Untitled Document
বরেন্দ্র অঞ্চলের মৃৎশিল্প
- অনুপম হীরা মণ্ডল

উত্তরবঙ্গের প্রাচীন জনপদ হলো বরেন্দ্র। বর্তমানে রাজশাহী অঞ্চলের ১৬ টি জেলাকে বরেন্দ্র অঞ্চল হিসেবে গণ্য করা হয়। যদিও রংপুর অঞ্চল রাজশাহী অঞল থেকে স্বতন্ত্র প্রশাসনিক অঞ্চল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে কিন্তু নবগঠিত রংপুর বিভাগের অধিকাংশ জেলাই প্রাচীন বরেন্দ্র অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রাচীনকাল হতে এই অঞ্চলে বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের বসতি গড়ে উঠেছে। এই অঞ্চলের পেশাজীবী হিসেবে মৃৎশিল্পীরা অন্যতম। প্রাচীনকাল হতে এরা বিভিন্ন শিল্প দ্রব্য উৎপাদন করে আসছে। এ সব দ্রব্য এই অঞ্চলের মানুষের সাংসারিক ও নান্দনিক উপযোগ মিটিয়ে এসেছে। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে এই অঞ্চলের মৃৎশিল্প একটি সমৃদ্ধশালী ধারার উত্তরাধিকার বহন করে। মৃৎ অর্থ মাটি। আর মৃৎশিল্প বলতে মাটির তৈরী শিল্পকে বুঝায়। এই সকল শিল্পের মধ্যে রয়েছে হাঁড়ি, কলস, সরা, সানকি, বাসন, ফুলদানী, কলমদানী, ঘট, মালসা ইত্যাদি। এগুলো যেমন, মানুষের প্রাত্যহিক প্রয়োজন মেটায় তেমনি নান্দনিক উৎকর্ষতাও রক্ষা করে। বর্তমান গবেষণায় রাজশাহী জেলায় যে সকল মৃৎশিল্প তৈরী হয় সেগুলোকে নির্দেশ করা হবে।


পণ্ডিতেরা ধারণা করেন রাজশাহীর মৃৎশিল্প পাহাড়পুরের ঐতিহ্য থেকে এসেছে। সেই হিসেবে এখানকার মৃৎশিল্প বাংলাদেশের শৈল্পিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে। এই শিল্পের নির্মাণ কৌশল অভিনব। এর নান্দনিকতা বীক্ষণে চিরায়ত শৈলির সঙ্গে পরিচয় ঘটে। শিল্প হিসেবে রাজশাহীর মৃৎশিল্পের টাইপ এবং মোটিফও অনন্য। এই অঞ্চলের মৃৎশিল্পের পরিচিতি, নির্মাণ কৌশল, শৈলি এবং শিল্পীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিষয়ে একটি স্বতন্ত্র গবেষণা পরিচালিত হতে পারে।


রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা, বগুড়া ইত্যাদি জেলার অনেক প্রাচীন স্থাপত্য শিল্প এই অঞ্চলের প্রাচীন মৃৎশিল্পের স্বাক্ষর বহন করে। এর মধ্যে রাজশাহীর পুঠিয়ার রাজবাড়ি মন্দির, বাঘা মসজিদ, নাটোরের রাজবাড়ির মন্দির, কুসুম্বা মসজিদ, সোনামসজিদ, রাজাশাহী উপশহর, মঠবাড়ি, নারকেলবাড়িয়া ইত্যাদি স্থানের প্রাচীন মন্দিরের স্থাপত্য শিল্প প্রাচীন সেই ঐতিহ্যকে বহন করে চলেছে।
এই অঞ্চলের মৃৎশিল্পীদের ‘কুমার’ নামে অভিহিত করা হয়। এরা স্বতন্ত্র একটি পেশাজীবী শ্রেণি। এদের যাপিত জীবনে বৈচিত্র্যে রয়েছে। একটি নিজস্ব সংস্কৃতির ধারক এই সম্প্রদায় বৃহত্তর বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর অংশ। এদেরকে স্থানীয় ভাষায় ‘পাল’ বলা হয়। উত্তরাধিকার সূত্রে এঁরা মাটির জিনিসপত্র তৈরীর সঙ্গে যুক্ত। এই শিল্প তৈরীতে তাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান নেই। পারিবারিক প্রতিষ্ঠান থেকেই তারা বংশ পরম্পরায় এই বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে ওঠে। বংশক্রমিকভাবে একটি নির্দিষ্ট পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকার ফলে এদের একটি স্বতন্ত্র সমাজাজিক পরিমণ্ডল গড়ে ওঠে।


বরেন্দ্র অঞ্চলের মৃৎশিল্পের মধ্যে হাঁড়ি, কলসি, সরা, পিঠার ছাঁচ, রসের ভাড়, দইয়ের হাঁড়ি, ফুলের টব, ফুলদানী, পূজার প্রদীপ, পূজার ঘট, ধূপদানী, বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তি, মুড়ি ভাজার ভাজরী, মাটির জালা, মাটির চাড়ি ইত্যাদি। ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের একটি হলো সখের হাড়ি। এক সময় আত্মীয় স্বজন বাড়িতে মুড়ি-মুড়কি-মিষ্টি নেওয়া জন্য সখের হাড়ি ব্যবহৃত হতো। এখন এই হাঁড়ি আত্মীয় বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার প্রচলন না থাকলেও সৌখিন বিষয় হিসেবে সখের হাড়ির কদর কমেনি। যদি সথের হাঁড়ি তৈরির কারিগর অনেক কমে গেছে। এখন কেবল সুশান্ত পাল নামক একজন শিল্পী সখের হাঁড়িকে টিকিয়ে রেখেছেন। বর্তমানে তাঁর ছেলেও এই শিল্পের দক্ষ করিগর হয়ে উঠেছে।


রাজশাহীর মৃৎশিল্পের শিল্পীরা তাদের উৎপাদিত দ্রব্যের ডিজাইনগুলো নিজেরাই তৈরি করেন। ডিজাইনগুলো অনেক ক্ষেত্রে তাদের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ—। বর্তমানে কিছু কিছু সৌখিন জিনিসের ডিজাইন আবার বিভিন্ন বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের আরোপিত হয়ে থাকে। এই সব প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের চাহিদা অনুযায়ী ডিজাইন তৈরি করে দেন। সে মতো শিল্পীরা অনেক শিল্পকর্ম তৈরি করে দেন। এই সব ফরমায়েশী দ্রব্যগুলো সেই সব প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রয় করে নেয়। এগুলোর বাজারজাত করার দায়িত্বও তারা নেয়। এছাড়া যে সব দ্রব্যগুলো শিল্পীদের নিজস্ব উদ্ভাবন তার টাইপ ও মোটিফগুলো তাদের নিজেদের সৃষ্টি। কিছুটা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত কিছুটাতে আবার নিজেদের সৃজনশীলতার ছাপ আছে। ঐতিহ্যগত মোটিফের মধ্যে বৃক্ষ, শঙ্খলতা, স্বর্ণলতা, কল্কা, পাখি, ধানের ছড়া, পদ্ম ফুল, বেল পাতা ইত্যাদি।


বর্তমানে রাজশাহী অঞ্চলের জেলা এবং থানা শহরে বেশ কিছু মৃৎশিল্পের বিক্রয়কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এগুলোতে যেমন দৈনন্দিন ব্যবহার্য দ্রব্যাদি পাওয়া যায় তেমনি অনেক সৌখিন দ্রব্যেরও পসরা দেখা যায়। কিছু কিছু জিনিস শিল্পীদের থেকে ক্রয় করে ফড়িয়ারা ঢাকার ব্যবসায়ীদেরকে যোগান দেয়। এছাড়া এই অঞ্চলের মৃৎশিল্পীদের একটি সমৃদ্ধশালী ধারা হলো মূর্তি তৈরিরর কারিগর। এদেরকে ভাষ্কর অভিধায় অভিহিত করা হয়। এই ভাস্কররা যেমন বিভিন্ন পূজার সময় মূর্তি তৈরি করে তেমনি সারা বছর বাড়িতে বসে তারা মূর্তি তৈরির কাজ করে। যখন পূজা আসে তখন সেগুলোতে রঙ লাগিয়ে স্থায়ীয় হাটে বাজারে নিয়ে বিক্রয় করে। পূজা ছাড়াও এরা দেশের গুণি ব্যক্তিদের মূর্তি তৈরি করে । এই কাজগুলো তারা যেমন নিজেরা বিক্রয় করে তেমনি স্থানীয় ফড়িয়ারাও ক্রয় করে দূরের ব্যবসায়ীদের নিকট বিক্রয় করে।


বর্তমানে মৃৎশিল্পের অনেক ঐতিহ্যবাহী ধারা যেমন লুপ্ত হতে চলেছে তেমনি আবার অনেক নতুন নতুন ধারাও সৃষ্টি হচ্ছে। এই শিল্পের দেশে যেমন চাহিদা আছে তেমনি বিদেশেও এর চাহিদা রয়েছে। তাই সরকারী, বে-সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে এই শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখা জরুরী। দেশের মানুষকে ধাতব দ্রব্যের পাশা-পাশি মৃৎশিল্পের দ্রব্য ব্যবহার করার জন্য উদ্ভূদ্ধ করা যেতে পারে। কারণ এগুলো স্বস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়। আবার বিত্তশালীদের সৌখিন দ্রব্যের পাশে মৃৎশিল্পের প্রতি আগ্রহী করানো যেতে পারে। এ কাজটি বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমের দ্বারা সরকারী, বে-সরকারী প্রচার কর্মীদেরকে আগ্রহসহকারে করতে হবে। এ ছাড়া দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি দেশের মানুষের মমত্ববোধ বাড়িয়ে তুলতে পারলে তার মধ্য দিয়েও মৃৎশিল্পের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়বে। অন্যথায় এই শিল্পটি দিন দিন হারিয় যাবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।
অনুপম হীরা মণ্ডল এর অন্যান্য লেখাসমূহ
Copyright © Life Bangladesh সাপলুডু মূলপাতা | মন্তব্য Contact: shapludu@gmail.com