Untitled Document
ঢালীখেলা
- অনুপম হীরা মণ্ডল


বাংলাদেশে ঢালীখেলা নামে একটি লোকক্রীড়া অনুষ্ঠিত হয়। গ্রামীণ মানুষের নিকট এই খেলা সমধিক প্রচলিত এবং জনপ্রিয় একটি খেলা। বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ইত্যাদি অঞ্চলে নানা আদল ও পরিচয়ে ঢালীখেলা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ অঞ্চলে এই খেলা প্রচলিত। বাংলাদেশের বিভিন্ন পালা-পার্বনে খেলাটি পরিবেশিত হয়। বিশেষ করে রথযাত্রা, দোলউৎসব, শারদীয় দুর্গোৎসব, কার্তিকপূজা, বাসন্তিপূজা, ঈদ, মহরম, নববর্ষ, বিজয় দিবস ইত্যাদি উৎসবে ঢালী খেলার প্রচলন দেখা যায়। বাংলাদেশে এক সময় সম্ভ্রান্ত পরিবারের বিয়েতে ঢালীখেলার দলকে বায়না করে আনা হতো। অন্যান্য আয়োজনের সঙ্গে ঢালী খেলোয়াড়গণ তাদের শিল্প কুশলতা পরিবেশন করতো। আনন্দ বিনোদন এই খেলার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। সমকালে খেলাটি বিনোদনের গুণধর্ম নিয়ে বিবর্তিত হলেও এটি বাঙালির সামরিক শক্তির অতীত ইতিহাসের সাক্ষ বহন করে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বীর্যবান বাঙালির হাজার বছরের সংহত জীবনচিত্র। যদিও বর্তমানে খেলাটি সেই ঐতিহাসিক চিত্রের প্রতিচিত্র হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়, কিন্তু এটি এই জনপদের যে ঐতিহাসিক দালিলিক প্রমান রেখেছে তা বিশেষ গুরুত্ববহ। বাঙালি জীবনের শৌর্য-বীর্যের ইতিহাস নিরুপণের ক্ষেত্রে ঢালীখেলার গুরুত্বকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। সেই প্রেক্ষিত বিচারে ফোকলোর পাঠের ক্ষেত্রে ঢালীখেলার পরিবেশন রীতি অধ্যায়ন জরুরী। সমাজ ইতিহাসের এই পাঠ নেওয়ার অভিপ্রায়ে ঢালীখেলার মধ্যে বিদ্যমান বাঙালির সমর কৌশলকে আত্মস্থ করার চেষ্টা করা হয়েছে। এই উদ্দেশ্যে যে এর মধ্য দিয়ে বাঙালি সমাজের অনেক অজানা ইতিহাসের সন্ধান করা সম্ভবপর হবে।

ঢালীখেলার পরিচয়
ঢালী খেলা একটি লোকখেলা। বাংলাদেশের গ্রামজীবনের সঙ্গে এই খেলার সংযোগ। বর্তমানে শহরেও এই খেলা বিভিন্ন পালা-পার্বনে অনুষ্ঠিত হয়, তবে তার কলাকুশলী সবাই গ্রাম থেকে আগত। সে অর্থে এর উদ্ভব-প্রসার গ্রামজীবনের সঙ্গে অন্বিষ্ট। বাঙালি সমাজে যুদ্ধের বা শরীর চর্চার খেলার মধ্যে যে সব খেলা প্রচলিত তার মধ্যে ঢালীখেলা অন্যতম। এটি একটি কৃত্রিম যুদ্ধের খেলা। এই খেলার মধ্য দিয়ে খেলোয়াড়দের শক্তি, বুদ্ধি ও কৌশলের পরিচয় পাওয়া যায়। দুই দল অস্ত্রধারী সৈনিকের মধ্যে এই খেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই খেলার শুরু এবং শেষ হয় প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে। এটি মূলত পদাতিক সৈনিকদের মধ্যকার যুদ্ধের মহড়ার প্রতিচ্ছবি। ঢালী অর্থাৎ যারা ঢাল ধরে রাখে। ঢাল হলো পদাতিক সৈনিকেদের আত্মরক্ষার এক প্রকার উপাদান। বেত, বাঁশ, কাঠ, পিতল, লোহা প্রভৃতি উপাদান দিয়ে এই ঢাল তৈরী হয়। ঢাল দিয়ে সৈনিকেরা প্রতিপক্ষের অক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করে। সেই অর্থে এই খেলায় ঢালধারীগণ অংশগ্রহণ করে বলে এর নাম ঢালীখেলা হয়েছে। সৈনিকদের হাতে থাকে বাঁশের লাঠি, ঢাল, রাম দা, মুগুর ইত্যাদি। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই খেলার প্রচলন দেখা যায়। যশোর-খুলনা অঞ্চলে একে ঢালী খেলা নামে অভিহিত করা হয়। রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ অঞ্চলে বলা হয় লাঠিখেলা। চট্টগ্রাম অঞ্চলে বলা হয় লাঠি খেলা। মানিকগঞ্জ অঞ্চলে বলা হয় ‘সর্দারবাড়ি’, ‘লাঠিবাড়ি’, ‘লাকড়িবাড়ি’, লাঠিখেলা ইত্যাদি। সিলেট এবং নরসিংদী জেলায় এই খেলাকে লাঠি খেলা নামে অভিহিত করা হয়। তবে নরসিংদী জেলার মাধবদী অঞ্চলে এটি ‘পাইক খেলা’ নামে পরিচিত।

ঢালীখেলার উদ্ভব
ঢালীখেলার খেলোয়াড়দের প্রধার অস্ত্র হলো বাঁশ-কাঠ নির্মিত লাঠি। আত্মরক্ষার প্রয়োজনে মানুষ আদিকাল হতে লাঠির ব্যবহার করে আসছে। শিকার, যুদ্ধ প্রভৃতি প্রয়োজনের হাতিয়ার হিসেবে লাঠির ব্যবহার সুদীর্ঘকালের। আদিম মানুষের নিকট শ্বাপদ এবং প্রতিপক্ষ গোত্র ছিল বিপদজনক। এদের হাত হতে আত্মরক্ষার প্রয়োজনে আদিম মানুষ আত্মরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে বিভিন্ন অস্ত্রের ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে লাঠি ছিল সর্বোত্তম ও সর্বাধিক ব্যবহৃত অস্ত্র। ধাতু নির্মিত এবং আগ্নেয়াস্ত্র আবিষ্কারের পূর্বে লাঠিই ছিল মানুষের অন্যতম হাতিয়ার। লাঠি দিয়ে তারা সহজে শত্র“ এবং স্বাপদের হাত থেকে নিজ প্রাণ ও নিজগোষ্ঠীকে রক্ষা করতো। ফলে লাঠি তাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আদিম মানুষে নিকট শিকার ছিল আবশ্যিক কর্ম। খাদ্য সংগ্রহের জন্য শিকার ছিল অনিবার্য। আদিকাল হতে শিকারের অস্ত্র হিসেবে লাঠির ব্যবহার হয়ে আসছে। আদিম মানুষের নিকট শিকার খুব সহজসাধ্য ছিল না। বিচিত্র বিপদ-আপদকে সঙ্গী করে তাদের শিকারে সফল হতে হতো। শিকারী হিসেবে জন্তুকে পরাস্ত করা ছিল সে যুগের মানুষের অন্যতম অভিপ্সা। জন্তুকে নিজেদের আয়ত্তে আনতে শিকারের কৌশল হিসেবে বিভিন্ন কৃত্রিম মহড়া পরিচালনা করতো। তাদের উদ্দেশ্য ছিল পূর্বমহড়ার মধ্য দিয়ে শিকারে সহজে সফল হওয়া। এই উদ্দেশ্যে গোষ্ঠীর সদস্যগণ মহড়ায় সংহতি প্রকাশ করতো। এই মহড়া ছিল সে কালের মানুষের বৈষয়িক উপযোগ নিরূপণের মাধ্যম। এই মহড়াগুলো কখনো কখনো নান্দনিক রূপ পরিগ্রহ করতো। এছাড়া মানুষের নিকট শিকারে সফল হওয়া ছিল আনন্দের। কখনো কখনো তারা শিকার পাওয়ার পর উল্লাস প্রকাশ করতো। কখনো বা সেই উল্লাসের অংশ হিসেবে শিকারী কিভাবে শিকার করা জন্তুকে হত্যা করেছে তা অভিনয় করে দেখাতো। আবার কখনো তারা কৃত্রিম শিকার বস্তু তৈরী করে শিকারের মহড়া দিত। তাদের মধ্যে এই বিশ্বাস ছিল যে এর মাধ্যমে তাদের শিকার পাওয়া সহজসাধ্য হবে। এই সকল অভিয়নয় রীতি নানা শৈলিতে অভিনব ক্রীড়া কৌশলের জন্ম দিয়েছে।

শিকার যুগে মানুষের নিকট শিকারই ছিল খাদ্য সংগ্রহের একমাত্র উপায়। শিকারের জন্য অস্ত্র হিসেবে গাছের ডাল, বাঁশ, বেত, নলখাগড়ার লাঠি, পাথরের বল্লম, ঢিল, জন্তুর হাড় ইত্যাদি ব্যবহৃত হতো। শিকার জীবন অতিক্রম করে মানুষ যখন ধীরে ধীরে কৃষির আবিষ্কার করতে শিখলো তখন মানুষের কাছে শিকারের উপযোগ অনেকাংশে কমে গেল। সংহত জীবনে গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষ বন্য পশুকে পোষ মানাতে শিখলো। ফলে খাদ্যের পশু হিসেবে মানুষকে শিকারের জন্য বাড়তি শ্রম ব্যয় করতে হতো না। কারণ খাদ্যের পশু সে সহজে হাতের নিকট পেয়ে যেতে থাকে। এই বাড়তি সময় সে জীবনকে বিভিন্ন নান্দনিক ক্রিয়ার মধ্যে অতিক্রম করতে শুরু করলো। এর ফলে আবির্ভাব ঘটে বিভিন্ন শরীরকৃত্যের। এরই একটি অনিবার্য রূপ হিসেবে ঢালীখেলা স্বদৃশ্য খেলার উদ্ভব ঘটে।
ঢালীখেলা আর লাঠিখেলা সমধর্মী। মূলত লাঠিখেলারই অন্য নাম ঢালীখেলা। খেলা দুটির মধ্যে সাদৃশ্য থাকলেও কিছুটা পার্থক্য লক্ষ করা যায়। উদ্ভবের দিক থেকে দুটি খেলার মধ্যে লাঠিখেলা পূর্ববর্তী। লাঠিখেলাই সামন্তযুগে ঢালীখেলার রূপলাভ করে। লাঠিখেলার প্রচলন আদিমকালে, কিন্তু ঢালীখেলার উদ্ভব অপেক্ষকৃত অর্বাচীন কালে। সামন্তযুগের অশেষ হিসেবে ঢালীখেলা সামন্তযুগের ঐতিহ্যকে ধারণ করে আছে। এই যুগে পদাতিক সৈনিকদের ঢালী সৈন্য হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। ঢালী সৈনিকেরা থাকতো যুদ্ধ ক্ষেত্রের সামনে। সামন্তযুগের রাজন্যবর্গ তাদের সৈন্য বাহিনীতে ঢালী সৈন্যদের নিয়োগ দিতেন। জনশ্র“ত আছে যে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্য তাঁর সৈন্য বাহিনীতে বিশাল এক ঢালীবাহিনী গড়ে তোলেন। তাঁর এই ঢালী সৈন্যদের মধ্যে বাঙালি নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের সদস্যই ছিল বাহান্ন হাজার। এই বিশাল বাহিনীর সদস্য এক একটি সামন্ত রাজাকে ও রাজ্যকে পাহারা দিয়ে রাখতো। রাজা ছাড়াও এদেশের জমিদারগণ তাদের সম্পত্তি রক্ষার এবং নিরাপত্তার জন্য ঢালী সৈন্য দল গড়তেন।

(চলবে)



বাম থেকে ডানে
ঢালী খেলায় বাদ্য যন্ত্রের ব্যবহার | মহড়া | ঢালী খেলায় অলংকারের ব্যবহার
অনুপম হীরা মণ্ডল এর অন্যান্য লেখাসমূহ
Copyright © Life Bangladesh সাপলুডু মূলপাতা | মন্তব্য Contact: shapludu@gmail.com