Untitled Document
ঝুমুর ঝুমুর পুতুল নাচ
- সাইমন জাকারিয়া
আজ থেকে প্রায় এক যুগ আগে কুষ্টিয়া শহরে প্রথম পুতুল নাচের প্যান্ডেলে ঢুকি, তার বছর পাঁচেক পর দ্বিতীয়বার পুতুল নাচের প্যান্ডেলে ঢুকি ধামরাইয়ের রথের মেলায়। দুটি অভিজ্ঞতার মধ্যে ফারাক ছিল বিস্তর। প্রথমবার দেখেছি কেবলই পুতুলের নাচ এবং তা কাহিনীভিত্তিক, দ্বিতীয় দেখার অভিজ্ঞতাটা রীতিমতো সাংঘাতিক। ধামরাইয়ের রথের মেলায় পুতুলের সেই নাচ দেখতে গিয়ে তো আমি অবাক, ও আল্লা এ তো দেখছি রক্তমাংসের মানবীদের নাচ। তাদের নাচের ভঙ্গিগুলোও রগরগে, নাচের সঙ্গে যে গানগুলো নর্তকীর পাশে বসে একজন নারীশিল্পী গাইছিল, তার ভাষাটাও গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো। পুতুল নাচের মঞ্চের সামনে ছোট নাচের স্থান, তার দুই পাশে দুটি বাঁশের খুঁটি, এই দুটি খুঁটি নর্তকীরা তাদের ঊরুর মাঝখানে নিয়ে নেচে নেচে দর্শকের দিকে গানের সঙ্গে উত্তেজনা ছুড়ে দিচ্ছে, এই দৃশ্য দেখে নির্বিকার থাকাটা সত্যিই মুশকিল! তবু আমি রুদ্ধশ্বাসে সত্যিকারের পুতুল নাচ দেখার অপেক্ষা করি। শেষ পর্যন্ত ‘পুতুল নাচ’ হয়, তবে তা নামে মাত্র, যার সময়সীমা দুই মিনিট। আইটেম হিসেবে এই পুতুল নাচে দেখানো হয় একটি নৌকা বাইচ এবং একটি ঘোড়াদৌড়। ব্যাস, একটি আসর এখানেই শেষ। মাইকের ঘোষণায় পরের আসর শুরুর ইঙ্গিত দিয়ে আমাদের বের হয়ে যেতে বলা হয়। অগত্যা পুতুল নাচের সে আসর থেকে বেরিয়ে আসি ঠিকই, কিন্তু মাথার ভেতর থেকে শিশু ও বয়স্কা নারীদের সেই উত্তেজক ভঙ্গির নৃত্যগুলোকে খুব সহজে ঝেড়ে ফেলতে পারি না।



পুতুল নাচের বর্তমান চিত্র তা হলে কী? যে পুতুল নাচের উল্লেখ কৃত্তিবাসী রামায়ণে, কাশীরামদাসী মহাভারতে, কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃতে আছে এবং গীতগোবিন্দ শ্রীকৃষ্ণকীর্তনকেও প্রাজ্ঞ পণ্ডিত সুকুমার সেন তাঁর নট নাট্য নাটক গ্রন্থে পুতুল নাচের পালা(!) বলে উল্লেখ করেছেন। সেই পুতুল নাচের বর্তমান চেহারার কোথাও কি ওইসব গুণীকাব্যের স্পর্শ একটুও থাকবে না? যেকোনো শিল্পীরীতিই ক্রমপরিবর্তনের ধারায় এক সময় নতুনরূপ ধারণ করতে পারে।

‘পুতুল নাচ’ নিয়ে লেখার জন্য একবার কুষ্টিয়ার ইসলামীয়া কলেজ মাঠের একটি মেলায় গিয়ে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান-চিত্রকোটের আব্দুর রহিম পরিচালিত দি রয়েল পুতুল নাচ দলের পুতুল নাচ দেখি এবং তার কথা-গান টেপরেকর্ডারে ধারণ করি। ছবির জন্যে ব্যবহার করি ভাগ্নে অনাবিলের ক্যামেরা। কিন্তু তার কিছুদিন যেতেই কুষ্টিয়া থেকে আমার আপা ফোন করে জানান ক্যামেরার পুরো ফিল্ম নষ্ট হয়ে গেছে।



আমি অপেক্ষা করি নতুন করে পুতুল নাচ দেখবার। এর মাঝে বাংলা নববর্ষ আসে। আমার কলাবাগানের বাসার পাশেই অবস্থিত ধানমন্ডি মাঠের বৈশাখি মেলাতে ঢাকার নবাবপুর রোডের ‘উজ্জ্বল ঝুমুর ঝুমুর পুতুল নাচ’ দলের আসর বসে। পুতুল নাচের আসরটির তিনদিকে ঢেউটিনের ঘের আর টিকিট কাউন্টার এবং প্রবেশ-বাহির পথের সামনের দিকটা বিচিত্রবর্ণ কাপড়ে ঢাকা, যার ওপরের দিকটায় বাঁশের আড়ার সঙ্গে ছোট ছোট বর্গাকৃতির টিনের ক্যানভাসে আঁকা বাংলার ঐতিহ্যবাহী পটচিত্র টানানো। প্রবেশ ও বাহির দুটি গেটেই যথাক্রমে লতা-পাতা-ফুল অঙ্কিত চিত্রের ওপর বাংলার দুটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার এবং মুখোমুখি দুটি ঘোড়ায় চেপে যুদ্ধরত দুই যুবরাজ-চিত্রের অবস্থান। প্যান্ডেলের ওপর দোচালা ঘরের মতো হলুদ, সবুজ, লাল কাপড়ের সামিয়ানা টানানো। মাইকটি বাঁধা আছে প্যান্ডেলের শীর্ষচালা বরাবর। বাইরে থেকে এসব কিছু দেখে নেওয়ার মধ্যে মাইকে ঘোষিত হয়, ‘বাইরের দর্শক ভাইবোনদের বলছি, যারা পরবর্তী শো দেখবেন, টিকেট লন, মাত্র দশ টাকা, হাতের ডান দিককার গেট খুলা আছে, আস্তে আস্তে টিকেট হাতে লইয়া আইবেন।’ আমাদের টিকিট কাটা ছিল, তাই দেরি না করে পুতুল নাচের প্যান্ডেলে ঢুকে পড়ি। সঙ্গে কাগজ-কলম, টেপরেকর্ডার এবং ধার করা ক্যামেরা। দর্শক বসার ফাঁকে আমি পেছনে গিয়ে দলের পরিচালক বাবুল হোসেনের কাছে আমার উদ্দেশ্য জানিয়ে আসি। দর্শকরা বেঞ্চ এবং গ্যালারিতে বসে গেলে মঞ্চের উত্তরপাশে ড্রামবাদক রামজয় বসে জোরালোভাবে ড্রাম বাজাতে শুরু করে। ড্রামের সঙ্গে মঞ্চের দক্ষিণ পাশ থেকে লক্ষণ সরকার কি-বোর্ডে সুর তোলে এবং এ আসরের পুতুলের কথোপকথনকারী ও গায়ক আমেনা বেগম মারকেজ বা ঝুমঝুমি বাজায়। ড্রাম, কি-বোর্ড ও ঝুমঝুমির এই মিশ্র বাদনে সম্ভবত দর্শকদের আসরের দিকে নিবিষ্ট করা হয়। এরপর পরিচালক বাবুল হোসেনের ঘোষণা, ‘এখনই আমাদের আসল পুতুল নাচ শুরু হবে, তার আগে বিশেষ আকর্ষণ! গান গেয়ে নাচবে প্রিন্সেস রোকসানা।’ মঞ্চে এসে সোনালি রঙের সালোয়ার-কামিজ পরা, ওড়না গলায় ঝোলানো, চুলে বেণী করা কিশোরী রোকসানা (১২) বাবুল হোসেনের কাছ থেকে মাইক্রোফোন হাতে তুলে নিয়ে গাইতে থাকল আবেদনময়ী বাংলা ছবির গান-

‘তুমি কই, তুমি কই?
আমার বুকের মধ্যেখানে।
এই কথা তুমি ছাড়া আর কেউ না যেন জানে।
তুমি কই তুমি কই?
আমার বুকের মধ্যেখানে।’

ড্রামের ধুমধাড়াক্কা রিদম আর কি-বোর্ডের তেজি সুরের মধ্যে রোকসানা অল্প-স্বল্প দেহ দুলিয়ে বাংলাদেশের হাল আমলের ব্যান্ডশিল্পীদের মতো তাল ধরে ধরে নাচে এবং গায়-

‘এই ভুবনে আমি তোমাকে ওগো বিশ্বাস করেছি।
সেই বিশ্বাসে এমন করে তাই হাতটি ধরেছি
আমি আমার যায় যে ভুলে
প্রিয়া যায় না তোমায় ভুলে।
এই কথা তুমি ছাড়া আর কেউ না যেন জানে...।’
আর কিছু কথায় রোকসানার প্রথম গানটি শেষ হতেই ঘোষিকা আমেনা বেগম মাইক্রোফোন হাতে বলেন, আরেকটু পরেই দেখতে পারবেন পুতুলের নাচ-গান, পুতুল কী করে নাচ গান করে?
ড্রামে আবার ঝঙ্কার ওঠে, রোকসানা পুনরায় নাচে-গায়-
‘নাই টেলিফোন নাইরে পিয়ন
নাইরে টেলিগ্রাম
বন্ধুর কাছে মনের খবর কেমনে পৌঁছাইতাম।
শিমুল যদি আমি হইতাম শিমুলেরই ডালে
এ রূপ আমার শোভা পাইত ফাগুনেরই কালে।’

পুতুল নাচের মঞ্চে উঠে কিশোরী রোকসানা নাচ-গানের সুর, তাল ও কথায় জনপ্রিয় গানগুলোতে তার নিজের মতো কিছুটা ভাষাভঙ্গির প্রয়োগ করে, যাতে জনপ্রিয় গানগুলোর সুনির্দিষ্ট গায়কীর বাঁধ ভেঙে গানগুলো মূহুর্তে পুতুল নাচের আসরের গায়কীতে পরিণত হয়। রোকসানার দ্বিতীয় গানটি শেষ হতেই সে মঞ্চ থেকে বিদায় নেয়। এবার পুতুল নাচের মূল মঞ্চের পর্দা খুলে যায়। লাল জরির কাপড় পরা দুটি মেয়েপুতুল কেঁপে কেঁপে বেরিয়ে আসে পুতুল নাচের মূল মঞ্চে। পুতুলের ভাষায় ‘চিকচিক’ করে মেয়েপুতুল দুটি মুখোমুখি বসে কথা বলে। একটি পুতুল আরেকটি পুতুলকে ‘চিকচিক’ করে যা বলে, তা পাশ থেকে দর্শকদের জন্য অনুবাদ করে দেয় মঞ্চের উত্তরপাশে বসা ঝুমঝুমি ও মাইক্রোফোন হাতের আমেনা বেগম। একটি পুতুল অন্য পুতুলকে বলল, ‘চিকচিক চিকচিক’। পাশ থেকে তার ভাষাটি অনুবাদ করে আমেনা বেগম বলল, ‘ও দিদিমণি, আসরে যখন আইছেন, কিছু নাচ-গান করবেন।’ অন্য পুতুল জবাবে বলল, ‘চিকিচিকি।’ মানে করল আমেনা বেগম, ‘নাচগান করব?’ উত্তরে আগের পুতুলটি বলল, ‘চিকা চিকা’ (ভালো করে নাচগান করবেন, বকশিশ পাইবেন, দর্শক যায়গা)। সঙ্গী পুতুলের এই কথা শুনে পুতুলটি নেচে নেচে গাইতে শুরু করল, ‘পাশের বাড়ির ওই ছেলেটা, আমায় কহে প্রেমের কথা ॥’ ড্রামে-ঝাঝে তাল পড়ে। রোকসানা নৈপথ্য থেকে গায়- ‘বাবাই বলে দারোগা। বাবাই বলে দারোগা। আমি যখন পড়তে বসি চেংড়া মারে উঁকি ঝুঁকি॥’ ড্রামে আবার তাল ওঠে। ‘বাইজা গেল বারোটা। বাইজা গেল বারোটা।’ একটি পুতুলের নাচ-গান দেখে অন্য পুতুলটিও নেচে গেয়ে বিদায় নেয়। এরপর একে একে ঘোড়সওয়ার ‘ও বাবারে দেইখ্যা যারে ডিসকো ঘোড়ার নাচ’, গানের একটি পুতুল এবং ‘পাগল মন, মন রে মন কেন এত কথা বলে’, গানে বেহালা হাতে প্যান্ট-শার্ট পরা আরেকটি পুতুল এসে নাচ-গান করে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুতুলগুলোর নড়ন-চড়নের মধ্যে আনন্দ উপাদেয় ক্রিয়া দেখা যায়।

এতক্ষণে পুতুল নাচের আসরে তেমন কোনো আখ্যানের ছোঁয়া পেলাম না। আখ্যানের জন্য অপেক্ষায় বসে আছি। এ পর্যায়ে মঞ্চে আসে লাল শাড়িতে একটি মেয়েপুতুল। পাশ থেকে আমেনা বেগম সে পুতুলকে প্রশ্ন করে, ‘ও দিদিমণি, আপনি কই থেইকা আইলেন?’ পুতুল জবাব দেয়, ‘চিকুচিকু।’ আমেনা খাতুন পুতুলের ভাষা বোঝে-‘ও-কলকাতা শহর থেইকা। তা আপনার নাম?’ পুতুল বলে ‘চিকিচিকি’। আমেনা বেগম উত্তর পেয়ে বলেন, ‘আপনার নাম জগৎবিখ্যাত ভানুমতি সিং। দিদি, সবার মুখ দেখতেছি হাসিখুশি, আপনার মুখটা এত বেজার ক্যান, বিয়ে-শাদি হয় নাই তাই?’ পুতুলটি মুখ লুকায় এবং বলে- ‘চিকচিকা’। ‘ও তুমি বলতে পারো না। তাহলে আপনার বিয়ার বয়স যায়। কড়কড়া বয়স।’ পুতুল মেয়ে এবার সম্মতিতে বলে ওঠে, ‘চিকাচিকু’। ‘হ্যাঁ হ্যাঁ দিদি’। আমেনা বেগম পুতুলের কথায় দর্শকদের দেখিয়ে বলে, ‘তাহলে দেখো কোন ছেলেটা পছন্দ হয়। দেখো, ভালো করে দেখো। পুতুল মেয়ে মঞ্চ থেকে দর্শকদের দিকে তাকায়। এ সময় মঞ্চে উঠে যায় সাত বছরের একটি ছেলে, নাম শেখ নাদিম। তাকে দেখামাত্র আমেনা বেগম বলে, ‘হু, ও দিদিমণি, ওই যে একখেন বিয়ের বর আইছে, ভালো করে দেখে নাও।’ পুতুল মঞ্চে আসা পাত্রের দিকে তাকায়। আমেনা বেগম এর মধ্যে মঞ্চে আসা পাত্রকে বলে, ‘ও কর্তা, আপনি বিয়া করতে আইছেন, আপনার সব রেডি, øো-পাউডার, লিপিস্টিক, আলতা, শাঁখা, সিঁদুর, মালা-এসব কিছু আছে তো?’ পাত্র তো মঞ্চে এসেছিল খালি হাতে, তাই সে মাথা ঝাঁকিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে যেতে উদ্যত হয়। আমেনা বেগম তাকে তখন কথা দিয়ে থামায়ে, ‘আরে আরে যাবেন না।’ পাত্র দাঁড়িয়ে যায়। এবার পুতুলকে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘ও দিদিমণি, বরটি কেমুন দেখলে, পছন্দ হয়েছে তো?’ পুতুল বলল, ‘চিকচিক।’ ‘তাহলে পছন্দ হয়েছে। এবারে তাহলে মালাবরণ করে বিয়া পড়াইয়া দিই।’ পুতুলকন্যা ভানুমতি ভেতরে গিয়ে মালা হাতে বেরিয়ে আসে এবং নিজ হাতে মানুষ বর শেখ নাদিমের গলে মালা পরিয়ে দেয়। নাদিমও পুতুলের গলে মালা পরিয়ে দেয়। এসময় নৈপথ্য থেকে রোকসানা গাইতে থাকে, ‘এত দিন ছিলা রে মালা মালাকারের দোকানে। আজ কেন আইছো রে মালা ভানুমতির ঘরে। কি-নারে।’ গানের সঙ্গে পুতুল ও মানুষের মালা বিনিময় হয়ে গেল, আমেনা বেগম তাদের বাসর ঘরে পাঠিয়ে দেয়-‘ও দিদিমণি, বিয়া তো হইয়া গেল, এখন বর নিয়া বাসর ঘরে চলে যাও, আর তুমার নানীরে একটু আসরে পাঠায়ে দেও।’ বর নিয়ে ভানুমতি পর্দার আড়ালে চলে যেতেই মঞ্চে আসে পুতুলকন্যার বুড়ি নানী। আমেনা বেগম তার সঙ্গে কথা বলে, ‘ও নানী নানী, কিছু কি শুনছো?’ পুতুল নানী বলে, ‘চিকা চিকা।’ উহু না। ‘শুনো নাই। তোমার নাতি ভানুমতি কি করেছো জানো?’ ‘চিক চিক।’ কী? ‘এই মেলার মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে ছেলেটাকে পাইয়া, একদম কোটে যাইয়া, একেবারে কোটম্যারেজ কইরা বিয়া পুষছে...।’ পুতুল নানী বেশ রেগে যায়, ‘চিকু চিকু।’ ‘এই কুটনা, মুখ সামলাইয়া কথা কইবা, ভানু ভানুরে... ভানু কই।’ আমেনা বেগম নানীকে বুঝ দেয়-‘ও নানী, আমি কুটনামু করছি না, তুমার নাতি এখন বাসর ঘরে, তুমিও যাইয়া বাসর ঘরে আমোদফুর্তি করো গা, যাও।’ নানীর রাগ এবার পড়তে শুরু করে। নৈপথ্য থেকে রোকসানা গাইছে তখন, ‘নানী গো নানী, করেছে ভানু বিয়া...।’ নানী আসর থেকে চলে যায়।

আসরটি এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু তা হয় না, এরপরও পুতুলদের সাপখেলা, ভূত খেলা এবং সবশেষে থাকে নৌকা বাইচের আয়োজন। তবে বাইচের নৌকা দুটি শেষ মূহুর্তে কুমিরের আক্রমণের শিকার হয়ে অসময়ে তলিয়ে যায়। তাই ‘গঙ্গার তরঙ্গ ঢেউ খেলে লো বুবুজান, গঙ্গায় তরঙ্গ ঢেউ খেলে’ গানটি দিয়েই ‘উজ্জ্বল ঝুমুর ঝুমুর পুতুল নাচ’ দলের একটি আসর শেষ হয়। শুরু হবে পরবর্তী শো, মাইকের ঘোষণায় দর্শকদের সঙ্গে আমরাও বেরিয়ে আসতে থাকি। তার আগে দলের সকলের সঙ্গে কথা বলে আসি।
‘উজ্জ্বল ঝুমুর ঝুমুর পুতুল নাচ’ দলের বয়স সাত-আট বছর। নবাবপুর রোড, ঢাকা এই দলের ঠিকানা। এ দলের বাঁধা পুতুল নাচিয়ে শেখ নিজাম (৫৫) এবং পুতুল নাচের কথক আমেনা বেগম (৪০) দুজনে বৈবাহিকসূত্রে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে ৩০ বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। তাদের সাত বছর বয়সী সন্তান শেখ নাদিমও জন্ম থেকে পুতুল নাচের সঙ্গে আছে। তিনজনে মিলে তারা ‘পেমেট’ বা সম্মানী পান প্রতিদিন ৫০০ টাকা। খাওয়া দাওয়া এই দলের সঙ্গে বাধা হলেও মাঝে মধ্যে তারা অন্যান্য দলের হয়েও কাজ করেন। বিয়ে, গায়ে হলুদ, মুসলমানি, জন্মদিনের অনুষ্ঠানেও পুতুল নাচের আয়োজনের কথা জানান তারা। তবে আসরে বর্তমানে পালা পরিবেশনার পরিবর্তে খণ্ড খণ্ড ঘটনার বা ক্রিয়ার পুতুলই তারা নাচিয়ে থাকেন বেশি। আর পুতুল নাচের আসরে পুতুলের সঙ্গে মানবশিশুর বিয়ে প্রসঙ্গে তারা বলেন, ‘এটা একটা আনন্দ। মানুষ আনন্দ পায়, তাই করি, আমাদেরও একটা ছোট ছেলে আছে, তাই।’ কাঠ কাপড়ের পুতুলের সঙ্গে রক্ত-মাংসের মানুষের সম্পর্ক বিধান আমাকে অনেকদিন ভাবিয়েছে, এখনো ভাবাচ্ছে। বস্তুর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যদি এভাবে সঙ্গীত নাচের সুরে আনন্দময় হয়ে ওঠে, তাহলে তো বেশ মজা হয়।



পুতুল নাচের আসর দেখা আমার এখানেই শেষ হয় নি। এরপর আমি ফরিদপুরের তুলাগ্রামের হিরু পরিচালিত টপটেন পুতুল নাচ দলের পুতুল নাচ জসিমউদ্দিন মেলাতে এবং এ দেশের সব থেকে বিখ্যাত পুতুল নাচিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ধন মিয়ার দি রয়েল বীণা পুতুল নাচ দলের পুতুল নাচ দেখি বগুড়াতে এবং পরবর্তীতে তাঁর বাড়িতে গিয়ে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে আসি। সম্প্রতি শুনেছি ধনমিয়া দেহ রেখেছেন। বর্তমান লেখাটিতে তাঁকে স্মরণ করি ভক্তিভাবে এবং তাঁরই আত্মার প্রশান্তি কামনা করি।
সাইমন জাকারিয়া এর অন্যান্য লেখাসমূহ
Copyright © Life Bangladesh সাপলুডু মূলপাতা | মন্তব্য Contact: shapludu@gmail.com