Untitled Document
খেতুর মেলা
- অনুপম হীরা মণ্ডল
রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলীর খেতুর ধাম অবস্থিত। এই ধামে প্রতিবছর বাংলা কার্তিক মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত এখানে চলে মেলা ও সংকীর্তন। প্রেমতলীতে গৌরাঙ্গবাড়ি নামে একটি বৈষ্ণবীয় তীর্থস্থান অবস্থিত। এই বাড়িতে ১৫৩১ খ্রিস্টাব্দের বাংলা মাঘ মাসের শুক্ল পঞ্চমী তিথিতে জন্মগ্রহণ করেন ঠাকুর নরোত্তম দাস (১৫৩১-১৫৮৭)। তার তিরোভাব তিথি উপলক্ষে এখানে চারদিন ব্যাপি মেলা ও মহোৎসবের আয়োজন করা হয়। দেশ-বিদেশের হাজার হাজার ভক্ত এখানে মহোৎসবে যোগদান করে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, আসাম, ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা, মণিপুর ইত্যাদি রাজ্য থেকে বৈষ্ণব ভক্তরা এখানে এসে সমাবেত হয়। দেশ-বিদেশের হাজার হাজার ভক্তের আগমনে মুখরিত হয়ে ওঠে খেতুর ধাম। বৈষ্ণব ভক্তদের সঙ্গে মিলিত হয় সন্ন্যাসী ও বাউল ভক্তরা। আসামের কামাক্ষা থেকে প্রতিবছর এখানে সন্নাসীদের আগমন ঘটে। ভারত ছাড়াও নেপালের পুণ্যার্থীরা এই মেলায় আসে। এছাড়া আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইস্কন)-এর উদ্যোগে ফ্রান্স, আমেরিকা, নেপাল, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি দেশ থেকে ভক্তরা এই মেলায় আসে। হাজার হাজার ভক্তের পদচারণা আর প্রার্থনায় প্রেমতলী আর গৌরাঙ্গবাড়ি মুখরিত হয়ে ওঠে। মেলা উপলক্ষে তৃতীয় দিনে গোদাগাড়ী এলাকায় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ২৪ ঘণ্টার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এই মেলাকে ‘বৈষ্ণবের মহামিলন’ বলে অভিহিত করা হয়।

ঠাকুর নরোত্তমের জন্ম সম্পর্কে কিংবদন্তী হলো— ‘একবার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু পার্ষদ ভক্তদের নিয়ে নদীয়ায় মহানাম কীর্তন করছিলেন। হঠাৎ মহাপ্রভুর চোখ প্রেমতলীর খেতুর গ্রামের দিকে গেল। মহাপ্রভু তৎক্ষনাৎ ‘নরোত্তম, নরোত্তম’ বলে কেঁদে উঠলেন। এর পর মহাপ্রভু প্রয়াণের বহু বছর পর পদ্মা নদীর তীরে গোপালপুর নগরের রাজা রাজা কৃষ্ণানন্দ ও শ্রী নারায়ণী দেবীর ঘরে মাঘ মাসে শুক্ল পঞ্চমীতে শ্রী নরোত্তম দাস ঠাকুর জন্মগ্রহণ করেন। বয়োবৃদ্ধি হলে নরোত্তম ঠাকুর ভক্তমুখে শ্রী গৌরসুন্দর ও নিত্যানন্দের মহিমা শ্রবণ করে পরম আনন্দ অনুভব করলেন। গৌরলীলা স্থান দর্শনের অভিলাষে সংসার ত্যাগ করে বৃন্দাবন ধামে গমন করলেন। সেখানে শ্রী লোকনাথ গোস্বামীর কাছে রাধাকৃষ্ণ মন্ত্রে দীক্ষা গ্রহণ করলেন এবং শ্রীল জীব গোস্বামীর কাছে বৈষ্ণব দর্শন শিক্ষা লাভ করলেন। এরপর ঠাকুর এক বিপ্রের ধানের গোলা থেকে গৌর-বিষ্ণুপ্রিয়া বিগ্রহ উদ্ধার করে খেতুরে প্রতিষ্ঠা করলেন।’

মেলার সময় গৌরাঙ্গ বাড়ির চারিদিক থেকে লোক আসতে থাকে। ভক্তদের অনেকে সদলবলে কীর্তন করতে করতে উৎসব প্রাঙ্গনে ঢোকে। তাদের মধ্যে কেউ মৃদঙ্গ, কেউ করতাল, শঙ্খ, হারমোনিয়াম, বেহালা ইত্যাদি বাজিয়ে নগর কীর্তন করতে করতে উৎসব স্থলে প্রবেশ করে। চার দিন ব্যাপি নামকীর্তন চলে। তৃতীয় দিন হলো অষ্টপ্রহর নামকীর্তনের নির্ধারিত দিন।

শ্রীচৈতন্য তিরোধানের পাঁচ দশক পর পদাবলী কীর্তনের সূত্রপাত হয়। নরোত্তম ঠাকুর এই প্রথাবদ্ধ পদাবলী গায়নের সূত্রপাত করেন। তিনি ১৫৮৩ মতান্তরে ৮৪ খ্রিস্টাব্দে খেতুরিতে এক বৈষ্ণব মহাসম্মেলনের আয়োজন করেন। এই সম্মেলনে তিনি সর্বপ্রথম গৌরচন্দ্রিকা গায়নসহ প্রণালীবদ্ধভাবে লীলাকীর্তন গাওয়ার প্রস্তাব করেন। এই উৎসবে উপস্থিত বৈষ্ণব কবি, দার্শনিক, রসবেত্তা ও গায়কেরা সেটি অনুমোদন করেন। তখন থেকে খেতুরি উৎসব ব্রজবুলির পদ এবং গৌরচন্দ্রিকা গায়নসহ প্রণালীবদ্ধ লীলাকীর্তনের প্রধান অঙ্গ হয়ে ওঠে। নরোত্তম যে পদাবলীকীর্তন প্রবর্তন করেন তার বৈশিষ্ট্য হলো— লীলাকীর্তনের পূর্বে গৌরচন্দ্রিকা গাওয়া, পরিবেশনের জন্য যে পালা গঠিত হবে তাতে পদকর্তাদের মর্মানুসারী পদ সংকলন, মৃদঙ্গের ব্যবহার, তালছন্দ রচনা এবং বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কীর্তন আলাপের মধ্য দিয়ে কীর্তন পরিবেশন। এভাবে নরোত্তম প্রবর্তিত কীর্তনের একটি আলাদা ঘরানা তৈরী হয়। খেতুরি ছিল রাজশাহীর গড়েরহাটী পরগণার অধীন। উৎস স্থলের নামানুসারে এই কীর্তন ধারার নাম হয় গরানহাটী বা গড়েরহাটী ঘরানা।

চরিদিক থেকে লোক মেলায় আসতে থাকে। ভক্ত, দর্শনার্থী, সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষক, গবেষক, ছাত্রসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ মেলায় আসে। এছাড়া এই মেলায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পেশাজীবী শ্রেণি তাদের উৎপাদিত দ্রব্যাদি বিক্রির জন্য নিয়ে আসে। মেলা প্রাঙ্গনের চারি দিক ঘিরে থাকে নানা প্রকার দোকান। এক এক দিকে এক এক প্রকার দোকানীদের পসরা সাজিয়ে বসতে দেখা যায়। কোথাও বাদ্যযন্ত্র বিশেষ করে মৃদঙ্গ, পূজার উপকরণ ও ধর্মীয় গ্রন্থ বিক্রি হয়। এই সব স্থানে বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে হিন্দু ধর্মের উপর তাদের প্রচারমূলক গ্রন্থ বিক্রি করে। অন্য দিকে থাকে নানা প্রকার খাবারের দোকান। মাছ-মাংসসহ ভাত খাওয়ার হোটেল যেমন দেখা যায় তেমনি নিরামিষ খাবারেরও দোকান লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া অস্থায়ী বিভিন্ন মিষ্টির দোকান গড়ে ওঠে। খেতে পাওয়া যায় চিড়া-দৈ। খাবার হিসেবে ডালপুরি, সিঙ্গাড়া, পিঁয়াজি ইত্যাদি মুখরোচক খাবার তৈরী হয়। একদিকে দেখা যায় চানাচুর, খোরমা, চিনাবাদাম, বাতাসা, খাজা ইত্যাদির দোকান। এই সকল দোকান পেরিয়ে মনোহরী পট্টি। এখানে বিভিন্ন প্রকার প্রসাধনী, খেলনা ইত্যাদির ঘটা দেখতে পাওয়া যায়। কুমারদের দোকানে দেখা যায় হাড়ি, পাতিল, মাটির পুতুল, ব্যাঙ্ক, খেলনা, ফুলদানী, গয়না, টেরাকোটা, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি। ছুতারেরা বিক্রি করে কাঠের তৈরী জিনিসপত্র। এর মধ্যে পিড়ি, জলচৌকি, খাট, পালঙ্ক, চেয়ার, টেবিল, আলমারী, আলনা, শোকেস, ড্রেসিংটেবিল ইত্যাদি দেখা যায়। ওঠে কামারদের তৈরী জিনিসপত্র। যেমন, দা, কুড়াল, খোন্তা, কোদাল, শাবল, বটি, কাঁস্তে, ছুরি, হাঁসুয়া, চাপাতি, নাঙ্গলের ফলা, নারকেল কোরানী ইত্যাদি। মেলার বাইরের দিকে খোলা মাঠে দেখা যায় সার্কাস প্যাণ্ডেল। এর কিছু দূর গিয়ে দেখা যায় নাগরদোলা।

পুরো উৎসব স্থল জুড়ে ভক্তরা শুয়ে-বসে কাটায়। অনেক ভক্তদের রান্ন্া করা উপকরণ নিয়ে আসে। এছাড়া মেলায় চাল-ডাল-আনাজ-তরকারী কেনার ব্যবস্থাও থাকে। সেখান থেকে ভক্তরা রান্নার উপকরণ কিনি নিয়ে রান্না করে। আবার মন্দির কর্তৃপক্ষ ভোগের ব্যবস্থা করে। অনেক ভক্ত পূর্বপুরুষের নামে, দেবতার নামে ভোগ উৎসর্গ করে। ভক্তদের খাওয়ায়। সেখান থেকেও দর্শনার্থীদের খাওয়ার যোগান হয়। খাওয়া ছাড়াও ভক্তদের থাকার জন্য বিভিন্ন বিভিন্ন প্যাণ্ডেল তৈরী করে দেওয়া হয়। সেখানে তারা রাত্রি যাপন করতে পারে। আবাসনের স্থানেও গুচ্ছে গুচ্ছে কীর্তন দল দিন, রাত কীর্তন করে। কীর্তনের মধ্যে আছে পালা কীর্তন, নামকীর্তন, গৌর কীর্তন ইত্যাদি।

মেলার একদিকে আছে ইসকন সাধুদের প্যাণ্ডেল। তারা সেখানে কীর্তন করে ও তাদের প্রকাশিত ধর্মীয় গ্রন্থ, পূজার উপকরণ, জপের মালা, গলার মালা, তিলক মাটি, চন্দন ইত্যাদি বিক্রি করে। এই প্যাণ্ডেলে অনেক বিদেশী ভক্তের আগমন ঘটে। অনেক স্থানে খ্রিস্টান মিশনারীদের উদ্যোগে যিশুর বাণী প্রচার করা হয়। এছাড়া হিন্দু ধর্মের অন্যান্য উপাসক সম্প্রদায়ও এই মেলাকে ধর্ম প্রচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। যেমন, সৎসঙ্গী, মতুয়া এঁদের ধর্মগ্রন্থের দোকানও এই মেলায় লক্ষ্য করা যায়। মূলত খেতুর মেলা ধর্ম-বর্ণ-জাতি-গোত্র নির্বিশেষের একটি মিলন মেলা হিসেবে বর্তমানে সার্বজনীন চরিত্র লাভ করেছে।
অনুপম হীরা মণ্ডল এর অন্যান্য লেখাসমূহ
Copyright © Life Bangladesh সাপলুডু মূলপাতা | মন্তব্য Contact: shapludu@gmail.com