Untitled Document
ঢালীখেলা
- অনুপম হীরা মণ্ডল
(পূর্ব প্রকাশের পর)
ঢালীখেলার সঙ্গে ইতিহাসের অন্বয়
জাতি হিসেবে বাঙালির রয়েছে শৌর্য-বীর্যে সক্ষমতার সুদীর্ঘ ইতিহাস। বাঙালি যে একটি যুদ্ধজয়ী জাতি তার পরিচয় ঢালীখেলার মধ্যে উদ্ভাসিত। এই জাতির সুদীর্ঘ কালের সমর রীতি এবং তার প্রয়োগ কৌশলের ইতিহাস এই খেলার মধ্যে বিদ্যমান। ঢালীখেলা বাঙালির যুদ্ধ রীতির অজানা ইতিহাসের পরিচয় বহন করে। সামন্ত সমাজ পর্যন্ত বাংলার যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে লাঠি, ঢাল, সড়কি, বল্লম, টোটা ইত্যাদির ব্যবহার বিদ্যমান ছিল। সুলতানী আমল এবং মুঘল আমলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তরবারী ব্যবহৃত হতো। এবং ইংরেজ আমলে বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারের পরিচয় পাওয়া যায়। তবে বাঙালিদের মধ্যে সেই ব্যবহার ছিল সীমিত। বৃটিশ উপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠা পূর্বে এবং পরে বাঙালির সামরিক হাতিয়ার হিসেবে লাঠি এবং বল্লমের ব্যবহার ছিল সমধিক। এই সঙ্গে আত্মরক্ষার জন্য থাকতো ঢাল। এ কারণে বাঙালির যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে লাঠির ব্যবহারকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।

কথিত আছে যে, প্রতাপাদিত্যের পতনের পর তাঁর ৫২ হাজার ঢালী সৈন্যের সর্দার কালীদাস ঢালী তাঁর বাহিনীর একাংশ নিয়ে তৎকালীন ফতেহাবাদ বা ফরিদপুর দখল করেন। পরবর্তীকালে মধুমতি নদীর পশ্চিম পাড়ে নড়াইলসহ বেশকিছু অঞ্চল দখল করে নেন। যশোর রাজের পতনের পর মোঘল বাহিনীর অত্যাচার হতে আত্মরক্ষার জন্য অনেক মানুষ কালীদাস ঢালীর ঘোষিত অঞ্চলে আবাসন গ্রহণ করেন। এমনকি বহু হিন্দু-মুসলমানের সঙ্গে ঢালী সৈন্যদের আত্মীয়-স্বজনরা এসে স্থায়ী আবাস গড়েন। ঢালী সর্দারের এই প্রতাপ প্রদর্শনের ফলে তৎকালীন চাঁচড়ার রাজা কন্দর্প নারায়ণ সৈন্য নিয়ে উক্ত এলাকা দখল করতে এলে তিনি ঢালী বাহিনীর নিকট পরাজিত হন এবং পশ্চাদাপসরণ করতে বাধ্য হন।

বাঙালি ব্রিটিশ শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল। সারা বাংলাদেশের লাঠিয়ালেরা ব্রিটিশের নীল চাষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। বিভিন্ন অঞ্চলের লাঠিয়ালেরা বৃটিশ শাসক ও তাদের সহযোগী জমিদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করে। এই লড়াইয়ের প্রতিচিত্র বাংলা সাহিত্যের অনেক স্থানেই আলোচিত হয়েছে। কবি জসীম উদ্দীন তাঁর ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ কাব্যে এমনি একটি বিদ্রোহের কথা উল্লেখ করেছেন। যেখানে গদাই ভূঁয়া নামক একজন লাঠিয়ালের পরিচয় বিধৃত হয়েছে। এই লাঠিয়াল ‘মামুদপুর’ নামক একটি নীল কুঠিতে গিয়ে নীলকরদের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। এখানে বলা হয়েছে— ‘গর্জে উঠে গদাই ভূঁঞা, মোহন ভূঁঞার ভাজন বেটা, যার লাঠিতে মামুদপুরের নীল কুঠিতে লাগল লেঠা।’ এছাড়া বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলে নীলকরদের বিরুদ্ধে যে অন্দোলন হয় সেখানে নমঃশূদ্র লাঠিয়ালদের বীরত্মপূর্ণ অংশগ্রহণের কথা জানা যায়। গোপালগঞ্জের জোনাসুর কুঠিতে জয়চাঁদ ঢালী নামক একজন লাঠিয়াল সর্দার তাঁর লাঠিয়াল বাহিনী নিয়ে নীলকরদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। এর প্রেক্ষিত্রে নীলকরেরা তাঁদের মোকাবেলা করতে চাইলে তাঁরা সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এতে নীলকরদের শোচনীয় পরাজয় ঘটে।

উনবিংশ শতাব্দীতে বৃহত্তর যশোর-খুলনা অঞ্চলে ঢালী খেলার যথেষ্ট প্রসার ছিল বলে জানা যায়। কবিয়াল বিজয় সরকার মহাশয়ের পিতা নবকৃষ্ণ বৈরাগী বিখ্যাত ঢালী ছিলেন। ঢালী খেলায় তার যথেষ্ট খ্যাতি ছিল। তিনি বিভিন্ন স্থানে ঢালীখেলার নৈপুন্য দেখিয়ে সুনাম অর্জন করেন। ‘হাটবাড়িয়া’ জমিদার বাড়িতে ঢালীখেলা প্রদর্শন করে তার পুরস্কার অর্জনের কথা কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। কবিয়াল বিজয় সরকারের পিতার ঢালীখেলা সম্পর্কিত দক্ষতা সম্পর্কিত কিংবদন্তি থেকে অনুমান করা যায় যে, এই অঞ্চলে সমকালে এবং তার পূর্বে ঢালীদের যথেষ্ট প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল। বিভিন্ন অঞ্চলে তারা তাদের ক্রীড়া নৈপুন্য প্রদর্শন করতেন। এগুলো তখন জমিদারেরা পৃষ্ঠপোষকতা দিতেন বলেও ধারণা করা যায়। কারণ দেখা যায় নবকৃষ্ণ হাটবাড়িয়া জমিদারদের আহ্বানে ঢালীখেলা প্রদর্শন করতে গিয়েছিলেন।

উনবিংশ শতাব্দীতে তীর্থ যাত্রার সময় যাত্রীরা সঙ্গে লাঠিয়াল রাখতেন বলে জানা যায়। যারা সম্ভ্রান্ত শ্রেণির তারা তীর্থ যাত্রার সময় সঙ্গে করে লাঠিয়াল নিয়ে যেতেন। বিশেষ করে গঙ্গা স্নানের উদ্দেশ্যে তৎকালীন পূর্ববঙ্গ হতে বহরামপুর এবং মুর্শিদাবাদে তীর্থ যাত্রীরা যেতেন। এই সময় তারা পথে ডাকাত-দস্যু-তস্করদলের হাত হতে নিজেদের রক্ষার জন্য লাঠিয়ালদের সঙ্গে রাখতেন। এরই একটি চিত্র ফুঁটে ওঠে উপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়’র ‘মনের মানুষ’ উপন্যাসে। তিনি তীর্থ যাত্রীদের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন—
সব বড় দলেই একাধিক পাহারাদার থাকে। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদেরও লাঠি ধরতে হয়। লালুকেও যদু লাঠি খেলা শিক্ষা দেয় রোজ। সন্ধ্যার সময় যাত্রা বিরতি হলে কিছুক্ষণ যদুর সঙ্গে লালুকে লাঠির পাল্লা দিতে হয়।

ঢালীখেলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে জমিদার লাঠিয়ালদের অত্যাচারের কাহিনী। উনবিংশ শতাব্দী জুড়ে বাংলায় সামন্ত জমিদারগণ খাজনা পরিশোধে অপারগ কিংবা অস্বীকৃত প্রজাদের উপর লাঠিয়াল বাহিনী দ্বারা অত্যাচার করেছে। এছাড়া বিদ্রোহ দমনের জন্যও তারা লাঠিয়ালদের ব্যবহার করতো। এমনকি জমিদারেরা তাদের বাহিনীতে পাঞ্জাব হতে লাঠিয়াল নিয়ে আসতো। কলকাতার ঠাকুর জমিদারদের বাহিনীতেও এমন পাঞ্জাবি লাঠিয়াল রাখার কথা জনা যায়। উনবিংশ শতাব্দীর জমিদারদের প্রজা পীড়নে লাঠিয়ালদের ব্যবহারের এই চিত্র ধরা পড়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একই উপন্যাসে। কৃষক বন্ধু কাঙাল হরিনাথ মজুমদার যখন ঠাকুর জমিদারদের প্রজা পীড়নের বিরুদ্ধে তাঁর ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকায় সংবাদ পরিবেশন করেন তখন ঠাকুর জমিদারেরা তাঁর বিরুদ্ধে লাঠিয়াল পাঠান। এই সংবাদ ফকির লালন সাঁইজীর নিকট পৌঁছালে সাঁইজী নিজে তার অনুসারীদের নিয়ে জমিদারদের বিরুদ্ধে লাঠি ধরেন। তৎকালীন জমিদারদের প্রজার প্রতি নিপীড়নের বর্ণনা দিতে গিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লালন শিষ্য শীতল সাঁই’র মুখ দিয়ে বিবৃত করেন—
...সাঁই, অন্য এক জমিদার আমার বাড়ি পুড়ায়ে দিয়েছিল। পেয়াদারা আমার ভগিনীরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল, ঋণ শোধ করতে পরি নাই, পালায়ে এসেছি গ্রাম ছেড়ে। আজ এক জমিদারের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে প্রাণ দিলে আমি ধন্য হব। পূর্বপুরুষ আশীর্বাদ করবে।
বাঙালি যে সমর রীতি অনুসরণ করতো তার প্রতিচিত্র অজস্র রচনার মধ্যে স্থান পেয়েছে। এছাড়া বাঙালি পটুয়া, চিত্রকরদের অনেক ছবি, দেওয়াল চিত্র, ভষ্কর্যে, টেরাকোটা ইত্যাদিতে ঢালী খেলার চিত্র প্রতিভাত হয়েছে। হাজার বছর ধরে লালন করা সমর রীতিকে এই দেশের উত্তরপুরুষ ভুলতে পারেনি। তাই তাদের সৃজনশীলতার মধ্যে প্রপিতামহদের শৌর্য গাঁথাকে তুলে ধরেছে। এই সৃজনশীলতা হয়ে উঠেছে বাঙালীর বীরত্বপূর্ণ যাপিত জীবনকে বিস্মৃত না হওয়ার চেষ্টা। তাই এদেশের উত্তর পুরুষ প্রতিনিয়ত তাদের ইতিহাস অন্বেষণের যে চেষ্টা করে চলেছে তার মধ্যে পূর্বপুরুষের সমর রীতি ও কৌশল স্বাভাবিকভাবে ফুটে উঠেছে।

ঢালীখেলা ও বাঙালির সমর কৌশল
বাঙালির সময় কৌশল হিসেবে ঢাল, সড়কি, লাঠির ব্যবহার দীর্ঘ দিনের। মূলত এই সকল অস্ত্র দিয়েই এই ভূ-খণ্ডের যোদ্ধারা প্রতিপক্ষকে প্রতিহত করেছে। বাঙালিদের রাষ্ট্র নীতিতে যে উত্থান-পতন ঘটেছে তার সঠিক সন, তারিখ নিরূপণ করা জটিল। এখানকার শাসকেরা কখনো এছত্রভাবে শাসনকর্য পরিচালনা করতে পারেনি। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে সীমানা আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার স্থায়ীত্ব রক্ষা করতে হয়েছে। তবে খ্রীস্টপূর্বে ৩২৬ অব্দে মাসিডোনিয়ার সেকান্দার শাহ্ বা আলেক জাণ্ডার গঙ্গারিডি রাজ্যের বীরদের কথা অবগত হয়ে বিপাশা নদীর তীর হতে ফিরে যান তা সম্ভব হয়েছিল বাঙালি বীরদের সমর কৌশলের কারণেই। কিংবা মহাভারতের যুগে দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভায় বঙ্গের চন্দ্রসেন, পুণ্ড্রের বাসুদেব, তাম্রলিপ্তির রাজা উপস্থিত থাকার মতো সৌভাগ্য অর্জন করেন তা এই অঞ্চলের রাজনদের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং সমর কৌশলের দক্ষতার জন্য। এই অঞ্চলের পদাতিক সৈন্য, হস্তি ও অশ্বারোহী সৈন্য, নৌবাহিনী ইত্যাদি সৈন্য বাহিনীর জন্য বহিশত্র“রা সবসময় তটস্থ থাকতো। এই সকল বাহিনীর নিকট ঢাল, সড়কি, তরবারি, লাঠি ইত্যাদি অস্ত্র থাকতো। এই সমর দক্ষতার জন্যই হয়তো পাণ্ডবেরা কখনো এই দেশকে সুনজরে দেখেনি। এমনি বাঙালি আঞ্চলিক রজারা কৌরবদের সমর্থন করায় শ্রীকৃষ্ণ এদের প্রতি রুষ্ঠ হন। এমনি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পৌণ্ড্র রাজন বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণের হাতে নিহত হন। ভীম বাসুদেব ও চন্দ্রসেনের রাজ্য দখল করেন। এর পর হতেই বঙ্গ পুণ্ড্র পাণ্ডবদের দখলে আসে। এইমনি করে বাঙালি যুগে যুগে বিভিন্ন বিদেশী শক্তির কাছে পরাস্ত হয়েছে বটে কিন্তু কখনো নিচেষ্ট হয়ে রণেভঙ্গ দেয়নি। পালযুগ, সেনযুগ, ইসলামী যুগ, ইংরেজযুগ অজস্র বিদেশী শক্তির রণকৌশলকে বার বার বাঙালিদের মোকাবেলা করতে হয়েছে। এক এক যুগে এক এক গোষ্ঠীর নিকেট তাদের পরাভূত হতে হয়েছে। আত্মবিসর্জন আর অস্ত্রসমর্পনের মধ্য দিয়ে বীরবাঙালি বার বার অধীনস্ত হয়েছে কিন্তু তার উত্তরপুরুষ পূর্বপুরুষের গৌরবের স্মৃতি বিস্মৃত হয়নি। এ কারণেই তাদের গৌরবের সমর কৌশলগুলো পরবর্তীকালে ক্রীড়ার ছলে তারা সাধনা করেছে। অভিভূত করেছে পরবর্তী পরজন্মকে। তাই ইসলাম বিজয়ের পর পরস্যের গৌরবকে স্মরণ করতে গিয়ে নিজের ঐতিহ্যকে বাঙালি ভোলেনি। নিজের গৌরবগাঁথার বহির্ভারতীয় গৌরবকে ধর্মীয় অনুষঙ্গ যেমন মেনে নিয়েছে তেমনি স্মরণ করেছে নিজস্ব সংস্কৃতিকে।
ঢালি খেলা কৃত্রিম যুদ্ধের খেলা। এই খেলার মধ্যে যুদ্ধের কলা-কৌশল প্রদর্শিত হয়। প্রকৃত অর্থে এর মধ্যে সাংঘর্ষিক রূপ বিদ্যমান থাকে না। কৃত্রিমভাবে নানা ভঙ্গীতে সময় কৌশলের প্রতিচিত্র প্রতিফলিত হয়। বাঙালি যোদ্ধরা সমরাস্ত্রের আধুনিকায়ন ঘটাতে পারেনি। তাদের প্রতিনিয়ত বৈদেশিক প্রযুক্তির উপর নির্ভর করতে হয়েছে। তবে সামন্ত যুগে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে তারা লাঠি এবং লৌহনির্মিত বর্ষা, সড়কি, তলোয়ার, রামদা প্রভৃতি অস্ত্রের ব্যবহার করেছে। এই সকল অস্ত্র চালনায় বাঙালি ছিল সিদ্ধ হস্ত। আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারের ক্ষেত্রে এরা বিদেশী যোদ্ধাদের স্মরণাপন্ন হলেও লৌহ নির্মিত অস্ত্রে তারা যথেষ্ট পারদর্শী ছিলেন। লৌহ নির্মিত অস্ত্রের সঙ্গে চলতো লাঠির ব্যবহার।
বাঙালির সমর কৌশলের একমাত্র হাতিয়ার হিসেবে লাঠিকেই বিবেচনা করতে হয়। এই লাঠির ব্যবহারেই নানা কৌশলের মধ্যে দিয়েই এদের সামরিক দক্ষতা প্রতিপন্ন হতো। বাঙালি অধ্যুষিত ভীখণ্ডের সামন্ত প্রভুদের অজস্র পদাতিক সৈন্য থাকতো, যাদের একমাত্র অস্ত থাকতো লাঠি এবং বর্শা বা সড়কি। যুদ্ধ হতো সম্মুখে এবং যোদ্ধায় যোদ্ধায়। আদিবাসী আর আর্যদের উত্তরসূরী হিসেবে বাঙালিরা তীর-ধনুকের ব্যবহারও শিখেছিল কিন্তু সম্মুখ যুদ্ধে লাঠি আর সড়কির ব্যবহার ছিল অধীক। ফলে এক একজন যোদ্ধাকে লাঠি বা সড়কি চালনায় পারদর্শী হতে হয়েছে। এই উদ্দেশ্যে শিক্ষানবিশ যোদ্ধা গুরুর নিকট দীর্ঘদিন লাঠি চালনার কায়দা শিক্ষা করেছে। বিশেষ করে লাঠি চালনার ক্ষিপ্রতা শিক্ষা করাই ছিল এই পাঠের প্রাথমিক ভিত্তি।
লাঠি বা সড়কি কেবল পদাতিক সৈন্যরা ব্যবহার করতো তা নয়, নৌবাহিনীতেও লাঠি-সড়কির ব্যবহার হতো। নদীমাত্রিক বাংলাদেশে সামন্তীয় রাজাদের এক একটি নৌবাহিনী রাজধানীকে পাহারা দিয়ে রাখতো। এমনকি বহিশত্র“র আক্রমণ হতে রাজধানীকে রক্ষা করার জন্য চারি দিকে খাল খনন করা হতো। এই খালের মধ্য দিয়ে নৌবাহিনীর সৈন্যরা পাহারা দিতো। এছাড়া খালের পাড় জুড়ে পাথারা বৌকি বসানো হতো। এই সকল পাহারাদারদের হাতে থাকতো লাঠি, বল্লম, বর্শা, ঢাল ইত্যাদি। সামন্ত রাজাদের হাত হতে রাষ্ট্র সরাসরি ক্ষমতা গ্রহণ করার পর এই সকল সৈন্যদের প্রয়োজনীতা লোপ পায়। এর পরই পদাতিক সৈন্য এবং পাহারাদারদের স্থান রাষ্ট্রীয় নিযুক্ত ব্যক্তিরা পালন করতে থাকে। ফলে সৈন্যদের পূর্বতন স্মৃতি ক্রীড়া শৈলীর মধ্যে স্থায় পায়।


উপসংহার
সমকালে ঢালী একটি খেলার আদল নিয়ে বেঁচে আছে। অতীতে ঢালী খেলায় এই অঞ্চলের মানুষের যুদ্ধের ইতিহাসকে ধারণ করতো। প্রতিপক্ষকে প্রতিহত করার বহুরূপী সময় কৌশল এক একজন ঢালীর নিপুনতার মধ্যে ফুটে উঠতো। হাজার বছর ধরে চর্চিত হওয়া এই সমর কৌশল উনবিংশ শতাব্দীর শেষে বর্তমান ছিল। বাঙালি যোদ্ধরা বহিশত্র“কে মোকাবেলা করেছে আবার কখনো বা বহিশাসকেরা তাদের পরাস্ত্র করে নিজেদের সেনাবহিনীতে নিয়োগ দিয়েছে। সামন্ত জমিদারদের সহায়ক হিসেবে ঢালীরা হাতে ঢাল-লাঠি তুলে নিয়েছে। পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর কাঠামো পরিবর্তন হওয়ায় ঢালী বাহিনীর উপযোগ হ্রাস পেতে থাকে। এর ফলে দেশীয় এবং আদি যুদ্ধ কৌশল ক্রীড়া শৈলীর আদলে চর্চিত হতে থাকে। যে কৌশল ছিল এক সময় যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে প্রতিহত করার কৌশল সেটিই পরবর্তীতে কৃত্রিম যুদ্ধের মহড়ার আদল লাভ করে। এক দিকে রণকৌশলের আধুনিকায়ন, রাষ্ট্রনীতিতে বৃটিশের প্রত্যক্ষ প্রভাব দেশীয় সমর নীতিকে অকার্য করে দেয়। ফলে ধীরে ধীরে দেশীয় সমর কৌশল অপাংক্তেয় হয়ে ওঠে। অকার্যকর হতে থাকে ঢাল, লাঠি, সড়কির ব্যবহার। পূর্বপুরুষের সমর কৌশলকে উত্তর পুরুষ সহজাতভাবে চর্চা করার সুপ্ত অভিপ্সাকে লালন করেছে। ফলে সময়ের পরিবর্তন ঘটলেও এক পুরুষের সময় কৌশল অন্যপুরুষ ভুলতে পারেনি। গোষ্ঠী জীবনের যাপিত জীবনের সঙ্গে তার শৌর্যকে অনুসরণ করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ঢালী খেলাও গোষ্ঠী জীবনের সঙ্গে অন্বিত হয়ে গেছে। বাঙালি পূর্ব জীবনের সমর দক্ষতার স্মৃতি চিহ্নকে ভুলতে না পরায় বার বার সেই স্মৃতির রোমন্থন করেছে। এই রোমন্থন প্রক্রিয়া অটুট রাখতে এই ভূখণ্ডের মানুষ নানা মাধ্যমেরা অশ্রয় গ্রহণ করেছে। এই মাধ্যমে পূর্বকালের সমর কৌশলের প্রতিফলন ঘটেছে। এ কারণে চিত্র, সাহিত্যের মতো লোকক্রীড়ার মধ্যে বাঙালির সমর কৌশলের প্রতিচিত্র ধরা পড়ে।

(সমাপ্ত)
অনুপম হীরা মণ্ডল এর অন্যান্য লেখাসমূহ
Copyright © Life Bangladesh সাপলুডু মূলপাতা | মন্তব্য Contact: shapludu@gmail.com