Untitled Document
ধলতিতার ঘ্রাণ লাগে উত্তরের গাঁয়
- অনার্য তাপস
আমার ঠাকুর্দার বাবা অর্থাৎ আমার বাবার ঠাকুর্দার নাম ছিল পূর্ণচন্দ্র খাচুয়া। খাচুয়া তাঁর পারিবারিক উপাধী নয়। কিন্তু গ্রামের মানুষ তাঁর নামের শেষে সেটি বসিয়ে দিয়েছিল বিস্তর গবেষণার পর একটা কনক্রিট ডিসিশনে এসে। সন্দেহের কোন অবকাশ নেই যে, খাচুয়া শব্দটি খচ্চর শব্দের অপভ্রংশ আর উত্তরের জনপদগুলোয় এটি একটি জনপ্রিয় গালি হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। আমি এখনও ভেবে পাইনি কেন তিনি একটি গালিবাচক শব্দকে নিজেন নামের সাথে জড়িয়ে বড়াই করেছিলেন তাঁর জীবদ্দশায়। এমনও শোনা যায়, বৃটিশ আমলে পাড়াগায়ের কোন একটি ঘটনায় তৎকালীন পুলিশের বড় কর্তার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি দ্যার্থহীন ভাবে ঘোষণা করেছিলেনÑ মোর নাম পূণ্য খাচুয়া। পুলিশের বাপের সাধ্য আছে নাকি মোর গ্রাম থাকি মানুষ ধরি নিগায়? তার পরেও পুলিশ বারাবাড়ি করলে নাকি তিনি Ñ দ্যাওরে, ()..গুলার গাড়ি উল্টি দ্যাও। দেখং কায় কী করে... বলে গ্রামের মানুষকে ফুসলিয়েছিলেন। ফল, চিরকাল যা হয়ে থাকে তাই হয়েছিল। যাই হোক, আমার বংশ পত্তনকারীদের মধ্যে এমন একজন খ্যাতিমান মানুষের উপস্থিতি আশৈশব আমাকে বড়ই অনুপ্রাণিত করেছে।

আমাদের বাড়ির ঠিক সামনে একটি পুরনো ভিটে রয়েছেÑ যেটি বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা আর বাঁশঝাড়ে পরিপূর্ণ বলে বাগান নামে সবার কাছে পরিচিত। অনেক অনেক কাল আগের গল্প, প্রতি হেমন্তের চাঁদনীতে বাড়ির বাইরের উঠোনে বসে আমার তরুণী ঠাকুরমারা দেখতেন সেই বাগানের বাঁশ কেটে নিয়ে যাচ্ছে অপ দেবতার দল (সেটা নাকি আবার স্পষ্ট দেখা যেত)। বাঁশ কেটে সেটা আবার গরুর গাড়িতে তোলা হতো। তারপর সেই গাড়ি হারিয়ে যেত কোথায়, তা কেউ জানে না। জানার দরকারও হতো না। পরদিন বাঁশবাগানে গিয়ে দেখা যেত কোন বাঁশই কাটা হয়নি। তবে এই বাঁশকাটার গল্পের সাথে সাথে ঠাকুমারা হারিয়ে যেত সেই বাঁশঝাড়ের পাশে কীভাবে একাকী থাকতো সেই নারীটি, যার নাম নীলোÑ এমনি এক নিষিদ্ধ বা প্রায় নিষিদ্ধ গল্পের অন্তরালে। নিশ্চিত যাদুমন্ত্র জানতো সে! নইলে সেখানে একা একা থাকা যে সাধারণ মানুষের কর্ম নয়, সেটা তো বোঝাই যায়। অপদেবতায় কেটে নিয়ে যাওয়া বাঁশঝাড়ের ভেতর দিয়ে একটি পায়ে চলা পথ তখনো ছিলো, এখনো আছে। শেওড়া গাছ থেকে পেতœীর ছুঁড়ে দেওয়া মুত্রের গন্ধে সন্ধ্যার পরই সেই পায়ে চলা পথে হাঁটাচলা বন্ধ হয়ে যেত পাড়ার মানুষের। এই বাঁশঝাড়ের একটু সামনে মরা নদীর সোঁতার মতো নয়নজুলি। যেখানে বর্ষার জমা জলে স্নান করতো মাসান দেও। মাঝরাতে তাদের হুটোপুটিতে ঘুম ভেঙ্গে যেত পাড়ার মানুষের। অথচ সেই পেতœীদের সাথী হয়ে আর মাসনা দেওয়ের প্রতিবেশী হিসেবে মরা নদীর সোঁতার মতো নয়নজুলির উপর আমার পূর্বপুরুষদের অপার অনুগ্রহে ঠাঁই পেল যে নারীটি তারই নাম নীলো। শোনা যায়, বড়ই রূপবতী আর অসাধারণ মানুষ বশ করার যাদুমন্ত্র জানতো সে। এটাও শোনা যায়, বৃটিশ পুলিশের বড়কর্তাকে গালাগালি দেওয়া পূর্ণচন্দ্র খাচুয়াও তার অসাধারণ রূপ আর যাদুমন্ত্রের বশে কেমন জানি উদাসীন হয়ে গিয়েছিলেন। বাড়ির কথা, পরিবারের কথা তাঁর মনে থাকতো না খুব একটা। তবে কেন জানি তিনি বিশাল ভূস্বামী হয়েও ছেলেদের লেখাপড়া শিখিয়েছিলেন। বড় হয়ে এই ছেলেদের একজন হয়েছিলেন মাস্টার আর একজন কবিরাজ না হয়ে হয়েছিলেন গ্রামের ডাক্তার। এটা বড়ই আশ্চর্যের কথা বটে। কারণ উত্তরের এই জনপদগুলোর মাটি অত্যন্ত উর্বর। ধান ছিটালেই বিনা আয়াশে বিঘা প্রতি চল্লিশ মন ধান হবেই হবে। সেখানে কষ্ট করে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখাতে যায় কোন বাপে? কিন্তু পূর্ণচন্দ্র খাচুয়া শিখিয়েছিলেন। আর খুব আশ্চর্যের কথা, তাঁর ছেলেরা ধর্মত একবার বিয়ে করেই সুখী ছিলেন। বাপের রাধা বন্দনার কত্তালের শব্দ যে তাদের কানে যায়নি তা তো নয়! গিয়েছিল। যাই হোক, কীংবদন্তীর এই পূর্ণচন্দ্র খাচুয়া আমার পূর্বসুরী, আর আমি এ কারণে যথেষ্ট গর্ববোধ করি। কিন্তু অনেক অনেকদিন পর, অনেকদিন পরে... যখন আমার গোঁফে সাবান মাখার বয়স অন্তত বছর দশেক ছাড়িয়েছে, তখন বুঝতে পারি কেন এই পূর্ণচন্দ্র খাচুয়ার উত্তরপুরুষ তাঁর নাতির বউ কার্তিক মাসে বাপের বাড়ি যেত কাঁদতে কাঁদতে, আর ফিরতো মোটামুটি মাসটা কাটিয়ে কোলের বাচ্চার কপালের বাম দিকে একটা কাজলের ফোঁটা মেরে। অনেকদিন পরে সেটা বুঝতে পারি। সমরেশ বাবু এক্ষেত্রে আমার চক্ষু চড়কগাছ বানিয়ে ছেড়েছেন। গুরুদেবায় নমঃ।

“চৈত্র মাসে সবখানে দুর্দিন। দুর্ভোগের মধ্যে গাজনের সন্ন্যাস নিয়ে কাল কাটে একরকম। ...ওদিকে সমুদ্র ধাক্কা দিচ্ছে চৈত-হ্যাঁকায়, কলিযুগের মালোরা তিষ্ঠোতে পারে না সেখানে। এদিকে জল শূন্য, যেন পোকাটিও নেই। তখন কী হয়? না, গুণ-ছাপটি নিয়ে এসে দাঁড়ায় গাঁয়ে গুণীন ওঝা। কী হয়েছে? না, পেতনীর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। ...ভর করে মেয়ে মানুষকে বেশী। যে মাছমারার নৌকা নেই তার ঘরণীর উপর পেতনীর নজর বেশী। ...ওই সময় মাছমারারা সবাই বিবাগী হয়ে, ঘর ছাড়তে চায়। যাবে কোথায়? শহরের রাস্তায় গিয়ে, হাত পেতে বেড়াবে, বাবু এট্টা পয়সা দিন গো অভাগারে। ভিখারী সবাই হতে পারে। বুকে হাত দিয়ে বোল মাছমারা, চৈত্র মাসে সন্ন্যাস নিয়ে দাঁড়াও গৃহস্থের দরজায়, ও বুড়ো শিবের চরণে সেবা লাগে, বাবা, মহাদেবো, জয় শিবে...’ তখন কি একবার মনটা তোমার সিঁটোয় না। মনে গায় না, তুমিও ভিখিরি হয়েছ? একবার বলো না কি মনে মনে, হে মা ধরিত্রী, তোর চোত-টোটার মার বড় জবর গো।”

কেটে-ছেটে একেবারে খোদাই করে এমন শব্দচিত্র দিয়ে সমরেশ বসু গঙ্গাপারের মানুষের ছবি এঁকেছেন ‘গঙ্গা’য়। পাকেচক্রে মহাজনের হাতে ঘোল খাওয়া মাছমারাদের জীবনে অতঃপর কী হয়? দক্ষিণের হোগলা বনে বাছারি নৌকা ঢোকে, ফিরে আসেÑ খালি, ‘কশার’ বাঁধা হয় একটা; আষাঢ়-শ্রাবণে গঙ্গায় বান ডাকে, পাচু ‘লৌকা’ নিয়ে ভাসে, সয়ারামের দাদা গঙ্গার ঘূর্ণিতে পড়ে মরে, মহাজন বলে ‘এরা আসে বা কেন, মরে বা কেন!’। মাছমারার বৌ বসে থাকে, পেটে তার নতুন অতিথি। বিলেস প্রেমে পড়ে, স্বপ্ন দেখেÑ‘সাইদার’ হয়ে সমুদ্রে যাবে একদিন। টিকটিকি বলে টিকটিক। পাচু মরে। মাছমারার বৌয়ের হাত থেকে খসে পড়া কাসার বাটিতে শব্দ হয়Ñঝন্নন। বিলেস ‘কশার’ বাঁধার যায়গা খুঁজে পায় না। কেঁদে ওঠে দামিনীÑযার বুকে সমুদ্রের ‘ফড়েনী’ হবার স্বপ্ন ছিল। আর? ধলতিতা গ্রামে গাবগাছের পাতায় পাতায় ছায়া নামে তখন, সবুজ থেকে কালো হতে হতে।

মহেশপুর গ্রামের সেই অপদেবতায় বাঁশ কেটে নিয়ে যাওয়া বাঁশঝাড়ের পায়ে চলা পথে আশ্বিনের পাতা ঝড়া রোদ খাম মেরে পরে থাকে। ক্লান্ত-বিষণœ ঘুঘুর ডাক গড়িয়ে পড়ে কালচে সবুজ কচি বাঁশের গা বেয়ে। ‘গুরু উপায় বল না,/জনম দুঃখি কপাল পোড়া গুরু/আমি একজনা’। উত্তরের বাতাসে ভেসে আসে গান। একটু হিম পড়ে বটে, তবে শীত এখনো আসেনি। সবে শরতের শুরু। হেমন্ত যাবে তারপরে শীতের দেখা মিলবে। আশ্বিনের রোদ একটু যেন তেড়ছাভাবে পড়ে। বিড়ি টানতে টানতে গা ঝারা দিয়ে উঠে দাঁড়ায় বিষাদু। ‘চুৎমারনি শালী, আইজে বাপের বাড়ি যাবু’ গামছা কাঁধে বিলের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বাতাসে ছড়িয়ে দেয় কথাটা। যার উদ্দেশ্যে বলা সে ঠিকই ধরে ফেলে। একটু পরে ঘরে নাকি সুরে কান্নার শব্দ ওঠে ‘গোলামটা মরেও না।’ কথাটা কানে গেলে ফিরে আসে বিষাদু। ‘কী কলু রে...’ আর কোন কথা নেই, একেবারে বাড়ির দুয়ারে উপস্থিত হয় সে। পাশেই বাঁশের চটা তুলতে তুলতে সবকিছু শুনছিল কান্দু। বিষাদুকে আসতে দেখে তেড়ে ওঠে সে। ‘গাও ধুবার যাওচিস, যা। ফির আসিস ক্যানে।’ সামনে বড় ভাইকে দেখে আর এগোয় না সে। ‘আইজে বাপের বাড়ি যাবু কনু।’ গজ গজ করতে করতে বিলের দিকে চলে যায় বিষাদু। ‘বাপের বাড়ি যাবার কওচে যাও। দুই দিন থাকি আইসো।’ মাটির দিকে তাকিয়ে না হলেও মাথা নিচু করে কথাটা বলে কান্দু ঘরের উদ্দেশ্যে। ঝনাৎ করে ওঠে বিষাদুর বউ। ‘ক্যানে বাপের বাড়ি যাইবে। এ্যাটে থাকিম। মারুক ধরুক এ্যাটে থাকিম।’ বড় গোঁজ বউয়ের। ‘থাকো।’ কোন কথা না পেয়ে এই উত্তর দিয়ে নিজের কাজে মন দেয় কান্দু। বউটা আবার কান্না শুরু করে। বিষাদু সহসা বিল থেকে ফেরে না। জানে, তার কিছু করার নেই।

বড়বাড়ি আর মাঝাটারির মাঝে বিঘে বিশ জমি। মাঝে একটা বাজা আম গাছ। বেশ ঝাঁকরা। পায়ে চলার সরু পথে আরো কয়টা আম, শিমুল আর কিছু বিশল্যকরণী। গ্রাম একটাই, মহেশপুর। বেশ বড় গ্রাম। শোনা যায়, বড়বাড়ির কোন এক ব্যক্তির নামে এই গ্রামের নামÑমহেশপুর। এই বাড়িকে পুরোন-প্রাচীন লোকেরা সাঁজোয়ালবাড়ি বলে চেনে আজো। জমিদার না হলেও জোদ্দার ছিল এরা একসময়। আশপাশের সবাই নাকি এদের প্রজা-আশ্রিত। পূর্ণ বাবু, মহেশ বাবু নামগুলো এখনো লোকের মুখে মুখে ফেরে। এই বাড়ির জৌলুস এখন বিগত। পূর্বপুরুষদের স্মৃতি হাতড়ে বেশ মজা পায় বাড়ির বর্তমান সদস্যরা। মাঝাটারি আর বড়বাড়ি বা সাঁজোয়ালবাড়ি যাই বলি না কেন, এ দু’য়ের মাঝে একটা অদৃশ্য ভেদ রেখা টেনে দিয়েছে মাঝের বাজা আমগাছটা। এবাড়ির লোকেরা দুধ ভাত খাওয়ার স্মৃতি হাতরায়। আর ওবাড়ির লোকেরা মনে মনে বলতে বলতে এখন প্রায় প্রকাশ্যেই বলেÑ আরে থো। কোনবা দিনে খাচি দই, তার কতা আইজো কই।

বড়বাড়ির সত্য মাস্টারের আঙ্গিনায় আশ্বিনের তেজি রোদ ছড়ানো দুপুরে মন্দিরা বেজে ওঠে টুং টুং। ‘আমার হতভাগা মনের আশা গুরু/মিটল না সহজে...’ সরু খেন খেনে গলায় ক্লান্ত দুপুরে ঘুঘুর বিষণœ ডাকের মতো অনুরণন ছড়িয়ে বোষ্টমী গেয়ে ওঠে। বোষ্টম তার দোহারকি করে ‘অহয় অহয় অহয়’ বলে। গান শেষ হবার আগেই মাস্টারের বউ স্নান সেরে বাড়ি ফেরে। আড় চোখে বোষ্টমী দেখে নেয় বউটিকে। আন্দাজ করার চেষ্টা করে মেজাজমর্জি কেমন। ভালই মনে হয়। গান শেষ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে বোষ্টম-বোষ্টমী। মাস্টারের বউ কাপড় ছেড়ে মাথায় গামছা বেঁধে, ভেজা কাপড় হাতে নিয়ে শুকাতে দিতে আসে ঘরের বাইরে। বোষ্টমী তাকে দেখে হাসে। ‘রই দিদি, ক্যামোন আছিস হায়।’ বউটি কাপড় শুকাতে দিতে দিতে হাসে একটু। ‘ভাল।’ বউ আন্দাজ করার চেষ্টা করে এরপরে বোষ্টমী তাকে কী বলতে পারে। এরা অনেকদিন থেকেই আসে। চেনা। বেশ ভালই চেনা। তাই মতিগতিও বোঝা যায়। কাপড় মেলে দেওয়া হলে বউটি ঘরে ঢোকে। বেরিয়ে আসে পুরোন কনডেন্সড মিল্কের কৌটায়Ñযেটিকে তারা ভাতের চাল মাপার পোয়া হিসেবে ব্যবহার করেÑএক পোয়া চাল নিয়ে। রাখে বোষ্টমীর সামনে। একটু ঝুঁকে চাল নিতে গিয়েও নেয় না বোষ্টমী। দাঁড়িয়ে থাকে একটুক্ষণ। মুখে লজ্জামাখা হাসি নিয়ে বলে ‘রই, হ্যানা জল খোয়ের পাবু হায়।’ বউটি মনে মনে প্রমাদ গোনে। একমুহূর্তের জন্যও বুঝি কেঁপে যায় তার বুকটা। ঘরেও টান। খুব হিসাব করে চাল খসাতে হয় হাত থেকে। একটু বেচাল হলে শেষ। এদিক ওদিক করা যাবে না। কার্তিক মাসের পুরোটা আর আঘোন মাসের আধাআধি বাকি এখনো। সাবধান। বউও লজ্জা পায়। যতই ভিক্ষে করুক, পরিচিত তো। সবসময় তো আর আবদার করে না। একটা দিন বা একটা বেলা। কিন্তু পারে না যে। পারা যায় না। হিসাব করলে মাথা ঘোরে। প্রতিটা দানা হিসাব করে চলতে হয়। সবাই বলে মাস্টারির টাকা। সেটা যে কীÑ বউ তা ভাল করে জানে। ‘আইজ না পাইম দিদি। আরেকদিন আইসো।’ ‘হ্যানা জল খোয়ালু হয় বইন।’ ‘আইজ একেরে পাবার নাও দিদি। কিচু মনে করেন না।’ মনে করা যায় না। গৃহস্থের বউ যখন হাতে পায়ে না ধরে শুধু কথার আকুতিতে ক্ষমা চায়, বুঝতে হয় গতিক বড় খারাপ। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় বোষ্টমী সেটা বোঝে। তার উপর মরার কাইতা। একটু বুঝি দীর্ঘশ্বাস পড়ে তার। মাটি থেকে কৌটার চাল তুলে পুরোন কাঁথা সেলাই করে বানানো ঝোলায় রাখে বোষ্টমী। ‘থাক বইনো’ বলে বিদায় নেয় তারা। চুল ঝেরে মাস্টারের বউ ভাত রাধতে বসে।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে গোধূলী তারপর সন্ধ্যা, রাত। প্রাত্যহিক হিসেবের পাট চুকে গেলে সুখ খোঁজে শরীর, কখনো মন টানে কখনো টানে না। কিন্তু অভ্যেসের বশেই শরীর খোঁজে শরীর রাতের আঁধারে। টুকটাক কথা, তারপর দুম করে ঘুম। একটা রাত কেটে যায়। আজ টুকটাক কথা নয়, বেশ ঝাঁঝালো কথা বেরিয়ে আসে মাস্টারের বউয়ের গলা থেকে। রাতের মতো বেশ উচ্চস্বরেই বটে। মাস্টার নিরুত্তাপ কণ্ঠে বলে, আস্তে কথা কও, মানুষ শুনবে। বউ খেঁকিয়ে ওঠেÑ শুনুক, তাতে মোর কি যায় আইসে? বউ জানে, মানুষ শুনলে তার অনেককিছুই যায় আসে। তারপরেও বড় অভিমান করেই বলে, শুনুক, তাতে মোর কি যায় আইসে? প্রত্যেক কাতিক মাস বাপের বাড়ি যাইম, আ হা হা। কথার কী শ্রী! এরপর কিছুক্ষণ নিরবতা। না, মাস্টারের বউ কাঁদে না। বোঝার চেষ্টা করে। বোঝাবার চেষ্টা করে। রফা হয়, বাপের বাড়িতে সপ্তাহ দুই থাকলেই চলবে। এরই মাঝে সপ্তাহ দুয়েকের কী লাভ কী ক্ষতি হিসেব কষা শেষ। কার লাভ কার ক্ষতিÑ তাও। মাস্টার খুব যে হিসেবি তা নয়। কিন্তু কীভাবে যেন মাথা চলে। যাই হোক, সপ্তাহের এক শুক্রবার মাস্টার তার বউকে বাসে তুলে দিয়ে আসে বাপের বাড়ির পথে। কাখে মেয়ে আর ডান হাতে ছেলের হাত ধরে মুখ অন্ধকার করে বউ চলে বাপের বাড়ি। ধাবমান বাসের পেছনে তাকিয়ে থাকে মাস্টার। না, বাষ্পটা বুক অব্দি এসে থেমে যায়। চোখে ঘনীভূত হয় না। বাস চোখের আড়াল হলে উল্টো ঘুরে মাস্টার বাজারের পান দোকানের সামনে আসে। দোকানি তাকে দেখে বলে, কী দাদা... মাস্টার বলে, ভিজাপাতি আর বাবা জর্দা বেশি দিয়া এক খিলি পান দে।

হেই মাস্টার, পূর্ণচন্দ্র খাচুয়ার নাতি, বউ বাপের বাড়ি গেল ক্যান? মাস্টার বলে, না প্রকাশ্যে নয়, মনে মনেÑ কার্তিক মাস রে বাপ। তো? মাস্টার বলে, তো? তাই তো বলি, তো মানে কী? তো মানে অনেক কিছু রে বাপ। বড় হ বুঝবি। পূর্ণচন্দ্র খাচুয়ার বড় ছেলের বড় ছেলের বড় ছেলে তার গোঁফে সাবান মাখার বয়স অন্তত বছর দশেক ছাড়িয়ে যাবার পর বোঝেÑ তো মানে কার্তিক মাস রে বাপ! কার্তিকের মার বড় জবর গো! এই মাইরে বিষাদুর বউ আর মাস্টারের বউ দুই বাপের বাড়ি যায়। আর কান্দুর বউ শামুক, গুগলি আর কচুর কন্দ খোঁজে পাথারে পাথারে।
অনার্য তাপস এর অন্যান্য লেখাসমূহ
Copyright © Life Bangladesh সাপলুডু মূলপাতা | মন্তব্য Contact: shapludu@gmail.com