Untitled Document
ধামরাই অঞ্চলের কালীকাচের নাচ
- অনার্য তাপস
পৃথিবীর সংস্কৃতির ইতিহাসে নৃত্যকলা একটি গতিশীল এবং প্রাণবন্ত শাখা। এই শাখার অন্তর্গত ‘লোকনৃত্য’ সার্বিক লোকায়ত সংস্কৃতির একটি মৌলিক উপাদান। প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিতে লোকনৃত্য সবধরণের নাচের মধ্যমণি। খুব সরল করে বলা চলে, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের লোকনৃত্যের মতো বাংলাদেশেরও রয়েছে অসাধারণ ব্যাঞ্জনাময় লোকায়তনৃত্য ধারা। এদেশের সাধারণ মানুষ দ্বারা চর্চিত নাচের মধ্যে ‘কাচ নৃত্য’ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

উল্লেখ করা আবশ্যক, কাচ নৃত্য কোন বিশেষ নৃত্যের নাম নয়। নাচের সাজসজ্জাকে বলা হয় কাচ। কোন চরিত্রের বেশভূষা বা মুখোশ ধারণ করে নাচলেই তাকে কাচ নৃত্য বলে। এই অর্থে সকলপ্রকার মুখোশ নৃত্য বা সাজসজ্জাযুক্ত নৃত্যই কাচ নৃত্য বা কাচ। কাচ নৃত্যের মধ্যে গুরুত্বপূর্ন হচ্ছে ‘কালীকাচ’। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কালীকাচের নাচ প্রচলিত আছে মুখা নাচ, কালীর নাচ ইত্যাদি বিভিন্ন নামে। কিন্তু ধামরাই অঞ্চলের কালীকাচের নাচের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।



জনপদ হিসেবে ধামরাই বেশ প্রাচীন। খুব স্বাভাবিকভাবেই এই অঞ্চলের লোকায়ত সংস্কৃতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ধামরাই অঞ্চলে কালীকাচের নাচ চৈত্রসংক্রান্তির আগের দিন অনুষ্ঠিত হয়। চৈত্রসংক্রান্তি এই এলাকা একধরনের নিরবই থেকে যায়। আবহমান বাংলার গ্রামীণ জনপদের মতো এই এলাকায় পঞ্জিকা মতে পহেলা বৈশাখ পালন হয় ‘নাগরিক বৈশাখ’ পালনের এক দিন পরে। যাইহোক, আমরা কালীকাচের নাচ নিয়ে আলোচনা করি। এই নাচের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এখানে নারীর অনুপস্থিতি। অর্থাৎ, যেকারণেই হোক না কেন কালীকাচের নাচে পুরুষদেরই অধিকার। পুরুষরাই এখানে কালী সাজে। এই পুরুষ কালীকে বলা হয় ‘মাউত’ (কালী পূজার মূল ব্যক্তি। যিনি মূলত কালী সাজেন এবং মুখোশ ব্যবহার করেন)। এই নাচের প্রধান বাদ্যযন্ত্র ঢাক বা জয় ঢাক। মাউতের পায়ে থাকে মল। পরনে লাল সালু। এক হাতে খড়গ অন্য হাতে একটি মাটির সরাÑ সিঁদুর দিয়ে যেটিকে লাল রং করা হয়। এই মাউতের মুখে থাকে শোলার তৈরি অনিন্দ্য সুন্দর অলঙ্কৃত মুখোশ। কালী মন্দিরে পূজার নৈবেদ্য এবং আনুষঙ্গিক ক্রিয়াকর্ম শেষে ঢাকের উদ্যাম বাদ্যে ‘মাউতে’র উপর কালীর ভর হয়। তাকে ধরে মন্দির থেকে বের করে আনা হয়। মাউত এই সময় মাটিতে সটান শুয়ে পড়ে। ঢাকের বাদ্যের তালে তালে মাউত উঠে দাঁড়ালে তার মুখে মুখোশ পরিয়ে দেওয়া হয়। এই সময় তার হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় খড়গ। ঢাকের ছন্দময় বাদ্যে মুখোশ পরিহিত অবস্থায় শুরু হয় মাউতের কালী নাচ। কিছু সময় মাউত একাই নাচে। আবার কখনো কখনো ডাকিনী, যোগিনীসহ আরো কিছু মুখোশ পরিহিত চরিত্র যোগ দেয় কালীর সাথে। এই বিশেষ মুহূর্তই নাচের আসল সময়। এই সময় নানারকম কসরৎ দেখানো হয়। এই নাচের উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে ঢাকের উদ্যাম ছন্দবদ্ধ বোলের সাথে গতিময় অঙ্গবিক্ষেপ। বিশেষ করে চরিত্রগুলো খড়গ কিংবা তলোয়ার দিয়ে একে অপরের সাথে যে যুদ্ধাবস্থার তৈরি করে তা ছন্দবদ্ধ গতিময়তার জন্যই উপভোগ্য। নাচের এক পর্যায়ে কালী রূপী মাউত নাচের আসর থেকে চলে যায়। এই সময় তার মুখোশ খুলে রাখা হয়। কালীর অন্যান্য পার্শ্ব চরিত্রগুলো এই সময় নাচতে থাকে। এর সাথে সাধারণ দর্শকও যোগ দেয়। বইপুস্তক থেকে জানা যায়, এক কালে এই নাচের ভেতর দিয়ে কালী বিষয়ক পৌরাণিক কাহিনী, বিশেষত অসুর বধের কাহিনী বিবৃত করা হতো। কিন্তু ধামরাই অঞ্চলের কালীকাচের নাচে সেই পৌরাণিক কাহিনীর বয়ান পাওয়া যায় না নাচের এই বিশেষ মুহূর্তে। বরং সেখানে এখন যোগ হয়েছে দর্শক মনোরঞ্জনের জন্য সমসাময়িক ঘটনাবলী নিয়ে উপস্থিত ভাবে তৈরি করা নাট্যাংশ। হঠাৎ করেই ডাকিনী, যোগিনীর মতো চরিত্রগুলো খুবই মানবিক হয়ে ওঠে এবং সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের কথা বলতে থাকে স্বাভাবিক রঙ্গরসিকতার মধ্য দিয়ে। নাচের সাথে সাথে এই নাট্যাংশ অভিনীত হয়। এই সময়ে চরিত্রগুলো শুধুমাত্র দর্শক মনোরঞ্জনের জন্যই নাচ ও অভিনয় চালিয়ে থাকে।

বেশ কিছুক্ষণ নাচ ও অভিনয় চলার পর বিশেষ ক্ষণে (তিথি আর পঞ্জিকার ক্ষণ গণনার উপর নির্ভরশীল) আবার মাউতের উপর ভড় করে কালী। পুনরায় শুরু হয় ঢাকের বাজনার সাথে মাউতের নাচ। এভাবে কয়েক পর্বে নাচ চলে। প্রতিটি পর্বেই ঢাকের বাজনার পরিবর্তন ঘটে। পরিবর্তন ঘটে মাউতের নাচের, গতির আর অঙ্গবিক্ষেপের। কালী পূজার বিশেষ বিশেষ সময়ে মাউত নাচতে নাচতে সবাইকে নিয়ে ঘুরে আসে পুরো পাড়া। একেবারে শেষে করা হয় শ্মশান পূজা। এইসময় মাউতসহ সবাই মন্দির থেকে বেরিয়ে চলে যায় কাছের একটি শ্মশানে। সেখানে বিভিন্ন আচার শেষে সূর্যোদয়ের মুহূর্তে মাউতের নাচ শেষ হয়। সেই সাথে শেষ হয় পুরো আনুষ্ঠানিকতা। শ্মশানের আনুষ্ঠানিকতা শেষে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে স্বতঃস্ফুর্তভাবে তৈরি হওয়া একটি শোভাযাত্রা প্রদক্ষিণ করে পুরো ধামরাই এলাকা।

ধামরাই অঞ্চলের কালী কাচের নাচ আমাদের লোকায়ত নৃত্য ধারার উল্লেখযোগ্য নাচ হিসেবে চিহ্নিত। বাংলাদেশের অন্যান্য লোকায়ত নৃত্য ধারার যেমন মুমুর্ষু অবস্থা ধামরাইয়ের কালীকাচের নাচের ক্ষেত্রে সেটা ঘটেনি এখনো। প্রতিবছর ঘটা করেই পুরো এলাকার মানুষ স্বতঃস্ফুর্তভাবে এই নাচের আয়োজন করে থাকে। কালের বিবর্তনে এর আচার ও প্রক্রিয়াগত জায়গায় বেশখানিকটা সংযোজন বিয়োজন ঘটেছে। তারপরেও ধামরাই অঞ্চলের কালীকাচের নাচ আমাদের লোকায়ত নৃত্য ধারায় বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে।

ছবি: তানজিম আহমেদ বিজয়, শক্তি নোমান

সহায়তা:
১. করুণাময় গোস্বামী, সংগীতকোষ, প্রথম পুনর্মুদ্রণ-২০০৪, বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
২. ড. দুলাল চৌধুরী (সম্পা.), বাংলার লোকসংস্কৃতির বিশ্বকোষ, প্রথম প্রকাশ-২০০৪, আকাদেমি অব ফোকলোর, কলকাতা।
অনার্য তাপস এর অন্যান্য লেখাসমূহ
Copyright © Life Bangladesh সাপলুডু মূলপাতা | মন্তব্য Contact: shapludu@gmail.com