টকপালা পরিবেশিত হলেও মাগুরা জেলায় তার নিজের গ্রাম থেকেই এখন অষ্টকগানের প্রচলন উঠে গেছে। কারণ হিসেবে জানতে পারি, গ্রামটি বিগত কয়েক বছর ধরে ব্লকের চাষ বা হাইব্রিড ইরি চাষ প্রচলিত হয়েছে- তাই কৃষকের চৈত্রসংক্রান্তির অবসর ঘুচে গেছে, অগত্যা তারা আর ঋতু-ভিত্তিক অষ্টকগানের আয়োজন করতে পারেন না। এছাড়া, আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে অষ্টকপালার কোনো যোগসূত্র নাই বলে, গ্রামের আধুনিক শিক্ষায় আগ্রহী অভিভাবকেরা তাদের শিশুদেরকে অষ্টকপালায় অভিনয় করতে দেন না। ফলশ্র“তিতে সেই গ্রাম থেকে অষ্টকগানের প্রচলন উঠে গেছে। এমনই পরিস্থিতিতে বরইচারা গ্রামের অষ্টক পালাকার বীরেন্দ্রনাথ রায় (৮০) প্রায় ৬০ বছর ধরে লেখা তার লেখা ছাব্বিশটি অষ্টকপালার পাণ্ডুলিপি আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন, আমরা যেন সেগুলো বই আকারে প্রকাশের ব্যবস্থা করি। এই ইতিহাস নিশ্চিতভাবেই আমাদের ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারার জন্য একটা মর্মান্তিক ঘটনা ও সংবাদ। তবে এরবাইরেও কথা আছে, বাংলাদেশের বহু অঞ্চলে এখনো বেশ ভালোভাবেই ভক্তিবাদী মানুষের গুণে অষ্টকপালার প্রচলন রয়েছে, এখনো নড়াইল জেলার এগারোখান গ্রামে অষ্টকপালার প্রচলন রয়েছে। এছাড়া কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মাগুরা জেলার বিভিন্ন গ্রামে অষ্টকপালা ও গানের প্রচলন রয়েছে বলে জানা যায়।
মহাপ্রভু চৈতন্যদেব পরবর্তী সময়ে বাঙালির জাতীয় মহাকাব্য শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের আখ্যান নির্ভর অভিনয়ধারার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চৈতন্যদেবের জীবনাখ্যানের বিরহমূলক অংশ; তথা মা ও স্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে শ্রীচৈতন্যদেব যে সন্ন্যাস নিয়েছিলেন- তার ঘটনা নিয়ে কৃষ্ণলীলা ও কৃষ্ণযাত্রার অভিনয়াঙ্গিক এখনও পরিবেশিত হয়ে থাকে। এসকল অভিনয়াঙ্গিকে মূলত শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে চৈতন্যমহাপ্রভুর চরিত্রকে মিলিয়ে দিয়ে তাকে তাঁরই তথা কৃষ্ণের অবতার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। বাংলাদেশের গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, লালমনিরহাট ইত্যাদি অঞ্চলে এধরনের পরিবেশনাশিল্পের ঐতিহ্য দেখেছি।


ভারতের নদীয়া জেলায় প্রচলিত অষ্টকপালা
নেত্রকোণায় প্রচলিত জারিগান

এ পর্যায়ে ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারার অন্যান্য প্রসঙ্গে আসা যাক। আসলে পঞ্চদশ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বাংলাদেশের নাটকে আরেক ধরনের নবজাগরণ সৃষ্টি হতে থাকে। আর তা হলো- এই সময় থেকে বিচিত্র দেব-দেবীর আখ্যান পরিবেশিত হতে শুরু করে, যেমন- ওই সময় থেকে অদ্যাবধি বাংলার প্রায় সর্বত্র প্রচলিত রয়েছে সর্পদেবী মনসা বা পদ্মাপুরাণের আখ্যানের পরিবেশনা; চণ্ডীমঙ্গল তথা শিব-পার্বতী ও মা-কালীর আখ্যান নির্ভর পরিবেশনা; কিংবা রামায়ণ ও মহাভারতের পরিবেশনাশিল্পেরও প্রচলন হয় সেই সময়কালে। এখনও এসকল পরিবেশনার প্রাণবন্ত ঐতিহ্য বাংলাদেশের সর্বত্র রয়েছে। যা বিস্তৃতভাবে বলতে গেলে হাজার পৃষ্ঠা ব্যয় করলেও ফুরাবে না। উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাংলায় কৃত্তিবাস রামায়ণ লেখার পর যেভাবে বাঙালিদের মধ্যে দুর্গাপূজার প্রচলন হয়েছিল, অর্থাৎ লেখকের লেখা থেকে বাঙালির নতুন উৎসব ও প্রাণবন্ত একটি কৃত্যাচারের জন্ম ঘটেছিল, এখনও সেই কৃত্যাচার ও উৎসব বাঙালি লালন ও পালন করে আসছে। এটা সাহিত্যের সঙ্গে সংস্কৃতির সম্পর্ক বিচারের ক্ষেত্রে দারুণ একটা বিষয়, কিন্তু আমাদের দেশে বাঙালি কবির এই শক্তি নিয়ে সুবিস্তৃত ব্যাখ্যা আজও তেমনভাবে উপস্থাপিত হতে দেখি না। কৃত্তিবাসের রামায়ণের মতো বিজয়গুপ্ত, দ্বিজবংশী দাস, কেতকা দাস, নারায়ণ দেব প্রমুখ কবি পদ্মাপুরাণ বা মনসামঙ্গল রচনার পরও এমনটা ঘটেছে। কিন্তু পদ্মাপুরাণের কৃত্যাচারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এদেশের মুসলমান জনতা, আর তাই তার কৃত্যাচারেও ভিন্ন একটা মাত্রা যোগ হয়েছে।
এবার সে প্রসঙ্গে আসছি, অবাক হবার মতো একটা ঘটনা হলো- মনসামঙ্গলের আখ্যানে আছে বেহুলা তার মৃত স্বামীকে নিয়ে কলার ভেলায় নদীতে ভেসে সাত সাতটি ঘাট অতিক্রম করে- দেবপুরে গিয়ে- নেচে দেবতাদের মন জয় করে- মৃত স্বামীর জীবন ফিরিয়ে এনেছিলেন। এই ছিল মিথ বা পুরাণ কথা, কিন্তু বেহুলার এই নদীতে ভাসা এবং সাত ঘাটে যাবার পুরাণকে বাস্তবে রূপ দিয়ে বাংলাদেশের টাঙ্গাইল অঞ্চলের মুসলিম গায়ক ও সাপুড়েরা প্রতিবছর শ্রাবণসংক্রান্তিতে পুরাণ কথার মতোই নদীতে নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন, সঙ্গে রাখেন একটি কলার মান্দাস বা ভেলা, সারাদিন তারা নৌকার উপর নেচে গেয়ে সাতটি ঘাটে গিয়ে থামেন এবং একটি করে কলার মোচা ভাসিয়ে দেন মা মনসার নামে কলা-দুধ ও চিনি দিয়ে। তারপর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আসেন। শুধু একটি নৌকা নয়, টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর, কালিহাতি ও ঘাটাইল থানার ফটিকজানি বা ঝিনাই নদী, বংশাই নদীতে এই সময়ে আরো বহু নৌকাতে এ রকম গীতিনৃত্য প্রত্যক্ষ করা যায়। টাঙ্গাইলের সাধারণ জনতা মিথের এই বাস্তব উপস্থাপনা বা সংস্কৃতির নাম দিয়েছেন ‘শাওনে ডালা। পুরাণের এমন বাস্তব উপস্থাপনা বাংলাদেশে আরও বহু ক্ষেত্রে রয়েছে। সে সকল চালচিত্র যথাযথভাবে তুলে ধরার জন্য প্রয়োজন সম্পূর্ণরূপে জনসংস্কৃতি সমীক্ষণকেন্দ্রিক গবেষণা ও সাধনা।
আজকের আলোচনায় অতি সংক্ষেপে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী নাটকের ইতিহাস ও সাম্প্রতিক অবস্থার কিছু চিত্রের উল্লেখ করছি মাত্র। ইতিহাসের ধারাবাহিকতার কথা বললে, এবার পঞ্চদশ খ্রিষ্টাব্দের পরবর্তীতে বাংলায় প্রচলিত লোকায়ত মুসলিম পীরদের আখ্যানের কথা বলতে হয়। আসলে, এ সময় থেকে অদ্যাবধি লোকায়ত মুসলিম পীর গাজী-কালু, মাদার, মানিক, একদিল ও খোয়াজ খিজিরের মাহাত্ম্য প্রচারমূলক আখ্যানের বিচিত্র পরিবেশনার অস্তিত্ব বাংলাদেশে রয়েছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাংলাদেশের ভক্তিবাদী মানুষের সৃজনশীলতার পরিচয় যেমন বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মীয় আখ্যানগুলোতে লাভ করা যায় তেমনি ইসলামধর্মীয় আখ্যানেও তারা তাদের সৃজনপ্রতিভাকে প্রয়োগ করতে দ্বিধা করেননি। যেমন প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করা যায়- লোকায়ত মুসলিম পীর খোয়াজ খিজিরের কথা। এই পীরের আখ্যানটি আহরিত হয়েছে সরাসরি পবিত্র কোরানের একটি সুরার কয়েকটি আয়াত বা বাক্য দেখে। কিন্তু বাংলাদেশের গ্রামীণ জনতা এই পীরের সঙ্গে অবলীলায় মিশিয়ে দিয়েছেন গঙ্গাদেবীকে মিলিয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশের মানিকগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ ও ঢাকার নবাবগঞ্জ অঞ্চলে প্রতি বছর বাংলা ভাদ্র মাসের বিভিন্ন সময়ে পীর খোয়াজ খিজিরের স্মরণে বেইড়া ভাসান হয়। শত শত ভক্তিবাদী গ্রামীণ মানুষ এই উৎসবের প্রধান আয়োজক ও অংশগ্রহণকারী।
বাংলাদেশের অপরাপর নাট্যঐতিহ্যের মধ্যে রয়েছে কৃষিজীবী চাকমা-মারমা জনগোষ্ঠীর বৌদ্ধধর্মীয় আখ্যানের পরিবেশনা; নাথযোগীদের সাধনতান্ত্রিক পরিবেশনা; খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর পরিবেশনা, বিচিত্র ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় পরিবেশনা এবং সর্বোপরি এদেশের বৃহত্তর কৃষিজীবী ও ক্ষুদ্র পেশাজীবী মানুষের বিচিত্র পরিবেশনার কথা না বললে সত্যের অপলাপ হবে।
বাংলার ঐতিহ্যবাহী নাট্য পরিবেশনার সঙ্গে ঋতুবৈচিত্র্যর সুগভীর একটি সম্পর্ক আছে। ঋতুর সঙ্গে এদেশের উৎপাদনমুখী কৃষিজীবী মানুষ যুক্ত, মূলত তাদের কাজের অবসরের সময়গুলোতেই ঐতিহ্যবাহী নাট্যের পরিবেশনা সম্ভব হয়ে ওঠে। খোলাচোখে তাকালে দেখা যায়- চৈত্রমাসে কাজের অবসরে এদেশের কৃষিজীবী মানুষ অষ্টক, গম্ভীরা, আলকাপ, কালীকাচ, পরীনাচের আয়োজন করে থাকে। অবশ্য সে সময় সারাদেশ জুড়ে হর-গৌরী পূজার আয়োজন চলে আর সে সময়ের পরিবেশনাগুলো গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর একাংশ এখন পূজা উপলক্ষে করে, অপরাপর অংশ বর্ষবিদায়-বর্ষবরণ এবং অন্য অংশ কাজের অবসর বুঝেই আয়োজন করে থাকে। কৃষিজীবী মানুষের জীবনে আরেকটি অবসর আসে বর্ষার শেষে, সে সময় সারা দেশ মনসা বা পদ্মাদেবীর নাট্য পরিবেশনায় মুখর থাকে। (যে প্রসঙ্গে ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে আগেই কিছু কথা বলা হয়েছে।) এখানে আরেকটু বলার প্রয়োজন বোধ করছি। আসলে, বর্ষার শেষটা এদেশে শ্রাবণসংক্রান্তি নামে পরিচিত এবং এসময়টা সর্পদেবী মনসার পূজার মৌসুম। তাই বর্ষার শেষে মনসা বা পদ্মাদেবীর পৌরাণিক আখ্যান নির্ভর যে নাট্য পরিবেশনা সম্ভব হয়ে ওঠে তার সঙ্গে একদিকে যেমন কৃষিজীবী মানুষের অবসরের একটা সম্পর্ক আছে অন্যদিকে তেমনি মনসাপূজারও সম্পর্ক রয়েছে।
বর্ষার অবসরকে আশ্রয় করে কোনো কোনো অঞ্চলের মনসামঙ্গলের পরিবেশনার পাশাপাশি উপকথা-রূপকথার পরিবেশনাও চলে কিচ্ছাপালা নামে, এ ধরনের পরিবেশনা মূলত বৃহত্তর ময়মনসিংহের হাওড় অঞ্চলে অধিক প্রচলিত।


মানিকগঞ্জে প্রচলিত ইমামযাত্রা

মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ থানার মনিপুরী রাসনৃত্য

ঋতুর সঙ্গে চাঁদেরও একটি সম্পর্ক আছে। আর চাঁদের হিসেবে বাংলার ঐতিহ্যবাহী নাট্য পরিবেশনার কিছু কৃত্য যুক্ত রয়েছে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর পরিবেশনা। আরবি মহরম মাসের চাঁদ ওঠার প্রথম দিন থেকে দশম দিন তথা আশুরা দিন পর্যন্ত বাংলাদেশের মানিকগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামে ইমামযাত্রা, জারিগান-জারিনাচ পরিবেশিত হয়ে থাকে, একই সময়ে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ জেলার বিভিন্ন গ্রামে বিষাদ-জারি পরিবেশিত হয়ে থাকে, এছাড়া কুমিল্লা, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, রাজবাড়ি জেলাতেও জারিগান-জারিনাচ অনুষ্ঠিত হয়; রাসপূর্ণিমা উপলক্ষে মণিপুরি মৈতৈ ও বৈষ্ণব নৃগোষ্ঠী রাধাকৃষ্ণের লীলানাট্য পরিবেশন করে থাকে; বৌদ্ধরা বৈশাখী পূর্ণিমাতে বিভিন্ন ধরনের কৃত্যমূলক পরিবেশনা এবং খ্রিষ্টানরা বড়দিনের পূর্ণিমা উপলক্ষে বিভিন্ন ধরনের কৃত্যানুষ্ঠানের পাশাপাশি কৃত্যনাট্য রামুপালা : মৃত্যুঞ্জয়ী খ্রিষ্ট ইত্যাদি পরিবেশন করে থাকে।
এদেশে ঋতু ও চাঁদের প্রকৃতি নির্ভর পরিবেশনার বাইরে বিভিন্ন পারিবারিক ও সামাজিক উৎসবকেন্দ্রিক নাট্য পরিবেশনাও প্রচলন রয়েছে, যেমন- বিবাহ, মুখে ভাত, সুন্নতে খাৎনা উপলক্ষে মানিকগঞ্জ জেলায় সর্দার বাড়ি (লাঠিখেলা) : বহুরূপী পরিবেশন করে থাকে। এছাড়া, ঈদ উৎসব উপলক্ষে সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে লাঠিখেলার বিনোদনমূলক নাট্য ও সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন মেলা উপলক্ষ প্রায় সারা বছর যাত্রাপালা পরিবেশিত হয়ে থাকে।
গত প্রায় এক দশকে যাত্রাশিল্প বিভিন্ন ধরনের সংকট মোকাবিলা করে সম্প্রতি নতুন গতিপথ খুঁজে ফিরছে। যাত্রাশিল্পের নবজারগণের জন্য বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী সক্রিয় ভূমিকা রাখছে- এই লক্ষে শিল্পকলা একাডেমী যাত্রাশিল্পের সংকট নিরসনের জন্য এবং নতুন বাস্তবতায় যাত্রাশিল্পের উন্নয়নের লক্ষে একাধিক সেমিনার ও যাত্রানুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী বাংলানাট্যের অপরাপর ধারার নবজাগরণের লক্ষেও গত কয়েক বছরের শিল্পকলা একাডেমীর ভূমিকাকে প্রশংসা করতে হয়। তারা গত কয়েক বছর ধরে ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারার বিচিত্র পরিবেশনাশিল্পকে রাজধানীর নাট্যকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচার ও প্রসারের লক্ষে উৎসব ও সেমিনারের আয়োজন করে, এ বছর শিল্পকলা একাডেমীর এই ধারার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী বাংলানাট্যে বিশেষ অবদান রাখার স্বীকৃতি স্বরূপ পালাকার-গায়কদের সম্মাননা স্মারক প্রদান।
আমি একই সঙ্গে নাগরিক পরিমণ্ডলে ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারার পরিচয় করণ-উদ্যোগ ও গ্রামপর্যায়ে ঐতিহ্যবাহী নাট্যের একজন পর্যবেক্ষক। সে হিসেবে আমি গ্রামপর্যায়ে গত কয়েক বছর ধরে প্রত্যক্ষ করেছি যে- শিক্ষিত ও শহরবাসী জনতার আগ্রহ ও স্বীকৃতি দানের মাধ্যমে সত্যি সত্যি আমাদের ঐতিহ্যবাহী বাংলানাট্যে নবজাগরণের পবন বইতে শুরু করেছে।
এখন প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারাকে শিক্ষাকার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা, বিশেষত প্রাথমিক স্তর থেকে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারা
অন্তর্ভুক্ত হলে একদিকে যেমন ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারার নবজাগরণ স্থায়ীভাবে সম্ভব হবে, অন্যদিকে তেমনি এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাও পাবে স্বদেশীয় ঐতিহ্যগত প্রেরণা। আর যার ভেতর দিয়ে নতুন করে প্রতিটি নাগরিকের মনে রচিত হতে পারে দেশপ্রেম এবং দেশের জাতীয় উন্নয়ন।
সাইমন জাকারিয়া এর অন্যান্য লেখাসমূহ
Copyright © Life Bangladesh সাপলুডু মূলপাতা | মন্তব্য Contact: shapludu@gmail.com