Untitled Document
ঢালীখেলা
- অনুপম হীরা মণ্ডল


ঢালীখেলার পরিবেশন রীতি
ঢালী খেলা হলো দলবদ্ধ খেলা। দুই দলের আক্রমণাত্মক ভঙ্গী ও কৃত্রিম যুদ্ধের মাধ্যমে এই খেলার শুরু ও শেষ হয়। এক একটি দলে ১০ থেকে ১২ জন খেলোয়াড় থাকে। কখনো কখনো এক একটি দলে এর অধিক খেলোয়াড়ও থাকে। সাধারণত কোনো উন্মুক্ত প্রান্তর, খোলা মাঠ, উঠোন ইত্যাদি স্থানে এই খেলা অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমে একদল লোক গাঁয়ের মধ্য দিয়ে সমবেতভাবে উচ্চৈঃস্বরে হাক দিতে থাকে। একে ‘ডাক, বলা হয়। যেদ্ধারা ডাক দিতে দিতে খেলার খোলায় বা মাঠের দিকে অগ্রসর হয়। তার পর লোকসমাগম হলে নির্দিষ্ট সময় খেলোয়াড়রা তাদের শিল্প কুশলাতা প্রকাশ করতে থাকে। প্রথমে উঠোন বা ফাঁকা মাঠের মাঝখানে খেলোয়াড়রা বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে এক প্রকার সমবেত ছড়া আবৃত্তি করে। এই ছড়াকেও ডাক বলে অভিহিত করা হয়। ডাকের সঙ্গে হাত, পা, কোমর দুলিয়ে নৃত্য করতে থাকে। ডাক এবং নৃত্যের সঙ্গত হিসেবে একদল বাদক বাদ্য বাজায়। বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ঢোল, কাঁসার থালা, পিতলের কলসি, মন্দিরা, রামচাকি ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়। বাদক দলেরা ক্রীড়াক্ষেত্রের একপাশে বসে বাদ্য বাজায় আর খেলোয়াড়রা তাদের বাদ্যের তালে তালে নৈপুণ্য প্রদর্শন করে। ক্রীড়াঙ্গনের চার পাশ জুড়ে দর্শকেরা বৃত্তাকারে ঘিরে থাকে। দুই দিকে দর্শকদের সামনে থাকে ক্রীড়ানকেরা। এখান থেকেই তারা ক্রীড়া ক্ষেত্রের মধ্যে গিয়ে ক্রীড়া শৈলী প্রদর্শন করে।
ডাক ছাড়ার পর খেলোয়ারগণ দুই দলে ভাগ হয়ে গিয়ে মাঠের দুই ধারে অবস্থান নেয়। এর পর একজন খেলোয়াড় হাতে আপেক্ষাকৃত সরু লাঠি নিয়ে বিভিন্ন শারীরিক কশরত করতে থাকে। একটু পরে অপর দিক হতে প্রতিপক্ষের আর একজন খেলোয়াড় আসে এবং সে অনুরূপ শারীরক্রিয়া করতে থাকে। ধীরে ধীরে তার উভয়ে কৃত্তিম ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং একে অপরকে আক্রমণ করতে উদ্যত হয়। এই সময় একটি দল থেকে একজন খেলোয়াড় রণোন্মুখ হয়ে তার সহযোদ্ধাকে বাঁচাতে প্রতিপক্ষের খোয়োড়কে আক্রমণ করে।


প্রতিপক্ষ হতে আর একজন রণভঙ্গিমায় বেরিয়ে আসে। একে একে প্রতিটি দল থেকে সকল খেলোয়াড় ক্রীড়া ময়দানে কৃত্রিম যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এর নৃত্যের ভঙ্গিমায় শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ।
প্রথমে খেলোয়াড়দের হাতে থাকে সরু লাঠি এর পর পর্যায়ক্রমে অপেক্ষাকৃত লাঠির আকার বড় হতে থাকে। তিন থেকে চার হাত লম্বা বাঁশের লাঠি এই খেলার প্রধান উপকরণ। এই লাঠি দিয়েই খেলোয়াড়রা তাদের কশরত প্রদর্শন করে বেশি। খেলোয়াড়গণ প্রথমে এক হাতে এর পর দুই হাতে লাঠি ঘুরাতে থাকে। কখনো কখনো এক হাত হতে অন্য হাতে নিয়ে লাঠি ঘুরায়। যে যতো সুচারু এবং দ্রুত বেগে লাঠি ঘোরাতে পারে তাকেই দক্ষা খেলোয়াড় বলে মনে করা হয়। খেলোয়াড়রা একে একে রণনৃত্য প্রদর্শন করতে করতে তাদের হাতিয়ারের আকার বৃদ্ধি করার দিকে মনোনিবেশ করে। খেলোয়াড়রা হাতিয়ার হিসেবে ঢেঁকি এমনকি গাছের গুড়িও ব্যবহার করে। এক একজন দক্ষ এবং শারীরিক সক্ষম খেলোয়াড়ের হাতে পড়ে বিশালাকার এই ঢেঁকি এবং গাছের গুড়িও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। খেলোয়াড়গণ তাদের শারীরিক শক্তি প্রদর্শনের জন্য এই অভিনব হাতিয়ার ব্যবহার করে। যশোর জেলার অভয়নগর থানার পায়রা ইউনিয়নের পায়রা গ্রামে ঈদ পর্বে এবং সুন্দলী ইউনিয়নের ফুলেরগাতি গ্রামে রথের মেলায় ঢালীখেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠান দুটিতে প্রদর্শিত ঢালীখেলায় এখনো খেলোয়াড়দের হাতিয়ার হিসেবে ঢেঁকি এবং গাছের গুড়ি ব্যবহার করতে দেখা যায়।
ঢালিখেলা প্রথমে একক খেলা দিয়েই সূচনা হয়। একজন খেলোয়াড় ধীরে ধীরে তার নৈপুণ্য প্রদর্শন করে। এক এক করে লাঠি, ঢাল এবং সড়কি নিয়ে শারীরিক কসরত করতে থাকে। বিভিন্ন কৌশলে অঙ্গ চালনার মধ্য দিয়ে হাতের লাঠি এবং ঢালকে ঘুরায়। এক হাত হতে অন্য হাতে, মাথার উপর দিয়ে, শরীরের এপাশ ওপাশ করে, পায়ের নীচ দিয়ে লাঠি চালনা করে এবং ক্ষিপ্র গতিতে ঘুরায়। এ সময় বাদকেরা ধীর লয়ে বাদ্য বাজাতে থাকে। তবে ক্রমশ লয় বাড়তে থাকে এবং মধ্য থেকে দুন, চৌদুন অবশেষে দ্রুত লয়ে গিয়ে পৌঁছায়। বাদ্যের লয় যতো দ্রুত হয় খেলোয়াড়ের হাতিয়ারও ততো ক্ষিপ্রতা লাভ করে।



ঢালীরা যখন লাঠি চালনা করেন তখন তাদের চোখে-মুখে থাকে ক্রোধাত্মক ভঙ্গী। যুদ্ধের কৌশল হিসেবে খেলোয়াড় অপর পক্ষের খেলোয়াড়কে সজোরে আঘাত করে। এ সময় অপর পক্ষের খেলোয়াড় সেই আঘাত তার হাতের লাঠি বা বল্লম দিয়ে ঠেকায়। আবার প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় যখন প্রথম জনকে আঘাত করে তখন প্রথম জন তা প্রতিহত করার চেষ্টা করে। এভাবে যখন একে আঘাত করে তখন অন্যে ঠেকায়। আর যখন অন্যে আঘাত করে তখন সে সেই আঘাত প্রতিহত করে। এভাবে খেলা চলতে থাকে।
খেলোয়াড়েরা যখন লাঠি চালনা করে তখন সে তার ডান পা মাটির সঙ্গে আঘাত করতে করতে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। আবার অন্যজন যখন তাকে আঘাত করে তখন সে পিছিয়ে যায়। এভাবে খেলোয়াড় সামনে পেছনে আগু-পিছু করে তার ক্রীড়া নৈপুন্য প্রদর্শন করে। ঢালীখেলার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর ‘ডাক, দেওয়া। খেলোয়াড়েরা তাদের শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে মুখে আ... আ... আ... করে আওয়াজ করে এবং মুখে হাতের চাপড় মারে। কখনো এককভাবে আবার কখনো সমবেতভাবে আওয়াজ দেয়। খেলার ময়দানের গিয়ে খেলোয়াড়েরা হযরত আলী (রঃ) এবং মা ফাতেমার দোহাই কাড়ে। এছাড়া দেবী কালী, দুর্গা, গাজী কালু প্রভৃতির দোহাই কাড়া হয়। খেলোয়াড়দেরকে এই সময় মাটিতে চাপড় মারতে দেখা যায়। তারা মাটিতে চাপড় দিয়ে হুঙ্কার দিতে থাকে। মাটিতে লাঠির আঘাত, পদাঘাত ইত্যাদির মাধ্যমে খেলোয়াড়গণ নিজেদের শক্তিবৃদ্ধির চেষ্টা করে। কখনো কখনো প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে হুঙ্কারের মাধ্যমে ভীত-সন্ত্রস্ত করার চেষ্টা করে। ঢালীখেলায় নিজেকে রক্ষার অন্যতম উপায় হলো ঢাল দিয়ে প্রতিপক্ষের আক্রমণকে প্রতিহত করা। এই উদ্দেশ্যে খেলোয়াড় একহাতে তার লাঠি-সড়কি-বল্লম এবং অন্য হাতে ঢাল ধরে রাখে।
ক্ষেত্রসমীক্ষার উদ্দেশ্যে মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া থানার কামতা গ্রামের একটি খেলা প্রত্যক্ষ করার প্রয়াস পাওয়া যায়। এই গ্রামের আবুল কাসেম মাস্টারের বাড়ি ২০০৮ খ্রিস্টাব্দের ২১ জুলাই একটি লাঠি খেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই দলের সর্দার ছিলেন ফজলুল হক। তার নেতৃত্বে পরিবেশিত একটি লাঠিখেলার পরিবেশন রীতিতে যথেষ্ট স্বাতন্ত্র্য লক্ষ করা যায়। প্রথমে লাঠিখেলার ডাক শুরু হয়। এই ডাক দিতে দিতে খেলোয়াড়রা গ্রাম প্রদক্ষিণ করে। এই সময় গ্রামের বাসিন্দারা বুঝতে পারে যে লাঠিখেলা হবে। দলে দলে তখন খেলা দেখতে হাজির হয়। এর পর নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে খেলা প্রদর্শিত হয়। বিভিন্ন কসরতে ক্রীড়া শৈলি প্রদর্শন করে। দুটি দলে ভাগ হয়ে খেলোয়াড়রা খেলা প্রদর্শন করে। লাঠি খেলা শেষে এই দলেরই একজন যাদুকর যাদু প্রদর্শন করেন। যাদু প্রদর্শনের পর বিনোদনের জন্য বহুরূপী খেলা প্রদর্শিত হয়। বিভিন্ন সাজে খেলোয়াড়রা এসে নাট্যাংশ পরিবেশন করে। এই নাট্যাংশের সঙ্গে প্রদর্শিত হয়। নাচ-গান। নাচ-গানে বিভিন্ন মুখোশ ব্যবহার করতে দেখা যায়। মুখোশকে তারা মুখা বলে এবং তাদের ভাষায় মুখোশ নৃত্য হলো মুখানাচ। এই দলে একজন হিজরার অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়। যে লাঠিখেলা শেষে নাচ-গানের পর্বে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। খেলোয়াড়দের পোশাক ও অলঙ্কার যশোর-খুলনার খেলোয়াড়দের পোশাক হিসেবে মালকোচা দেওয়া ধুতি, কোমরে রঙিন গামছা, বাহুতে বাজু বন্ধ, পায়ের পাতায় হাসুলি, ঘুঙুর, বুকে বর্ম এবং হাতে থাকে ঢাল। বর্তমানে এই অঞ্চলের খেলোয়াড়দের লুঙ্গি পরেও ঢালিখেলায় অংশ নিতে দেখা যায়। নড়াইল জেলার খেলোয়াড়দের পোশাক হিসেবে রঙ্গিন ধুতি, রঙিন লুঙ্গি, রঙিন গেঞ্জি, রঙিন উত্তরীয় এবং রঙিন গামছা ব্যবহার করতে দেখা যায়। মানিকগঞ্জ জেলার খেলোয়াড়দের ঝুরি দেওয়া রঙিন ঘাঘরা, মাজার রঙিন গামছা, সাদা উত্তরীয় ইত্যাদি পোশাক পরিধান করতে দেখা যায়। অলঙ্কার হিসেবে পায়ে ঘুঙুর, বাহুতে বাজুবন্ধ, বুকে বর্ম ইত্যাদি লক্ষ করা যায়। ময়মনসিংহ অঞ্চলের খেলোয়াড়গণ লুঙ্গি এবং ধুতি উভয় পোশাক পরে। এদের মধ্যে গামছা ব্যবহারের রীতি যথেষ্ট তবে উত্তরীয় ব্যবহার করতে দেখা যায় না। এই অঞ্চলের খেলোয়াড়দের মাথায় গামছা বাধতে দেখা যায়। চট্টগ্রাম অঞ্চলের খেলোয়ড়গণ সাদা ধুতি মালকোচা দিয়ে পরে। এই অঞ্চলের খেলোয়াড়দের পায়ে ঘুঙুর ব্যতিত অন্য কোনো অলঙ্কার পরতে দেখা যায় না। তবে বৃহত্তর যশোর-খুলনা অঞ্চলের মতো চট্টগ্রাম অঞ্চলের খেলোয়াড়দের হাতে ঢাল লক্ষ করা যায়। পাবনা সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে প্রতিবছর ঈদুল আযহার সময় ঢালীখেলার প্রতিযোগিতা হয়। এই সময় বিভিন্ন স্থান হতে বহু দল এসে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। এই অঞ্চলের খেলোয়াড়দের পোশাক হিসেবে লুঙ্গি এবং গামছা ব্যবহার করতে দেখা যায়। অলঙ্কার হিসেবে হাতে এবং পায়ে ঘুঙুর বাধে। নরসিংদী অঞ্চলের খেলোয়াড়দের পরনে থাকে ধুতি, গায়ে গেঞ্জি, কোমরে গামছা ও পায়ে ঘুঙুর।

(চলবে)



বাম থেকে ডানে
ঢালী খেলায় বাদ্য যন্ত্রের ব্যবহার | মহড়া | ঢালী খেলায় অলংকারের ব্যবহার
অনুপম হীরা মণ্ডল এর অন্যান্য লেখাসমূহ
Copyright © Life Bangladesh সাপলুডু মূলপাতা | মন্তব্য Contact: shapludu@gmail.com