Untitled Document
বউছি খেলা
- অনুপম হীরা মণ্ডল
বউছি বাংলাদেশের একটি লোকক্রীড়া। বাংলাদেশের গ্রামীণ গার্হস্থ্য পরিবেশ থেকে যে খেলাগুলোর উৎপত্তি ঘটেছে বউছি তার একটি। অঞ্চল বিশেষে এর কিছু ভিন্ন নামও পাওয়া যায়। যেমন, বুড়িছি, বউচোর, বুড়িছু, বউছু ইত্যাদি। এর কিছু আঞ্চলিক নাম পাওয়া যায়। যেমন, ময়মনসিংহে ‘ছিধরা’, ঢাকায় ‘ছিরানী’ ও ‘বুড়িছুট’, নোয়াখালিতে ‘থুম’, বরিশালে ‘বউগোলা’, যশোরে ‘বুড়িয়ার চু’, ও ‘লাগোদাড়া’, নরািসংদী অঞ্চলে ‘ছি-বুড়ি’, ‘বউছি’, ‘বউয়াছি’ ইত্যাদি নাম আছে। যশোর-খুলনা অঞ্চলে একে আবার ‘বুড়িচ্চি’ খেলাও বলে। বর্তমানে পরিশীলিত খেলা বা আধুনিক খেলার প্রচলনে গ্রামীণ কি নাগরিক সব শিশু-কিশোরদের মধ্যে বউছি খেলার চল কমছে। এমনকি গ্রামের শিশুরাও এখন বউছি খেলা তেমন একটা খেলে না বললেই চলে। সে হিসেবে একে লুপ্ত প্রায় লোকক্রীড়া বলা যেতে পারে। তার পরও এখনো বাংলাদেশের কোথাও কোথাও খেলাটি টিকে আছে। শিশু-কিশোর-কিশোরী তাদের আনন্দ বিনোদনের জন্য বউছি খেলায় অংশ গ্রহণ করে।
বউছি খেলাও প্রতিযোগিতা মূলক খেলা। দুইটি দলের মধ্যে এই খেলা অনুষ্ঠিত হয়। তবে উভয় দলের আচরণ এক নয়। দুইটি দলে সমান সংখ্যক খেলোয়াড় থাকে। প্রতিটি দলে ১০/১২ জন বা তার বেশি খেলোয়াড় থাকতে পারে। এটি বালক-বালিকা, কিশোর-কিশোরীদের খেলা। মুহাম্মদ হাবিবুল¬া পাঠান এটি মেয়েদের খেলা হিসেবে অভিহিত করেন। সাধারণত খোলামাঠ, গাঁয়ের মাটির রাস্তা ইত্যাদি স্থানে এই খেলা অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায়।
দুইটি দলের মধ্যে একটি ঘরের দল এবং একটি বাইরের দল থাকে। খেলোয়াড়রাই তাদের বিচার পদ্ধতিতে দল নির্বাচন করে। ২০/২৫ হাত দূরত্ব রেখে দুইটি ঘর তৈরী করা হয়। একটি বর্গাকার এবং একটি বৃত্তাকার। বর্গক্ষেত্রটি আনুমাপিক ৭/৮ বর্গফুট হয়। আর বৃত্তাকার ঘরটির ব্যাসার্ধ ১/২ ফুট হয়। কখনো কখনো বৃত্তাকার ঘরটি না করে সেখানে একটি ইট বা পাথরও রাখতে দেখা যায়।
বর্গাকার ঘরটিতে থাকে ঘরের দলের খেলোয়াড়। ঘরের দলের খেলোয়াড় থেকে একজন বুড়ি বা বউ নির্বাচিত হয়। সে মুখে ‘বুড়িছি’ বা ‘বুড়িচু’ বলে দম ধরে বৃত্তাকার ঘরে বা যেখানে ইট বা পাথর রাখা থাকে সেখানে গিয়ে বসে। আর বাইরের খেলোয়াড়রা বুড়িকে ঘিরে ধরে। ঘর হতে একজন খেলোয়াড় বুড়িছি বলে দমধরে অন্যদের তাড়িয়ে নিয়ে যায়। অন্যরা তার ছোঁয়া বাঁচাতে দূরে দৌড়ে চলে যায়। এই অবসরে যদি বুড়ি বা বউ বাইরের খেলোয়াড়দের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিজের ঘরে চলে আসতে পারে তবে এক পয়েন্ট বা পা’ড় হয়।
বুড়ির পক্ষের দল ছি ধরে বাইরের খেলোয়াড়দের ছুঁয়ে দিতে হয়। যদি একে একে প্রতিপক্ষের সকলকে ছুঁয়ে দেয় তবে তারা মারা পড়ে। এভাবে সবাই মারা পড়লে বুড়ির ঘরে আসা সহজ হয়। প্রতিপক্ষের কোনো খেলোয়াড় যদি বেচে না থাকে তাহলে বুড়ি নির্বিগ্নে ঘরে আসতে পারে। বুড়ি ঘরে এলে বুড়ির দল পয়েন্ট পায়।
বুড়ি ঘরে আসার সময় যদি বুড়ির বিপক্ষের খেলোয়াড়রা তাকে ছুঁয়ে দেয় তবে বুড়ি মারা পড়ে। বুড়ি মারা পড়লে বাইরের খেলোয়াড়রা ঘর পায়। তখন তারা আবার তাদের দলের খেলোয়াড়দের একজনকে বুড়ি তৈরী করে বুড়ির ঘরে পাঠায়। এভাবে পর্যায়ক্রমে খেলা চলতে থাকে।
বউছি বা বউছি খেলাটি রাজশাহী জেলার দুর্গাপুর অঞ্চলে ‘বউ তোলা’ নামে পরিচিত। এই খেলার এখানে একটু ভিন্ন রীতিতে অনুষ্ঠিত দেখা যায়। এখানে বউয়ের ঘর এবং খেলোয়াড়দের ঘরের সংযোগ করে একটি দাগ কাটা হয়। ঘরের খেলোয়াড়রা যখন বাইরের খেলোয়াড়দের ছুঁয়ে দিতে আসে তখন তারা এই দাগ অতিক্রম করে অপর প্রান্তে যেতে পারে না। তাদেরকে দাগের অন্যপ্রান্ত থেকে প্রতিপক্ষকে ছুঁতে হয়। তবে বউকে পেরিয়ে এসে দাগের অপর প্রান্তে যাওয়া যায়। কিন্তু বাইরের খেলোয়াড়রা দাগ মাড়াতে পারে। তাদের জন্য কোনো বিধি নিষেধ মানতে হয় না।
অনুপম হীরা মণ্ডল এর অন্যান্য লেখাসমূহ
Copyright © Life Bangladesh সাপলুডু মূলপাতা | মন্তব্য Contact: shapludu@gmail.com