Untitled Document
বাংলাদেশের পেশাজীবী ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা
- সাইমন জাকারিয়া


বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে কিছু নাট্যমূলক পরিবেশনা বাড়ি বাড়ি ঘুরে উঠানে বা রাস্তায় এবং বাজারপ্রাঙ্গণ, নদী বা পুকুর ঘাট, এমনকি কৃষিক্ষেত্র, খেলার মাঠ ইত্যাদি বিভিন্ন স্থানে বেশ খোলামেলাভাবে পরিবেশিত হতে দেখা যায়, এ ধরনের নাট্যমূলক শিল্পকে যাযাবরে পরিবেশনা বলা যেতে পারে, ভদ্রভাষায় ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা বললেও অতিশয়োক্তি হবে না। অবশ্য বর্তমান রচনায় এ ধরনের পরিবেশনাকে আমরা ভ্রাম্যমাণ বলেই উল্লেখ করছি। এক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনার চরিত্র বলতে বোঝানো হচ্ছে- যা ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন স্থানে পরিবেশন করা হয়। আর এ ধরনের নাট্যমূলক শিল্প পরিবেশনের জন্য কোনো স্থায়ী বা সুনির্দিষ্ট মঞ্চ কাঠামোর প্রয়োজন পড়ে না, শিল্পীরা তাদের প্রয়োজন মতো রাস্তা, রাস্তার ধার, গ্রামের বিভিন্ন বাড়ির উঠান ইত্যাদিকে পরিবেশনাস্থান হিসেবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ব্যবহার করে থাকেন।

এ পর্যায়ে গ্রামের পেশাজীবী লাঠিয়ালদের লাঠি খেলা, রাস্তার ধারের সাপ খেলা, বানর খেলা এবং জাদু খেলার কথা উল্লেখ করা যায়। পেশাগত কারণে এ এ ধরনের পরিবেশনা সম্পূর্ণরূপে অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরিচয় বহন করে। আবার একথাও ঠিক যে, অপরাপর পরিবেশনা শিল্পের চেয়ে এ প্রকরণের অন্তর্ভুক্ত শিল্পটি বিশেষভাবে ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা শিল্পের গুণাবলী ধারণ করে। একজন সাপুড়ে যখন সাপ খেলা আয়োজনের জন্য বীণ বা ডমরু বাজিয়ে ‘এই সাপের খেলা’ বলতে বলতে গ্রামের পথ দিয়ে হেঁটে যায় তখন তার পিছে পিছে গ্রামের শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে যুবক-বৃদ্ধেরাও কখনো কখনো ছুটতে থাকে, আর পেছনের এই লোক জমায়েত দেখেই সাপুড়ে সুবিধাজনক একটি স্থানে সাপ খেলা দেখান। এক স্থানের সাপ খেলা দেখানো শেষ হলে সাপুড়ে আবার নতুন আরেকটি পাড়া বা নতুন আরেকটি গ্রামে ঢুকে পড়ে আগের মতোই খেলা দেখিয়ে থাকেন। এমনই ভ্রাম্যমাণ প্রবণতা লাঠি খেলা ও জাদু খেলার রয়েছে, লাঠি খেলার আগে লাঠিয়ালরা গ্রামের পথ দিয়ে বিচিত্র শব্দে ডাক ভেঙে দর্শকদেরকে আকৃষ্ট করে কোনো একটি খোলা স্থানে জমায়েত করে তাদের খেলা দেখিয়ে থাকেন। এবারে বিস্তারিতভাবে বাংলাদেশের প্রধান কয়েকটি পেশাজীবী ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনার পরিবেশনারীতির পরিচয় উপস্থাপন করা যেতে পারে।



সাপ খেলা :
‘অ-তে অজগর। অজগর ওই আসছে তেড়ে।’ অক্ষর পরিচিতির প্রথম পাঠে এভাবেই সাপের সাথে এদেশের শিশুদের প্রথম পরিচয় ঘটে। আর বাস্তব জীবনে এ দেশের প্রায় অধিকাংশ মানুষেরই সাপের সাথে সাক্ষাৎ ঘটে সাপুড়ের ঝুড়ি হতে বের করা সাপের খেলার আসরে।
বাংলাদেশের প্রায় অধিকাংশ গ্রামেই এক সময় কোনো না কোনো ভাবে এক ঘর সাপুড়ের বসবাস থাকলেও সাপ খেলা দেখানোর প্রধান শিল্পীরা হচ্ছেন-এদেশের ক্ষুদ্র যাযাবর জাতিসত্তা বা বেদেরা। জানা যায়, বেদেদের মধ্যে সাপুড়ে, সওদাগর ও মিস্সিগান্নি বা লোকচিকিৎসক নামে তিন ধরনের পেশাজীবী রয়েছেন। যার মধ্যে প্রধানতম পেশাজীবী হচ্ছেন সাপুড়ে- যাদের কেউ কেউ শুধু সাপ ধরে সাপ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কেউ-বা আবার আকর্ষণী সাপগুলোকে বিভিন্ন কৌশলে বশ করে খেলার উপযোগী করে তোলেন। এবং সেই সাপগুলোকে ঝুড়িতে ঢুকিয়ে বাকে ঝুলিয়ে বা মাথায় করে গ্রামে গ্রামে, হাটে বাজারে ফেরি করে বেড়ান। আর সুবিধামতো স্থানে সাপ খেলার আসর জমিয়ে দেন। সেই আসরে তারা একই সঙ্গে সাপ খেলা দেখিয়ে এবং কিছু লোকচিকিৎসার গাছ-গাছড়া ও কবিরাজি ঔষধ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এ ধরনের সাপ খেলা দেখাবার জন্য সাপুড়েরা সাধারণত গ্রামের সাপ্তাহিক হাট-বাজারসহ লোকসংস্কারে বিশ্বাসী অভাবী বা নিুবিত্তের বাড়ি বা পাড়াকেই অধিক উপযোগী মনে করেন। সাপ খেলা দেখানোর জন্য সাপুড়েরা সচেতনভাবেই শিক্ষিত ও অর্থনৈতিকভাবে বিত্তবান এলাকা পরিহার করে থাকেন। আসলে, যাদের কাছে এখনও আধুনিক শিক্ষার সচেতন জ্ঞানগত পরিচয় পৌঁচ্ছে নি তারাই সাপ খেলার ভোক্ত ও দর্শক।
সাপ খেলা দেখানোর উপাদান ও উপকরণ হিসেবে সাপুড়েরা সাধারণত লাঠি, বীণ বা বাঁশি, বিভিন্ন ধরনের গাছ-গাছড়া ব্যবহার করে থাকেন। সে সকল সাপ ফণা তুলতে পারে সে সকল সাপই খেলা দেখানোর প্রধান সামগ্রী হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের গোখরা সাপই সাপুড়েদের প্রধান অবলম্বন।

সাপ খেলা দেখানোর জন্য সাপুড়েরা কোনো পাড়া বা গ্রামে ঢোকার ক্ষেত্রে বীণ বাজাতে থাকেন। আবার কখনো কখনো ‘এই সাপের খেলা। কাল নাগিনীর খেলা’ ইত্যাদি বলতে বলতে এগিয়ে যেতে থাকেন। এ সময় তাদের সে বীণের ধ্বনি ও মুখের হাক-ডাক শুনে গ্রামের শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষ সকল শ্রেণীর দর্শক হাতের ছোট-খাটো কাজ ফেলে কখনো কখনো তাদেরকে অনুসরণ করে সাপ খেলার আসরে উপস্থিত হন।

সাপ খেলার আসরে লোক জমাতের জন্য সাপুড়েরা আরো কিছুক্ষণ সময় বীণ বা ডমরু বাজাতে থাকেন। তারপর হঠাৎ এক সময় তার ঝাঁপি থেকে একটা আকর্ষণী সাপ বের করে এক হাত দিয়ে সাপটির গলার কাছে এবং অন্য হাত দিয়ে লেজের কাছে ধরে মাথার উপর তুলে ধরে বলতে থাকেন-“এই যে দেখেন সেই সাপ যেই সাপে বাসর ঘরে লখিন্দরকে কামড়ায়েছিল...এ সেই সাপ...সেদিন সে বেহুলার বাসর ঘর থেকে পালায়ে গেলেও আমার হাত থেকে সে পালাতে পারে নাই। এই দেখেন আমার ওস্তাদে এটা সুন্দর বন থেকে ধইরা এনে আমার কাছে রাইখা গেছে। আজ দেখবেন এই সাপের খেলা।” এমনই কথার মধ্যে হাতের সে সাপকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলেন-‘এই যা খেলে দেখা তোর নাচের খেলা।’ এবং হাতের পাঁচ আঙুল ফাঁকা করে মাটিতে জোরে জোরে আঘাত করেন, সে আঘাতের শব্দ কম্পনে ও সংকেতে আগে থেকে ট্রেনিং প্রাপ্ত সাপটি ফণা তুলে সাপুড়ের মুখোমুখো দাঁড়িয়ে যায়। আর সাথে সাথে সাপুড়ে এবার গান শুরু করেন-‘ও বিধির কি হইলো রে/তোমার আছে শতেক ভাই/আমার মায়ের কেউ নাইরে/আমার মাকে মা বলিবে কে/বেহুলা গা তোলো গা তোলোরে॥’ এই গানের মধ্যে সাপুড়ের এক সহযোগী খঞ্জনিতে তাল সঙ্গত করতে থাকেন। আর সাপুড়ে তার গানের ভেতর সাপের ফণার সামনে হাতের বিভিন্ন ভঙ্গি করে সাপের ফণাটিকে দাঁড় করিয়ে রাখেন।
সাপ খেলা দেখানোর সময় সাপুড়ের হাতের ও শরীরের বিভিন্ন ভঙ্গি করার দুটি লক্ষ থাকে- এক) সাপকে নিয়ন্ত্রণ করা, দুই) দর্শককে আকৃষ্ট করে আসরে দাঁড় করিয়ে রাখা। সাপুড়েরা সাপ খেলা দেখানোর বিভিন্ন দেহ-ভঙ্গির মধ্যে হস্ত মুষ্ঠির মুদ্রা, দুই হাতের আঙুলের বিচিত্র ব্যবহার, দুই হাঁটুতে কাঁপন তুলে সাপকে দাঁড় করিয়ে রাখার কৌশল এবং সাপের ছোবল হতে রক্ষার জন্য হাতের কনুকে ব্যবহার করে থাকেন। উল্লেখ্য, সাপ খেলা দেখানোর সময় অধিকাংশ সাপুড়ে হাতের কনুইয়ে এক ধরনের লাল রঙের গামছা বেঁধে রাখেন। যা খেলা দেখানোর সময় রাগী সাপদের রাগ নাশের ছোবল দানের সময় তারা অনেক সময় ইচ্ছে করেই সাপের সামনে এগিয়ে দেন।

সাপ খেলার আসরের দ্বিতীয় পর্যায়ে থাকে সাপুড়েদের গাছ-গাছড়া ও কবিরাজি ঔষধ বিক্রির পর্ব। এক্ষেত্রে সাধারণ খেটে খাওয়া লোকবিশ্বাসী মানুষের সারল্যের সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের গাল-গল্প তৈরি করে দর্শককে মোহিত করে সাধারণত গাছড়া জাতীয় বস্তুই বেশি বিক্রি করে থাকেন। আসলে, সাপ-সংশ্লিষ্ট লোকবিশ্বাসকে আশ্রয় করেই সাপুড়েরা তাদের কর্ম সম্পাদন করেন। সাপুড়েরা তাদের গাছড়া বিক্রির জন্য সাধারণ মানুষের নৈমিত্তিক জীবনের নিখুঁত বর্ণনা করে লোকমানুষের ভেতর তাদের সঙ্গে পথ্যের গুরুত্ব তুলে ধরেন, যেমন-সাপ খেলার আসরের মাঝখানে সাপুড়েরা প্রায়ই বলে থাকেন-‘সাপ খুবই রাগী প্রাণী। তাকে কেউ আঘাত করলে সে কখনোই ক্ষমা করে না, যে দিনই হোক সে তার প্রতিশোধ নেই। এই তো আপনি ভাবছেন, আপনি তো কোনোদিন সাপকে আঘাত করেননি। কিন্তু না আপনি আঘাত করেছেন। আপনি জানেন না। আপনি সে দিন নিজের অজান্তে ঝাঁপ গোসল করছিলেন, আপনার গোসলের জল সাপের গায়ে গিয়ে পড়েছে আপনি জানেন না, আপনি পথ দিয়ে হাঁটছিলেন ওই পথের পাশে একটা সাপ তার খাবার সংগ্রহ করতে যাচ্ছিল আপনার পায়ের শব্দ সাপটির খাবার মুখ থেকে ফসকে গেছে আপনি জানেন না, শুধু তাই না সেদিন বাঁশ ঝাঁড়ে বাঁশ কাটতে গিয়ে আপনি সাপের আস্তানা ভেঙে দিয়েছেন, আপনি জানেন না। কিন্তু ওই সাপ আপনাকে চিনে রেখেছে। সে আপনাকে অনুসরণ করছে, আপনি জানেন না। যে কোনো সময় সে আপনাকে কামড়ে দেবে। এর থেকে রক্ষার উপায় এই যে আমার হাতে। এই গাছটা যদি আপনি তাবিজ করে আপনার সঙ্গে রাখেন ওই সাপ কোনোদিন আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।’ এ ধরনের কথার মোহে পড়ে গ্রামের সাধারণ মানুষ সাপুড়ের হাত থেকে গাছড়া ও তাবিজ-কবজ কিনে নেয়। সবশেষে তৃতীয় পর্বে আরেকবার গান বাদ্যের সঙ্গে আরো কিছুক্ষণ সাপ খেলা দেখিয়ে একটি আসর শেষ করা হয়। এরপর সাপুড়ে তার সাপের ঝাঁপি নিয়ে আরেকটি আসরের জন্য অন্য কোনো হাটে বা অন্য কোনো গ্রামে ও পাড়ার দিকে এগিয়ে যান। আর এভাবেই সাপ খেলার ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা চলতে থাকে।

সাম্প্রতিককালে কিছু কিছু সাপুড়ে তাঁদের সাপ খেলাতে নতুনত্ব আনতে সাপের সাথে সাপের চিরশত্র“ ‘বেজি’ নামের এক প্রকারের বনজ প্রাণী বহন করে থাকেন। গ্রামাঞ্চলে সাপ ও বেজির দ্বন্দ্ব নিয়ে অনেক লোক-কথা ও গল্প প্রচলিত রয়েছে। সাপুড়েরা লোক সমাজে প্রচলিত সেই গল্পের সূত্র ধরে সাপ খেলার এক পর্যায়ে সাপ ও বেজি’র চিরন্তন দ্বন্দ্ব দেখিয়ে থাকেন। তবে, দর্শকবেষ্টিত আসরে সাপ ও বেজির খেলা দেখাতে গিয়ে কোনোভাবেই যেন কোনো প্রাণীর কোনো ক্ষতি না হয় সে বিষয়টি সাপুড়েরা মাথায় রাখেন। এবং এই বোধ থেকে সচেতনা অবলম্বন করে সাপুড়েরা সাধারণত তাঁদের কাঠের বক্সের সঙ্গে বেজির গলায় রশি বা দড়ি বেঁধে রাখেন- যেন সে কখনো অধিক উত্তেজিত হয়ে সাপের উপর সশরীরে আক্রমণ করে সাপকে ক্ষতি না করতে পারে এবং সাপও যেন বেজির উপর ঝাপিয়ে পড়ে বেজিকে কোনো ক্ষতি না করতে পারে সেই জন্য খেলা দেখানো সাপুড়ে তার সাপকে কৌশলে হাতে ধরে নিয়ন্ত্রণে রাখেন।

এক সময় সারা বাংলাদেশে সাপ খেলার প্রচলন থাকলেও সাম্প্রতিককালে এই খেলার প্রচলন অনেকটাই কমে গেছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, মানুষ এখন শিক্ষিত, যন্ত্র নির্ভর, আধুনিক ও বাজার অর্থনীতির আকর্ষণে লোকবিশ্বাসের ঐতিহ্য অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছেন, আর সেই সূত্রে ঐতিহ্যবাহী সাপ খেলার প্রতি একদিকে সাধারণ মানুষের আগ্রহ কমে এসেছে, অন্যদিকে সাপুড়ে পেশাজীবীরা তাদের ঐতিহ্যগত পেশা ত্যাগ করে নতুন পেশার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে উঠেছেন। তবুও ঢাকার সাভারের বংশি নদী, মুন্সীগঞ্জের ধলেশ্বরী এবং লৌহজং-এর পদ্মার পাড় এলাকায় এখনও অনেক সাপুড়ে পেশাজীবীর অস্তিত্ব রয়েছে।
নগর সভ্যতায় সাপ খেলা তেমনভাবে দেখা না গেলেও সাপ প্রদর্শনের মাধ্যমে এক ধরনের নতুন পেশার উপক্রম দেখা যাচ্ছে গত কয়েক দশক ধরে। যেমন-রাজধানী ঢাকাসহ সাভার, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহী, বরিশাল শহরের বুকে অনেক বেদেনীকে সাপ নিয়ে দোকানে দোকানে ঘুরে অর্থ তুলতে দেখা যায়।

বানর খেলা :
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বানর ও হনুমান হচ্ছে দেব-প্রাণী বা দেব-পশু। ত্রেতাযুগের অবতার প্রভু রামচন্দ্রের সঙ্গী বানরকে অতীতকাল থেকে গ্রামের মানুষ ভক্তি করে আসছে। বানরকে দুধ-কলা দেওয়ার চল বহু প্রাচীনকালের গ্রামীণ চল। এখনও অনেকে বানরকে সঙ্গে নিয়ে চলতে পছন্দ করে। অনেকে আবার পেশাগতভাবে গ্রামে ও শহরের বিভিন্ন স্থানে বানর নাচিয়ে ফেরে। সাধারণত গ্রামের বিভিন্ন পাড়াতে বানর নাচানো হলেও শহরের রাস্তায় বা আবাসিক এলাকায় বানর নাচানো হয়ে থাকে। এই বানর নাচানো মানুষগুলোকে বলা হয়ে থাকে যাযাবর। তারা বানরের নাচ দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে মুগ্ধ করে তার বিনিময়ে কিছু অর্থ উপার্জন করে থাকেন।

বাংলাদেশের শহর ও গ্রাম দু’টি ক্ষেত্রে মাঝে মাঝেই বানর খেলা দেখা যায়। বাংলাদেশের বেদে বা যাযাবরসহ নিুবর্গের সাধারণ মানুষের মধ্যেও কেউ কেউ পেশাগতভাবে বানর পোষেন। তারা মাঝে মাঝে চাল বা অর্থ সংগ্রহের জন্য গ্রামে গঞ্জে, শহর-বাজারে বানর খেলা করায়ে থাকেন। বানর খেলার সময়ে ক্ষেত্র বিশেষে বানর খেলোয়াড়গণ বানরকে চমৎকার ব্লাউজ ও ঘাগরা পরিয়ে সাজিয়ে নিয়ে এই বানর খেলায়ে থাকেন। এক্ষেত্রে তারা বানরের গলায় চকচকে হার, কানে দুল, কপালে টিকলি, পায়ে তোড়া পরিয়ে থাকেন। কখনো কখনো বানরের হাতে দিয়ে রাখেন একটি রুমাল বিশেষ, যা তাকে ‘বউ’ সাজবার সময় দরকার হয়। বানর খেলানোর জন্য বানরওয়ালা নিজের হাতে রাখেন ‘ডুগডুগি’। সাধারণত পাড়ার কোনো জনবহুল স্থানে বানরকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে তিনি প্রথমে এই ‘ডুগডুগি’ বা ছোটো ‘ঢুলি’ বাজিয়ে মুখে বিশেষ ধরনের কিছু কথা বলে লোক জামানোর চেষ্টা করেন। ঐতিহ্যগতভাবেই বানর খেলা দেখার প্রতি বাংলাদেশের মানুষের আগ্রহ রয়েছে বলে বানর নাচিয়ের ডুগডুগির বাজনা শুনে অধিকাংশ সময় পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে বয়স্ক লোকেরাও ছুটে আসে। তারা এসে বানর ও বানরওয়ালাকে ঘিরে বৃত্তাকারে দাঁড়াতে থাকেন। ভিড় জমে উঠলে। বানরওয়ালা লাঠি উচিয়ে গান ধরেন
কি কি গহনা লিবি সুন্দরী, মনের কথা বল।
হার লিবি, টিকলি লিবি, লিবি পায়ে মল॥
এই গানের সঙ্গে বানর তার ইচ্ছে মতো নাচতে থাকে। এক সময় বানরওয়ালা তার নাচ থামিয়ে দর্শকদেরকে দেখিয়ে বলেন, নে নে বাবু-ভাইদের কাছে চেয়ে নে।
উপস্থিত দর্শকগণ তখন নানান ধরনের কথা এবং অঙ্গভঙ্গি করে বানর ও বানরওয়ালাকে ভড়কে দিতে চান। কিন্তু বানর সব কিছুকে উপেক্ষা করে উপস্থিত দর্শকদের দিকে হাত পাততে থাকে।

বানর নাচিয়ে তখন কিছু কৌশলী কথাবার্তা বলে দর্শকদের কাছ থেকে কিছু সম্মানী নিয়ে পরের পর্বে বানর খেলায় মেতে ওঠেন। এক্ষেত্রে বানরটি তার সরদার বা ওস্তাদের কথা ও নির্দেশমতো বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি, লাফ-ঝাপ ও অভিনয় করে। যেমন-বানরওয়ালা তার হাতের লাঠি উঁচু করে নির্দেশ করেন-এই রে এবার পাহাড় ডিঙা তো দেখি।
সঙ্গে সঙ্গে বানর লাফ দিয়ে লাঠির উপর দিয়ে পার হয়ে যায়। এইভাবে বানরটি একে একে সাগর ডাঙায়, প্রণাম করে, বউ সাজে, আধুনিক বউ-এর রঙ্গরস দেখায়, শাশুড়ির প্রতি অত্যাচার দেখায়, স্বামীর সঙ্গে সোহাগ দেখায়, স্বামীর সঙ্গে রাগ করে বাপের বাড়ি চলে যায়, গিয়ে অন্যের কাছে একটু লজ্জায় পড়ে। এসব দেখতে দেখতে দর্শকরা কৌতুকে মজে যায়। জীবনরসের গানগুলি হাতের লাঠি মাটিতে ঠুকে ঠুকে যখন গাইয়ে গেয়ে থাকে, তখন বানরের অঙ্গভঙ্গি দেখলে মানুষ আর না হেসে পারেন না। বানর নাচের অনেক গান আছে। যেমনবউদি-দেওরের গানে-‘আল ধানের মাড় রাঁধেছি কানা শাগের বেসাতি।/সাঁজের বেলা দেওর শালা লুচকাঁই খায় বেসতি॥’ ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনও কম-বেশি বানর নাচ ও বানর খেলার প্রচলন রয়েছে।

জাদু খেলা :
জাদু খেলা সম্পূর্ণরূপে একটি ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনা। গ্রামের বিভিন্ন আনন্দ অনুষ্ঠানে ও হাটে-বাজারে জীবিকা উপর্জনের উপায় হিসেবে এক শ্রেণীর লোক নিয়মিতভাবে জাদু প্রদর্শন করে থাকেন। গ্রামের জনসাধারণের কাছে এই জাদু খেলা বিভিন্ন নামে পরিচিত। কেউ বলেন ‘ম্যাজিক খেলা’, আবার কেউ বলেন ‘রঙবাজি’, ‘ভেল্কিবাজি’, ‘হাত সাফাই’ প্রভৃতি।
এদেশে জাদু খেলার প্রাচীনত্ব সম্পর্কে তেমন কোনো প্রামাণ্য দলিল না পাওয়া গেলেও বাংলা ভাষায় জাদুকরের কিছু প্রতিশব্দ বহু আগেই থেকেই প্রচলিত রয়েছে। জাদুকরকে বাংলা ভাষায় সাধারণত শিল্পকারী, ভেল্কিবাজ, যাদুপ্রদর্শনকারী বলা হয়ে থাকে। আলাউলের ‘পদ্মাবতী’তে শিল্পকারীর প্রসঙ্গ আছে-“পিছল সৌরভ পঙ্ক হৈল হাটে বাট।/যথাতথা রঙ্গরস দেখি গীতনাট॥/ইন্দ্রজালে শিল্পকারী দর্শাথ কুহক।/মধ্যে মধ্যে নানা ঢঙ্গ করে বিদূষক॥” এখানে ‘ঢঙ্গ’ হলো সঙের অভিনয়। ‘চৈতন্যভাগবতে’ ‘ঢঙ বিপ্রে’র উল্লেখ দেখা যায়। অবশ্য ‘ঢঙ’ সেখানে কৃত্রিম স্বানুভব প্রদর্শন অর্থে প্রযুক্ত। অন্যদিকে জাদুখেলাকে বাংলা ভাষায় ভেল্কিবাজী বা ইন্দ্রজাল বলা হয়ে থাকে। কেউ কেউ একে মায়াজাল, মোহিনী বিদ্যা বলে থাকেন। সে যাই হোক, জাদুখেলা মূলত হাত সাফাইয়ের খেলা। কারণ, শুধু হাতের কৌশলী ক্রিয়াকর্মে দর্শকদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে একজন জাদুকর তার ধীশক্তি বলে অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত দর্শককেও তাক লাগিয়ে দিতে পারেন। শাহমনি জাদু একাডেমীর মহাসচিব ও প্রখ্যাত জাদুশিল্পী কাজী আনিস লোবান বলেন-‘অনেকের ধারণা জাদুর সাথে মন্ত্রের যোগ রয়েছে। কিন্তু জাদুর সঙ্গে মন্ত্রের কোনো যোগ নেই। সম্পূর্ণ বিজ্ঞানকে আশ্রয় করে কৌশলগতভাবে কোনো বিশ্বাস্য ব্যাপারকে অবিশ্বাস্যভাবে উপস্থাপনাই হচ্ছে জাদু।’ জাদুখেলাতে যা কিছুকে জাদু আকারে উপস্থাপন করা হয় তার সকল কিছুরই বাস্তব ভিত্তি জাদুকরের আয়ত্তের মধ্যে থাকে। এক্ষেত্রে বাস্তব বিষয়কে অবাস্তবভাবে উপস্থাপনার ক্ষেত্রে জাদুশিল্পীগণ কিছু প্রপস্কে হাতের ‘মুঠি’ হিসেবে ব্যবহার করেন। মানিকগঞ্জ অঞ্চলের বিভিন্ন ধরনের আনন্দ অনুষ্ঠানে এক ধরনের জাদু খেলার প্রচলন রয়েছে। এ প্রকারের জাদু খেলার সূচনায় প্রথমে একজন ছুকর এসে বন্দনা গীত পরিবেশন করেন। তার সে বন্দনার মধ্যে জাদুকরের সহযোগীরা জাদু খেলার উপকরণ সমেত দু’তিনটি টিনের বাক্স এনে জাদু প্রদর্শনীর উঠানে রেখে সাদা রঙের কাপড় দিয়ে ঢেকে দেন। এরপর জাদু শিল্পী এসে দর্শকদেরকে জিজ্ঞেস করেন, দর্শকগণ নতুন কোনো জাদু দেখবে না-কি পুরানো জাদু দেখবেন। এটা জাদুকরের নিত্য নতুন খেলা তৈরি সৃজনশীলতার প্রচার মাত্র। এই কথা দিয়ে প্রথমেই জাদুকর তার প্রতি দর্শকদের মাঝে একটি ভালো ধারণার জন্ম দেন। তারপর একে একে বিভিন্ন কথা ও হাতের কৌশলে ফুল, তাস, টাকা, লেখা ও ছবির দেখান। জাদু খেলার গ্রামীন আসরে সবশেষে যে জাদুটি প্রদর্শন করা হয় তা হচ্ছে চাল থেকে আঙুন ছাড়াই দর্শকদের সামনে জাদুর সাহায্যে মুড়ি ভাজা। মুড়ি ভাড়ার এই জাদু প্রদর্শনের মধ্যে বিচিত্র ধরনের নাট্যমূলক কথা ও অভিনয় উপস্থাপন করা হয়, সবশেষে জাদুকর তার চারজন সহযোগীর সহায়তায় দুইটি কাপড়ের উপর চাল ও বালি নিয়ে মুড়ি ভেজে তা একটি কুলার উপর তুলে নিয়ে দর্শকদের হাতে হাতে সে মুড়ি তুলে দেন। দর্শকগণ বিস্মিত হয়ে সে মুড়ি খেতে থাকেন। আর এভাবেই শেষ হয় গ্রামীণ আসরে জাদু খেলার আয়োজন।
এদেশের গ্রামীণ হাটে-বাজারে ঐতিহ্যগতভাবে এখনও কিছু পেশাজীবী জাদুকর বা ম্যাজিশিয়ানকে জাদু প্রদর্শন করতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে কিছু কিছু জাদুকর শুধু জাদু প্রদর্শনের ভিত্তিতে জীবিকা নির্বাহ করেন, অন্যদিকে কিছু জাদুকর জাদু প্রদর্শনের পাশাপাশি কবিরাজি ঔষধ বিক্রয়ের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে জাদু ঔষধের ক্রেতা জমানোর কৌশল হিসেবে পরিবেশিত হয়ে থাকে।

গ্রামের হাট-বাজারে জাদুকরগণ সাধারণত যে সকল জাদু প্রদর্শন করে থাকেন, তা হচ্ছেফু দিয়ে রুমাল পুড়িয়ে দেওয়া, জিহ্বা কেটে হাতে তুলে দেওয়া, মাটি দিয়ে মিষ্টি বানিয়ে দেওয়া, কাগজ দিয়ে কবুতর তৈরি, পেটের ভেতর তরবারি ঢুকিয়ে দেওয়া ইত্যাদি। এই সকল জাদু প্রদর্শনের ক্ষেত্রে জাদুকরগণ তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে, হাতে, মুখে, পোশাকের পকেটে বিভিন্ন ধরনের প্রপস্ আগে থেকেই বহন করে থাকেন। জাদু প্রদর্শনের সময়ে দর্শক সারির মধ্যে নিজস্ব কিছু অভিনেতাকে দর্শক হিসেবে দাঁড় করিয়ে রাখেন, যারা জাদু প্রদর্শনের সময় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জাদুকরের সঙ্গে তর্ক-বির্তক করেন এবং সবশেষে জাদুকরের ডাকে দর্শকদের সামনে জাদু প্রদর্শনে জাদুকরকে বিশ্বস্ততার সঙ্গে সহযোগিতা করেন। উপস্থিত দর্শকদের রুচি ও চাহিদা অনুযায়ী জাদুকর তার ব্যক্তিত্ব, ভাষাভঙ্গি, অঙ্গভঙ্গি এবং উপস্থাপন কৌশল প্রয়োগ করেন। আর দর্শকগণ তার কথা এবং আঙ্গিক অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে স্থির দাঁড়িয়ে থেকে জাদু দেখতে থাকেন।
সাইমন জাকারিয়া এর অন্যান্য লেখাসমূহ
Copyright © Life Bangladesh সাপলুডু মূলপাতা | মন্তব্য Contact: shapludu@gmail.com